নিম্ন আয়ের মানুষের কি হবে?

নিউজ ডেস্ক।।

রাজধানীর বাসিন্দাদের পরিচিত বিড়ম্বনার নাম বাসা ভাড়া। মাসজুড়ে যা আয় হয় তার সিংহভাগই চলে যায় বাসা ভাড়ায়। বিকল্প না থাকায় বছরের পর বছর বাড়তি ভাড়া দিয়েই এ নগরীতে বাস করতে হয় মানুষকে। নতুন করে যোগ হয়েছে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি। যার প্রভাব বাসা ভাড়ায়ও পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ঢাকার বাসিন্দারা বলছেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাসা ভাড়া তো বাড়বেই, পাশাপাশি সব খরচ বৃদ্ধি পাবে। এতে ব্যয়বহুল এ শহরে টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাবে।

ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত ২৫ বছরে রাজধানীতে বাড়ি ভাড়া বেড়েছে ৪০০ শতাংশ। একই সময়ে নিত্যপণ্যের যে দাম বেড়েছে সেই তুলনায় বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধির হার প্রায় দ্বিগুণ।

সংগঠনটির অন্য এক পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকার ২৭ শতাংশ ভাড়াটিয়া আয়ের প্রায় ৩০ শতাংশ, ৫৭ শতাংশ ভাড়াটিয়া প্রায় ৫০ শতাংশ, ১২ শতাংশ ভাড়াটিয়া প্রায় ৭৫ শতাংশ টাকা ব্যয় করেন বাসা ভাড়া পরিশোধে।

এ অবস্থায় গতকাল রাত ১২টার পর জ্বালানি তেলের নতুন দাম কার্যকর হয়েছে।

ডিজেল ও কেরোসিনের দাম লিটারে ৩৪ টাকা বাড়িয়ে ১১৪ টাকা, পেট্রোলের দাম ৪৪ টাকা বাড়িয়ে ১৩০ টাকা এবং অকটেনের দাম ৪৬ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করা হয়েছে। বাড়তি দামের প্রভাব পড়বে জীবনযাত্রার সব ক্ষেত্রে।

রাজধানীর মিরপুর কাজীপাড়া এলাকায় ভাড়া বাসায় পরিবার নিয়ে থাকেন বেসরকারি চাকরিজীবী তোফাজ্জল হোসেন। তিনি বলেন, এমনিতে গত কয়েক মাস ধরে সব জিনিস কিনতে হচ্ছে বাড়তি দামে। গত জানুয়ারিতে একবার বেড়েছে বাসা ভাড়া। আমার যে বেতন তা দিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছি প্রতি মাসেই। এরই মধ্যে বাড়ল জ্বালানি তেলের দাম, যার প্রভাব পড়বে প্রতিটি ক্ষেত্রেই। সবজি, মাছ মাংস, নিত্যপণ্যের দাম যেমন বাড়তি হবে, তেমনি গাড়ি ভাড়াও বেড়ে যাবে। এতে বাসার মালিকরাও ফের বাসা ভাড়া বাড়িয়ে দিতে পারেন। এ অবস্থায় আমাদের মতো নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষ যারা ঢাকায় ভাড়াটিয়া হিসেবে আছি তাদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাবে। অনেকে ইতোমধ্যেই ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার চিন্তা করছেন।

রাজধানীর মালিবাগ এলাকায় দুই রুমের বাসায় ১৪ হাজার টাকা ভাড়া থাকেন সাজেদুর রহমান নামে বেসরকারি চাকরিজীবী। তিনি বলেন, একটি কোম্পানিতে মার্কেটিং বিভাগে কাজ করি ৩৫ হাজার টাকা বেতনে। এর মধ্যে মাসের শুরুতে অর্ধেক টাকা চলে যায় বাড়ি ভাড়া পরিশোধ করতে। এরপর অবশিষ্ট টাকা দিয়ে কোনো মতে সংসার চালাতে হয়। ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ, চিকিৎসা খরচ, যাতায়াত খরচসহ আরও নানা খরচ তো আছেই। বর্তমানে বাজারের যে অবস্থা, দ্রব্যমূল্যের যে ঊর্ধ্বগতি, প্রতি মাসেই ধার দেনা করতে হয়। বাজার থেকে ভালো কিছু কেনা তো দূরের কথা, কোনো মতে টিকে আছি। এ অবস্থায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হলো, এর প্রভাব তো পড়বেই। জীবনযাত্রার ব্যয় নিশ্চিতভাবেই আরও বেড়ে যাবে।

রাজধানীর শেওড়াপাড়া এলাকায় একটি ৫ তলা বাড়ির মালিক কামরুল ইসলাম বলেন, বাড়িওয়ালাদের কষ্ট তো কেউ দেখে না। আমরা যারা বাড়িওয়ালা আছি, তাদের মধ্যে অধিকাংশই ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বাড়ি নির্মাণ করেছি। প্রতি মাসে ব্যাংকের কিস্তি ছাড়াও একটি বাসা পরিচালনায় কী পরিমাণ খরচ হতে পারে তা সাধারণ মানুষ ধারণাও করতে পারবে না।

তিনি বলেন, যারা চাকরি করেন তাদের সবার বছর শেষে বেতন বাড়ে। তাহলে বছর ঘুরলে আমরা বাসা ভাড়া বাড়াব না কেন? এ বাড়িটিই তো আমাদের আয়ের একমাত্র উৎস। এখন আবার জ্বালানি তেলের দামও বাড়ল, সব জিনিসের দাম আবার বৃদ্ধি পাবে। এই অবস্থায় আমাদের টিকে থাকতে হলে তো বাসা ভাড়া না বাড়িয়ে উপায় নেই। সব জিনিসের দাম বাড়লে আমাদেরও বাড়ি ভাড়া বাড়াতে হবে।

এসব বিষয়ে বাংলাদেশ সাধারণ নাগরিক সমাজের আহ্বায়ক মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব সব ক্ষেত্রেই পড়বে। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাবে। ঢাকায় যারা ভাড়াটিয়া হিসেবে থাকেন তাদের মধ্যে যারা নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষ তারা আসলেই বিষয়টি নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন। ঢাকায় এত বেশি বাড়ি ভাড়া, এর মধ্যে নিত্যপণ্যের দামও ঊর্ধ্বমুখী। এর সঙ্গে যদি জীবন যাত্রার ব্যয় আরও এক দফা বেড়ে যায়, তাহলে তাদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।