নিয়ন্ত্রণে আসবে স্কুল কলেজ রাজস্ব বাড়বে শিক্ষা বোর্ডের

নিউজ ডেস্ক।।

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (নিম্ন মাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক) স্থাপন, পাঠদান ও একাডেমিক স্বীকৃতি দেয়া সংক্রান্ত নীতিমালা-২০২২ জারি হওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মালিকরা। একইসাথে সরকারের পক্ষ থেকে দেরিতে হলেও এই ধরনের একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আসায় দেশের কিন্ডারগার্টেন মালিকদের সংগঠনগুলোও শিক্ষা বিস্তারে আরো অগ্রণী ভূমিকা রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে।

অন্য দিকে সরকারের দিক থেকেও সংশ্লিষ্ট দফতর নানা ধরনের সুবিধা ভোগ করবে। বিশেষ করে এখন থেকে শিক্ষা বোর্ডগুলোর অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের পথ সুগম হবে। প্রসঙ্গত, গত রোববার নীতিমালা জারি করা হয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো: আবু বকর ছিদ্দীক স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়।

নীতিমালা অনুযায়ী বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (নিম্ন মাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক) স্থাপন, পাঠদান ও একাডেমিক স্বীকৃতির চূড়ান্ত অনুমোদনের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডগুলোকে। সংশ্লিষ্ট বোর্ডগুলো এই নীতিমালার বিধিবিধান সাপেক্ষে বোর্ড সভায় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (নিম্ন মাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক) স্থাপন, পাঠদান ও একাডেমিক স্বীকৃতি দেবে। তবে কোনো আবেদন নীতিমালার বিধিবিধান সাপেক্ষে মঞ্জুর না হলে তা সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানকে নামঞ্জুর হওয়ার কারণসহ জানিয়ে দিতে হবে।

সরকারের এই সিদ্ধান্তে দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তথা কিন্ডারগার্টেন মালিকদের সংগঠন ইতোমধ্যে স্বস্তি প্রকাশ করেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মালিকদের সংগঠনগুলো বলছে প্রতিষ্ঠান অনুমোদনের প্রয়োজন হয় শুধু পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে অংশগ্রহণ করানোর জন্য। কাজেই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে পাঠদানের অনুমতি দিয়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়া হলে সরকার বা বোর্ডের যেমন রাজস্ব আদায় হবে তেমনি শিক্ষাও অনেক সম্প্রসারিত হয়ে শিক্ষার মানোন্নয়ন ও অভিন্ন শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন সহজতর হবে। একইসাথে সব প্রতিষ্ঠানও সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকারের কাছে দীর্ঘ দিনের দাবি ছিল এই নীতিমালা জারির। বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ঐক্য পরিষদ এ বিষয়ে দীর্ঘদিন থেকে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন, সাংবাদিক সম্মেলন, মানববন্ধন করেছে। তা ছাড়া প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী, উপমন্ত্রী, এমপি, সচিব, ডিজি, বিভাগীয় কমিশনার, বোর্ডের চেয়ারম্যান, মাউশির পরিচালক, ডিসি, থানা নির্বাহী কর্মকর্তাকেও এ বিষয়ে একাধিকবার স্মারকলিপি প্রদান করা হয়।

কিন্ডারগার্টেন মালিকদের পক্ষ থেকে আন্তঃবোর্ডের চেয়ারম্যানসহ সব বোর্ড চেয়ারম্যানের প্রতিও বিনীত অনুরোধ জানানো হয়েছে, যাতে জায়গা/জমির বর্তমান মূল্যের কথা বিবেচনা করে প্রতিষ্ঠানগুলোকে জায়গার শর্ত শিথিলপূর্বক কোনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ছাড়া আগের মতো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহজ শর্তে পাঠদানের অনুমতি দিয়ে শিক্ষার মানোন্নয়ন ও প্রসারের সুযোগ দেয়া হয়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (নিম্ন মাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক) স্থাপনা, পাঠদান ও একাডেমিক স্বীকৃতি প্রদান নীতিমালা-২০২২ প্রণয়ন করায় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মালিকদের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানানো হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে পাঠদান, স্বীকৃতি নীতিমালা মোতাবেক সংশ্লিষ্ট শিক্ষাবোর্ডগুলো দিয়ে থাকে। ২০১৬ সালে বিভিন্ন কারণে তা শিক্ষা বোর্ড থেকে মন্ত্রণালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।

এর পর থেকে যেকোনো প্রতিষ্ঠানকে পাঠদান বা স্বীকৃতির জন্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করতে হতো। এর ভিত্তিতে মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট বোর্ডকে পরিদর্শন পূর্বক প্রতিবেদন পাঠাতে বলা হতো। বোর্ডের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে মন্ত্রণালয় মিটিংয়ের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে পাঠ দানের অনুমতি বা একাডেমিক স্বীকৃতি দিয়ে বোর্ডকে চিঠি দিলে সংশ্লিষ্ট বোর্ড অনুমতি দিত। এতে প্রতিষ্ঠানের পরিচালক বা প্রধানদের অনেক সমস্যা হতো।

অভিযোগ ছিল যে, ওই সময়ে তদবির ছাড়া কিছুই হতো না। যেহেতু মন্ত্রণালয়ে অতিরিক্ত সচিব থেকে উচ্চ পর্যায় ছাড়া কেউ গেট পাস দিতে পারে না। তাই সবাই মন্ত্রণালয়ে ঢুকতে না পারার কারণে তদবির করা সম্ভব না হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতো। এখন বোর্ডকে পুনরায় ক্ষমতা দেয়াতে বোর্ড ইচ্ছে করলে আগের মতো নীতিমালা কিছুটা শিথিল করে ভালো এবং পুরনো প্রতিষ্ঠানগুলোকে পাঠদান বা স্বীকৃতি দিতে পারবে। এতে শিক্ষার মান বাড়বে ও শিক্ষা সম্প্রসারণ হবে।

বতর্মানে কিন্ডারগার্টেন তথা ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো ৯৯ শতাংশ ভাড়া বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত, কিন্তু নীতিমালায় নিজস্ব জায়গার শর্ত থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠানই সাধারণভাবে পাঠদানের অনুমতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এইসব প্রতিষ্ঠানে নিম্নমাধ্যমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রায় ৩০ লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে।

এই শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশন করাতে হয় পাশের কোনো পাঠদানের অনুমতি প্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান থেকে। যেহেতু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা তাদের নামে রেজিস্ট্রেশন করানোর জন্য ওই প্রতিষ্ঠানকে বাড়তি কাজ ও কষ্ট করতে হয়। তাই তাদের বোর্ড ফির বাইরে কিছু বাড়তি টাকা দিতে হয়। তাই প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান হিসেবে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেও এই বাড়তি টাকা আদায় করতে হয়। এই বাড়তি টাকা আদায় করতে গিয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের সাথে মতানৈক্য সৃষ্টি হয়ে তা তিক্ততায় রূপ নিয়ে বিভিন্ন অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

এই বিষয়টি অনুধাবন করে অতীতে শিক্ষা বোর্ডে জায়গার শর্ত থাকার পরও জায়গা ছাড়া অনেক প্রতিষ্ঠানকে পাঠদানের অনুমতি দেয়া হয় এবং সেটা মন্ত্রণালয়ও অব্যাহত রেখেছে। সর্বশেষ ২০২০ ও ২০২১ সালে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রতিষ্ঠানকে জায়গার শর্ত শিথিল করে ভাড়া বাড়িতে পাঠদানের অনুমতি দেয়া হয়।

বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ঐক্য পরিষদের চেয়ারম্যান এম ইকবাল বাহার চৌধুরী নয়া দিগন্তকে জানান, সরকারের এই সিদ্ধান্তে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো উৎসাহিত হবে, শিক্ষা বিস্তারে তারা আরো বেশি ভূমিকা রাখতে পারবে।

তবে এখনো জায়গার শর্ত শিথিল এবং আরো কিছু বিষয়ে সহনীয় ভূমিকা পালন করা হলে সরকারও লাভবান হবে। বিশেষ করে বোর্ড ফি আদায়ের মাধ্যমে সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব আদায় করতে পারবে।