নিরব এক ঘাতক শব্দ দূষণ!

প্রকাশিত: ৭:২০ অপরাহ্ণ, বুধ, ১৩ জানুয়ারি ২১

ঢাকায় নির্ধারিত মাত্রার তিন গুণ বেশি শব্দ, হচ্ছে আলসার, হৃদরোগ, মাথাব্যথা, স্নায়ু সমস্যা, বাড়ছে মানসিক চাপ

অনলাইন ডেস্ক ||

রাজধানী ঢাকায় শব্দের মাত্রা নির্ধারিত মানমাত্রার চেয়ে তিন গুণ বেশি। পরিবেশ অধিদফতরের আটটি বিভাগীয় শহরের শব্দের মাত্রা পরিমাপ বিষয়ক জরিপ প্রতিবেদনে এমনটিই জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়, শব্দদূষণের প্রভাবে সর্বস্তরের মানুষ সাময়িকভাবে বা স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তবে শব্দদূষণের কারণে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছাত্র-ছাত্রী, শিশু, হাসপাতালের রোগী, ট্রাফিক পুলিশ, পথচারী ও গাড়ির চালকরা।

স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক গবেষণায় সম্প্রতি জানানো হয়, ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে বেশি শব্দ হচ্ছে। এমনকি সচিবালয়ের মতো নীরব এলাকায়ও তীব্রতর শব্দদূষণ হচ্ছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, শব্দদূষণ একটি ‘নীরব ঘাতক’। তারা জানান, শব্দদূষণের কারণে ভুক্তভোগীদের হাইপারটেনশন, আলসার, হৃদরোগ, মাথাব্যথা, স্মরণশক্তি হ্রাস,স্নায়ূবিক সমস্যা ও মানসিক চাপ তৈরির আশঙ্কা আছে। স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ুমন্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) এক সমীক্ষা বলছে, শব্দদূষণ নীতিমালা, ২০০৬ অনুযায়ী, নীরব এলাকা হিসেবে সচিবালয় এলাকায় দিনে শব্দের মাত্রা ৫০ ডেসিবেল থাকার কথা। কিন্তু গবেষণায় দেখা যায়, সচিবালয়ের পশ্চিম মসজিদের পাশের এলাকা ছাড়া সব জায়গায় ৭০ ভাগের বেশি সময় ধরে ৭০ ডেসিবেলের (তীব্রতর) বেশি শব্দের মাত্রা ছিল। আর সামগ্রিকভাবে উপাত্ত নেওয়া ১২টি স্থানে সম্মিলিতভাবে ৯১ দশমিক ৯৯ ভাগ সময় ৭০ ডেসিবেলের (তীব্রতর) বেশি মাত্রার শব্দ হয়েছিল।

ঢাকায় শব্দদূষণের উৎসগুলো হচ্ছে- গাড়ির হর্ন, নির্মাণকাজ, মাইকের ব্যবহার, শিল্প-কারখানা থেকে সৃষ্ট শব্দ প্রভৃতি। তবে মোটরযানের হর্ন শব্দদূষণের প্রধান কারণ। এ ছাড়া কল-কারখানা এবং নির্মাণকাজ থেকেও শব্দদূষণ সৃষ্টি হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে পটকা ও আতশবাজিও শব্দদূষণের জন্য দায়ী। সাধারণত যে এলাকাগুলোতে শব্দদূষণ বেশি হচ্ছে সেখানকার দোকানদার, ব্যবসায়ী, বাসিন্দা, কর্মরত ট্রাফিক পুলিশ এবং রিকশাচালকদের কানের সমস্যা নিয়ে চিকিৎসকদের কাছে বেশি যেতে দেখা যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে শব্দদূষণ সম্পর্কে মানুষের স্বাভাবিক জ্ঞানের অভাব রয়েছে। বিরক্তিকর উচ্চমাত্রার শব্দ মানসিক ও শারীরিক যে কোনো রকমের ক্ষতি করতে পারে।

শব্দদূষণ-সংক্রান্ত আইনের বাস্তবায়ন এবং এ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করার বিষয়টি নির্ভর করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ওপর। আবার আইন প্রয়োগকারী সংস্থা যতই চেষ্টা করুক না কেন, নাগরিকরা এ ব্যাপারে সচেতন না হলে শব্দদূষণ রোধ করা যাবে না। শব্দদূষণ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির জন্য প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের পাঠ্যসূচিতে সচেতনতামূলক তথ্য রাখার ওপর তারা জোর দিয়েছেন। আইনে শব্দদূষণের জন্য একজনের এক মাসের কারাদন্ড বা ৫ হাজার টাকা জরিমানার অথবা দুই ধরনের দন্ডই প্রদান করার বিধান আছে। শব্দদূষণ বিধিমালা অনুযায়ী, আবাসিক এলাকায় রাত ৯টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত শব্দের মাত্রা ৪৫ ডেসিবেল এবং দিনের অন্য সময়ে ৫৫ ডেসিবেল অতিক্রম করার কথা নয়। আবার বাণিজ্যিক এলাকায় তা যথাক্রমে ৬০ ও ৭০ ডেসিবেল থাকার কথা। হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং অফিস-আদালতের আশপাশে ১০০ মিটার পর্যন্ত নীরব এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। সেখানে রাতে ৪০ ও দিনে ৫০ ডেসিবেল পর্যন্ত শব্দমাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এই শব্দমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে না। বিশেষ করে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে রাত-দিন পাইলিংয়ের কাজ, ইট ভাঙার যন্ত্র, সিমেন্ট মিকশ্চারের ব্যবহার হচ্ছে। অথচ বিধিমালা অনুযায়ী সন্ধ্যা ৭টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত নির্মাণকাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি চালানোয় নিষেধাজ্ঞা আছে। আবার বিভিন্ন রাজনৈতিক সভা থেকে শুরু করে বিয়ে, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মেলা ও পিকনিকে মাইক ও লাউড স্পিকারের যথেচ্ছ ব্যবহার হচ্ছে। নিয়ম হচ্ছে, কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে এসব ক্ষেত্রে মাইক ব্যবহার করতে হবে এবং রাত ১০টার পর অনুষ্ঠান শেষ করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে তা অনুসরণ করা হয় না। আবার শহরের প্রধান সড়কগুলোতে চালকদের অপ্রয়োজনীয় হর্ন বাজাতে দেখা যায়। ট্রাফিক সিগন্যাল ও জ্যামে বসেও অনেকে হর্ন বাজান। নীরব এলাকায় হর্ন বাজানো নিষিদ্ধ। এরপরও চালকরা তা মানছেন না। হাসপাতাল-স্কুলের সামনে উচ্চ শব্দে হর্ন বাজান। নাক, কান ও গলারোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘শব্দদূষণ শুধু কানের ক্ষতিই করে না, এটি মানসিক ও শারীরিক ক্ষতিও করে।

অতিরিক্ত শব্দের জন্য শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিকট শব্দের জন্য কানের পর্দাও ফেটে যেতে পারে। এমনকি অন্তঃকর্ণেও অনেক সময় রক্তক্ষরণ হতে পারে। যেমন রমনা বটমূল ও একুশে আগস্ট যে গ্রেনেড হামলা হয়েছিল, সেখানে বিকট শব্দের জন্য ৮০ থেকে ৯০টি রোগীর কানের পর্দা ছিঁড়ে গিয়েছিল, যাদের আমি চিকিৎসা দিয়েছি। এ ছাড়া রাতে নির্মাণকাজের জন্য সৃষ্ট শব্দদূষণেও মানুুষ ঘুমাতে পারে না। আর রাতে পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মানুষ দিনে সুস্থভাবে কাজ করতে পারবে না। এতে ঝিমুনি থাকবে, কাজে মনোযোগ কমে যাবে। ’

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.