নন-এমপিও শিক্ষকদের ঈদ এবং প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

আইউব আলী।।

ঈদ যতই ঘনিয়ে আসছে বেসরকারি এমপিওভূক্ত শিক্ষক সমাজ ততই উদ্বিগ্ন হচ্ছেন কিভাবে কোরবানী দিবেন এই ভেবে। ওদিকে লক্ষাধিক নন-এমপিও শিক্ষক দাঁতে দাঁত চিপে বসে আছেন। প্রচার মাধ্যমগুলোতে তাদের ঈদ নিয়ে নিজেরাও কিছু লিখছেন না, অন্যেরাও নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত। সিকি বোনাস দিয়ে যেখানে কোরবানী নিয়ে এত দূশ্চিন্তা সেখানে বেতন-বোনাস ছাড়াই তাদের ঈদ কেমন হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কয়েকজন নন-এমপিও শিক্ষকের সাথে কথা বলে জানা গেছে তাদের কিছু সংখ্যক কোরবানী দিতে পারবেন তবে অধিকাংশই পারবেন না। অনেকেই সর্বস্ব দিয়ে প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ নিয়েছেন, অনেকে সামান্য জমি-জমা নিয়ে কোন রকমে পরিবার চালাচ্ছেন আবার অনেকে দেনার দায়ে জর্জরীত আছেন। এসব শিক্ষকের অনেকেই ছোট-খাট ব্যবসা করেন, অনেকেই প্রাইভেট টিউশনী করেন, অনেকেই কিন্ডার গার্টেন স্কুল খুলে কোন রকমে জোড়াতালি দিয়ে দিন চালাচ্ছেন। তাদের ঈদ বলে কিছু নেই! ময়দানে যাবেন, নামাজ পড়বেন আর সৃষ্টিকর্তার কাছে অভিযোগ করবেন তারপর বাড়ী ফিরে দরজা বন্ধ করে বিছানায় শুয়ে নিজের ভাগ্যকে দোষারোপ করবেন। সম্ভব হলে হয়তো কেউ সন্তানের মুখের দিকে চেয়ে বাজার থেকে মাংশ কিনবেন, সম্ভব না হলে অপেক্ষা করবেন প্রতিবেশিরা যদি কেউ মাংস দেন! এটাই নন-এমপিও শিক্ষকদের নির্মম বাস্তবতা।

নন-এমপিও শিক্ষকগণের এহেন দূর্দশার জন্য কারা দায়ী? শিক্ষক নিজেই না কি সরকার? লেখা-পড়া শেষে যখন কর্মের জন্য হা-হুতাশ করতে হয়, পরিবার-পরিজনও যখন মুখ ঘুরিয়ে নেয় তখন একজন মানুষ আর মানুষ থাকেনা অমানুষ হয়ে যায়। আপ্রাণ চেষ্টা চালায় একটি কর্মক্ষেত্র তৈরির জন্য কিন্তু নানা কারণে সুবিধা করে উঠতে না পেরে অবশেষে প্রতিষ্ঠান তৈরি করেন কিংবা নতুন প্রতিষ্ঠানে যোগদান করেন। অতীত ইতিহাস থেকে সকলের বদ্ধমূল ধারণা কোন একদিন এমপিওভূক্ত তো হবেই। মূলতঃ এ সুযোগ সৃষ্টি করেছেন সরকার। এখনো যত্রতত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের অনুমোদন পাওয়া যাচ্ছে। এমপিও না দেয়ার শর্তে অতীতেও দিয়েছিল এখনো একই প্রক্রিয়ায় অনুমোদন দেয়া হচ্ছে। প্রতিষ্ঠান স্থাপনের ক্ষেত্রে এ প্রক্রিয়াটিকে আমরা কিভাবে বিশ্লেষণ করবো? সামনে চারটি সূচকের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমপিও দিতে যাচ্ছে সরকার যদিও অনেক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে উপরোক্ত শর্তটি প্রযোজ্য ছিল। জানা গেছে সাত হাজার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সাতাশ শত বাষট্টি টি প্রতিষ্ঠান যোগ্য বলে বিবেচিত হয়েছে। অবশিষ্ট থাকছে চার হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান। মাননীয় শিক্ষা মন্ত্রী মহোদয় অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে ঘোষণা দিয়েছেন যে, যে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বাদ পড়ছে শর্ত পূরণ সাপেক্ষে সে সব প্রতিষ্ঠানকেও এমপিওভূক্ত করা হবে। মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়কে হৃদয় থেকে ধন্যবাদ জানাই এধরণের ঘোষণা দেয়ার জন্য। কিন্তু আংশিক প্রতিষ্ঠানের এমপিওভূক্তির ঘোষণার সাথে সাথে বঞ্চিতদের আর্তনাদ ধ্বনিত হবে বাংলার আকাশে-বাতাসে! জানিনা কিভাবে সইবেন তিনি? মাননীয় শিক্ষা মন্ত্রী মহোদয় জানেন কি না জানি না যে, কাগজে-পত্রে দেখানো হলেও জনসংখ্যার ঘনত্ব অনুপাতে এদেশের অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি বরং বেকারত্বের চাপে কিংবা স্থানীয় কিছু ব্যাক্তির কল্যাণে(!) যে যার মত যেখানে খুশি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। আর একারণেই শত বছর বছর অপেক্ষা করলেও হাজার হাজার প্রতিষ্ঠান মানদন্ডের চারটি সূচকের মধ্যে একাডেমিক স্বীকৃতি বাদে বাকী তিনটি শর্ত কোনদিনই পূরণ করতে পারবে না। কেননা প্রতিষ্ঠানগুলিতে যে পরিমাণ শিক্ষার্থী দরকার সংশ্লিষ্ট এলাকায় উক্ত সংখ্যক শিশু জন্মগ্রহণ করেনি, আগামীতেও করবেনা। শহর থেকে শিক্ষার্থী ধার করেও নেয়া সম্ভব নয়। উপরন্তু এখনো যেভাবে বিভিন্ন স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের অনুমতি দেয়া হচ্ছে তাতে সমস্যা আরোও প্রকট আকার ধারণ করবে। তাহলে কি হবে হতভাগা নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীদের? ইতোমধ্যে বেতনের মুখ না দেখেই অবসরে যাওয়া শুরু হয়েছে। আগামী ১০ বছরে হাজার হাজার শিক্ষক-কর্মচারী বেতন ছাড়াই অবসরে যাবেন। এসব হতভাগা শিক্ষকের ব্যাপারে সরকারের ভাবা উচিৎ কেননা সার্বিক দিক বিবেচনা না করেই প্রতিষ্ঠান অনুমোদন দিয়ে সরকারই তাদের এ পথে আসতে সহযোগিতা দিয়েছেন। উপরন্তু দেশের মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব।

নন-এমপিও শিক্ষকের বিষয়টি একটি জাতীয় সমস্যা, একটি বড় বিষয়। এ সমস্যা নিরসনকল্পে চাই সদিচ্ছা এবং নিঃস্বার্থ ভাবনা। আমার মত সিকি বলা ভুল হবে পাতি লেখকের এসব বিষয় নিয়ে কথা বলা শোভা পায়না, হযতো গর্হিত অপরাধ। প্রিন্টিং মাধ্যমগুলোর নিকট কোন বিষয়ে মতামত পাঠালে হয়তো পড়েও দেখেন না নয়তো তাদের মনের মত হয় না বিধায় কাগজের পাতায় আসেনা। অনলাইন পত্রিকাগুলোর মধ্যেও অনেকে প্রকাশ করতে চান না। প্রকাশ হলেও সেটি সদাশয় কর্তা ব্যক্তিদের নিকট পৌঁছে কিনা আমি জানিনা। তারপরও আমার মত অনেকেই লিখে যাচ্ছেন এই আশায় যদি কর্তা ব্যক্তিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায়। যা হোক তারপরেও নন-এমপিও শিক্ষকগণের করুণ অবস্থার কথা বিবেচনা করে কিছু প্রস্তাবনা এখানে উপস্থাপন করছিঃ

এক ঃ এখন থেকে সব ধরণের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনে অনুমোদনদান বন্ধ করে যেখানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন সেখানে নিরপেক্ষ জরীপের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান স্থাপনের জন্য সরকার নিজেই পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেন। কোন জন প্রতিনিধির মাধ্যমে জরীপ চালানো যাবে না।

দুই ঃ বিদ্যমান নন-এমপিও প্রতিষ্ঠান যেগুলো এমপিওভূক্তির যোগ্যতা অর্জন করেনি সেগুলো জনপ্রতিনিধি ছাড়াই নিরপেক্ষ জরীপের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণ করে অপ্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান চিরদিনের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা যেতে পারে। বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানের কর্মরত জনবল বিদ্যমান এমপিওভূক্ত প্রতিষ্ঠানগুলিতে সমন্বয় করা যেতে পারে। দেখা যাবে, সারা দেশে যে প্রতিষ্ঠানগুলি রয়েছে সেগুলিতে তাদের পর্যায়ক্রমে তাদের জায়গা হয়ে যাবে।

তিন ঃ যে সব প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে কিন্তু যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি, ভবিষ্যতেও হয়তো পারবেনা এধরণের প্রতিষ্ঠানগুলিকে এখনই এমপিওভূক্ত করা যেতে পারে।

চার ঃ বিদ্যমান এমপিওভূক্ত প্রতিষ্ঠানগুলিতে যদি সংকুলান না হয় তাহলে যাদের বয়স ৫৫ বছর অতিক্রম করেছে তাদেরকে গোল্ডেন দিয়ে পদ শুণ্য করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে অবশিষ্ট সময়ের বেতন এবং অবসরকালীণ সুবিধা প্রদান করলে কোন শিক্ষক-কর্মচারী আপত্তি করার কথা নয়।
পাঁচ ঃ বিদ্যমান বেসরকারি এমপিওভূক্ত এবং বাছাইকৃত প্রয়োজনীয় নন-এমপিও প্রতিষ্ঠানগুলিকে একযোগে জাতীয়করণ করা হলে এসমস্যার সবচেয়ে ভাল সমাধান হতে পারে।
উপরোক্ত উপায়ে নন-এমপিও শিক্ষকদের দূর্দশা দূর করা যেতে পারে। শুধু তাই নয় সে সাথে দেশের শিক্ষার অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধিত হবে। শিক্ষকদের মাঝে মনোবল সৃষ্টি হবে, কাজের স্পৃহা বৃদ্ধি পাবে। যে ভাবেই হোক এ সমস্যার সমাধান করতে না পারলে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন অব্যাহত থাকলে শত বছরেও সমস্যা দূর হবেনা বরং উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতেই থাকবে।

এক্ষেত্রে দু’টি দিক থেকে সমস্যা আসতে পারে। এক. স্থানীয় জন প্রতিনিধিগণ যে সব প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন কিংবা সহযোগিতা করেছেন সে সব প্রতিষ্ঠান বন্ধের পর্যায়ে গেলে তারা বিরোধিতা করতে পারেন। যেহেতু কর্মরত জনবলের কর্মের সংস্থান করে দেয়া হবে সেহেতু বাধা আসার কথা নয়। দুই. কর্তা ব্যক্তিরা হয়তো ভাববেন এত অর্থের যোগান কোথা থেকে হবে? একটি কথা সকলকে মনে করিয়ে দিতে চাই যে বাংলাদেশ আর আগের মত নেই। মাননীয় প্রধান মন্ত্রী মহোদয়ের অক্লান্ত পরিশ্রমে যে দেশটি আগামীতে মধ্যম আয়ের দেশ হতে যাচ্ছে সে দেশে শিক্ষার জন্য অর্থের অভাব হবেনা। বর্তমান অবস্থাতেও সমস্যা হবেনা যদি রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে ফাঁকিবাজি না হয় এবং বাজেটের সময় বিভিন্ন ডিপার্টমেন্ট বিভিন্ন অজুহাতে নিজের অংকটাকে অহেতুক বড় করার চেষ্টা না করেন। পাশাপাশি বিভিন্ন মহলের বিলাসিতা কমিয়ে আনা গেলে এখনই সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করা সম্ভব। বাজেটে শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যয় বরাদ্দ রেখে অন্যান্য খাতের ব্যয় নির্ধারণ করতে হবে। শুধু তাই নয় শিক্ষা খাতের ব্যয়ের সুষ্ঠু বন্টন নিশ্চিত করতে হবে। আমি কোন অর্থনীতিবিদ কিংবা শিক্ষাবিদ কিংবা গবেষক নই তথাপি কথাগুলো লিখলাম। ভুল হলে শোধরানোর জন্য অনুরোধ রইলো।

মাননীয় প্রধান মন্ত্রী মহোদয় পিতার আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে দেশটিকে সোনার দেশ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য রাতের ঘুম হারাম করেছেন। তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়নে শিক্ষা অন্যতম ফ্যাক্টর। শুধু শিক্ষা হলেই হবে না, মানসম্মত সুশিক্ষা হতে হবে। আর একাজে শিক্ষকের মর্যাদা হতে হবে সবার উপরে তবে তা মুখে নয় কাজে। আমরা মাননীয় প্রধান মন্ত্রী তথা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নকে নিজের স্বপ্ন মনে করে দেশটিকে এগিয়ে নিতে চাই। দূর্দশা দূর করতে চাই শিক্ষকসহ সর্বস্তরের মানুষের। এ কাজটি করতে পারলে এদেশের স্বাধীনতার অগ্রনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর আত্মা শান্তি পাবে। আমি মাননীয় শিক্ষা মন্ত্রীসহ সদাশয় কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই আপনাদের উপরই নির্ভর করছে সব কিছু। আপনারা সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে আমরাও সার্বিক সহযোগিতা করতে পারবো ইনশাআল্লাহ।

লেখক-
অধ্যক্ষ
চিলাহাটি গার্লস্ স্কুল এন্ড কলেজ
ডোমার, নীলফামারী।