নতুন শিক্ষাক্রম: শিক্ষার্থী নিজেকেও নিজে মূল্যায়ন করবে

শিক্ষাবার্তা ডেস্কঃ চলতি বছর থেকেই বাংলাদেশে নতুন পাঠক্রম চালু হয়েছে৷ কিন্ত এবার নতুন পাঠক্রম শুধু প্রথম শ্রেণি এবং ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির জন্য৷ দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত এটা চালু করতে ২০২৮ সাল লেগে যাবে৷

ওই তিনটি শ্রেণির বইয়েও পরিবর্তন আনা হয়েছে৷ শিক্ষার্থীরা মূল বইয়ের সাথে পেয়েছে সহায়ক বই৷ এর পাশাপাশি শিক্ষকদের জন্যও গাইড বই থকার কথা৷ তবে তারা এখনো তা পাননি৷ নতুন পদ্ধতির এই পাঠক্রমকে বলা হচ্ছে ‘অ্যাক্টিভিটি-নির্ভর’ শিক্ষাব্যবস্থা৷ এই পদ্ধতিতে পাঠদানের জন্য শিক্ষকদের মধ্য থেকেই ‘মাস্টার ট্রেইনার’ করা হয়েছে৷ তারা এখন সারা দেশের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেবেন৷ তবে প্রশিক্ষণের সময় এবং পর্যাপ্ততা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে৷ দেশের ৬৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আগে থেকেই এই পদ্ধতির পাঠক্রম চালু ছিল৷

কেমন হবে এই শিক্ষা পদ্ধতি?

বলা হচ্ছে,  নতুন শিক্ষাক্রমে এখনকার মতো আর এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা হবে না৷ শুধু দশম শ্রেণির পাঠ্যসূচি অনুসারে এসএসসি পরীক্ষা হবে৷ একাদশ ও  দ্বাদশ শ্রেণিতে বোর্ডের অধীনে দুটি পবালিক পরীক্ষা হবে৷ দুটি পরীক্ষার ফলাফল সমন্বয় করে চূড়ান্তভাবে এইচএসসির ফলাফল ঘোষণা করা হবে৷

শিক্ষার্থীরা দশম শ্রেণি পর্যন্ত অভিন্ন সিলেবাসে পড়বেন৷ একাদশ শ্রেণিতে মানবিক, বিজ্ঞান ও বাণিজ্য- এই তিন বিভাগে ভাগ হবে৷ শিক্ষার্থীরা তাদের পছন্দমতো বিভাগ বেছে নিতে পারবেন৷

তাদের শেখার ১০টি ক্ষেত্র নির্ধারণ করা হয়েছে৷ ক্ষেত্রগুলো হলো: ভাষা ও যোগাযোগ,গণিত ও যুক্তি, জীবন ও জীবিকা, সমাজ ও বিশ্ব নাগরিকত্ব, পরিবেশ ও জলবায়ু, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য এবং সুরক্ষা, মূল্যবোধ ও নৈতিকতা এবং শিল্প ও সংস্কৃতি৷ প্রাথমিকে থাকবে ছয়টি আর মাধ্যমিকে ১০টি বই৷ সপ্তাহে ছুটি হবে দুইদিন৷

প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত প্রচলিত পরীক্ষা পদ্ধতির চেয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক মূল্যায়ন পদ্ধতির ওপর গুরুত্ব দেয়া হবে৷ তবে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত প্রচলিত কোনো পরীক্ষাই হবে না৷ এরপর থেকে পরীক্ষা এবং মূল্যায়ন থাকবে৷ দুটি মিলিয়ে ফলাফল নির্ধারণ করা হবে৷ শ্রেণি অনুযায়ী মূল্যায়ন শতকরা ৩০ থেকে ৬০ ভাগ হবে ক্লাসে শিক্ষার সময়ে৷ বাকিটা পরীক্ষার মাধ্যমে৷

প্রাথমিকে এরপর প্রতিবছর একটি করে শ্রেণিতে নতুন পাঠক্রম শুরু হবে৷ ২০২৭ সালে প্রাথমিকে পুরো চালু হবে৷ একইভাবে উচ্চ মাধ্যমিকে প্রতি বছর একটি করে শ্রেণি অন্তর্ভুক্ত হবে৷ ২০২৮ সালে দ্বাদশ শ্রেণিতে চালুর মধ্য দিয়ে এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হবে৷

নতুন এই পদ্ধতিতে এখনকার মতো কাঠামোবদ্ধ প্রশ্ন থাকবে না, এমনকি এখন যেভাবে এমসিকিউ করা হয়, তা-ও থাকবে না৷ বছরজুড়েই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিখনকালীন মূল্যায়ন চলতে থাকবে৷

বই কেমন?

প্রথম শ্রেণিতে আছে তিনটি বই৷ ‘আমার বাংলা বই’- এর প্রথম পাঠ শুরু হয়েছে শিক্ষার্থীর নিজের পরিচয় লেখার মধ্য দিয়ে৷ দ্বিতীয় পাঠ রং করা এবং আঁকা৷ তৃতীয় পাঠ ‘আমি ও আমার বিদ্যালয়’ মূলত শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের মধ্যে কথোপকথন৷ চতুর্থ পাঠ ‘আমি ও আমার সহপাঠীরা’ শিক্ষার্থীদের মধ্যে কথোপকথন৷ বর্ণমালা শিক্ষা আছে৷ প্রত্যেকটি পাঠেই শিক্ষার্থীদের নিজেদের করার অনেক কাজ আছে৷ আছে শিক্ষকদের সহায়তায় কাজ৷ বইটিতে ছবির ব্যবহারও অনেক৷

ষষ্ঠ শ্রেনিতে বই মোট ১০টি৷ তবে এর সঙ্গে অনুশীলন বই আছে আলাদা৷ বিজ্ঞান অনুশীলন বইটিতে দেখা গেছে যে, পুরো বইটিই মূল বইয়ের আলোকে শিক্ষার্থীদের নিজেদের অনুশীলন করার নানা মডিউল দেয়া হয়েছে৷ যেমন, আকাশ কত বড়?- এই পাঠে শিক্ষার্থীদের নানা ধরনের প্রশ্ন করা হয়েছে৷ তার উত্তর পাওয়ার কৌশল বলে দেয়া আছে৷ শিক্ষার্থীরা নিজেরাই উত্তর খুঁজে তা লিখবে৷ আমাদের জীবনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি- এই পাঠেও একইভাবে শিক্ষার্থীদের কাজ দেয়া হয়েছে৷ মূল বইয়ের নাম ‘বিজ্ঞান অনুসন্ধানী পাঠ’৷ মূল বইটি বর্ণনামূলক হলেও প্রত্যেক পাঠ শেষে শিক্ষার্থীর জন্য অনুশীলন আছে৷ সপ্তম শ্রেণিরও ১০টি বই৷ সঙ্গে আছে সহায়ক বই৷ ইতিহাস বিষয়ক বইয়ের নাম ‘ইতিহাস ও  সামাজিক বিজ্ঞান অনুসন্ধানী পাঠ’৷ এই বইয়ে বর্ণনার পাশপাশি প্রচুর প্রয়োজনীয় ঐতিহাসিক ছবি ব্যবহার করা হয়েছে৷ শিক্ষার্থীদের জন্য অনুশীলন আছে৷ এর আলাদা অনুশীলন বই আছে৷ সেই বইয়ে ঐতিহাসিক ও সামাজিক বিষয়ে অনুসন্ধানের কাজ আছে৷ অনুসন্ধানের পদ্ধতি বলে দেয় আছে৷ শিক্ষার্থীরা বিষয় নির্ধারণ করে অনুসন্ধান করবে৷

পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ আলমগীর হোসেন খান জানান,” ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির নতুন পাঠক্রমের সব বই এখনো শিক্ষার্থীরা পায়নি৷ যা পেয়েছে তা দেখে মনে হয়েছে এটা ভিন্নধর্মী শিক্ষাপদ্ধতি৷ আগের বই পরিবর্তন করে নতুন পদ্ধতিতে লেখা হয়েছে৷ মূল বইয়ের সহায়ক বই আছে৷ আর শুধু পরীক্ষা নয়, শ্রেণিকক্ষের কাজসহ শিক্ষকদেরও অনেক কাজ আছে৷ সব মিলিয়ে মূল্যায়ন করা হবে৷ আমাদের শিক্ষকরা কিছুটা প্রশিক্ষণ পেয়েছেন৷ তবে তাদের পাঠদান পদ্ধতি বুঝতে সময় লাগবে৷”

বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতির  সভাপতি মো. শামসুদ্দিন জানান,‘‘প্রথম শ্রেণির বইয়ে আমূল পরিবর্তন আনা হয়েছে৷ যেমন গণিত বইয়ে প্রচুর ছবি দিয়ে বুঝানো হয়েছে৷ কম-বেশি বুঝাতে কয়েকটি পাঠে নানা কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে৷ আগে এত বিস্তারিত ছিল না৷ আর তাদের অনুশীলন বইও আছে৷”

ঢাকার একটি সরকারি প্রাথকি বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পিংকী ভৌমিক বলেন, ‘‘প্রথম শ্রেণির বই পরিবর্তন করা হয়েছে৷ দ্বিতীয় শ্রেণির ‘ট্রেন’ কবিতাটির প্রথমাংশ প্রথম শ্রেণিতে নিয়ে আসা হয়েছে৷ অনেক অনুশীলন আছে৷ কিন্তু আমরা কীভাবে পড়াবো তার প্রশিক্ষণ আমরা এখনো পাইনি৷ আমরা ক্লাসে যাওয়ার আগে কীভাবে পড়াবো তার একটা পাঠ লিখতে হয়৷ কিন্তু প্রথম শ্রেণির জন্য কীভাবে করবো তা বুঝে উঠতে পারছি না৷”

শুধু বইয়ের ওপর নির্ভরশীল হবে না

কারিকুলাম উন্নয়ন ও পুনর্বিবেচনা বিষয়ক কোর কমিটির সদস্য এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক অধ্যাপক মোহাম্মদ তারিক আহসান বলেন, ‘‘আমাদের এখনকার শিক্ষার যে অ্যাপ্রোচ, তা হলো, শিক্ষার্থী শুধু বই পড়ে জানবে না, সে আরো পারিপার্শ্বিক সূত্র থেকেও জানবে৷ তার পরিবেশ, পরিবার, সমাজ প্রকৃতি এমনকি তার সহাপাঠীর কাছ থেকে৷ তাই তার মূল্যায়ন শুধু বছরে কয়েকটি লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমে হবে না৷ তার ক্লাস, তার শিক্ষক, তার সহপাঠী- এমনকি যে সমাজে সে শিক্ষার নানা কাজে যাবে, তারাও তাকে মূল্যায়ন করবে৷ এমনকি শিক্ষার্থী নিজেকেও নিজে মূল্যায়ন করবে৷ টার্গেট হলো- সে যা শিখবে তা যেন সে বুঝতে ও প্রয়োগ করতে পারে৷”

২০২৭ সালের মধ্যে এই পদ্ধতিকে একাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পাঠক্রম চালু হবে৷ দশম শ্রেণি পর্যন্ত  সায়েন্স , আর্টস বা কমার্স আলাদা কোনো বিভাগ থাকবে না৷ একাদশ ও দ্বাদশে বিভাগ থাকবে৷ তবে গুচ্ছ বিষয়ের কারণে কেউ আর্টসে পড়েও তার প্রয়োজনে গণিত বা  বিজ্ঞানের বিষয় পড়তে পারবে বলে জানান তিনি৷

তার কথা, ‘‘এই পদ্ধতির শিক্ষার জন্য শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ খুব জরুরি৷ আর অবকাঠামো পরিবর্তন করতে হবে৷ এটা যেহেতু একপাক্ষিক নয়, অংশগ্রহণমূলক শিক্ষা, তাই ক্লাসের হাইবেঞ্চ, লোবেঞ্চ তুলে দিতে হবে৷”

তিনি জানান, ‘‘শিক্ষকদের টিচিং গাইড বই থাকবে৷ এখন আমরা ওয়েবসাইটে দিয়ে দিয়েছি ৷”

অনলাইনে প্রশিক্ষণ

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)-এর সদস্য (পাঠ্যক্রম) মশিউজ্জামান জানান,” ২০২৮ সাল নাগাদ দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত নতুন এই পাঠক্রম আমরা চালু করতে পারবো৷ এখন যে তিনটি শ্রেণিতে এই পদ্ধতি চালু হয়েছে, তাদের বই পরিবর্তন করা হয়েছে৷ অন্য কোনো শ্রেণির বইয়ে পরিবর্তন আনা হয়নি৷ পর্যায়ক্রমে যখন যে ক্লাসে পরিবর্তন আসবে, সেই ক্লাসের বইও পরিবর্তন হবে৷”

এখন পর্যন্ত মাস্টার ট্রেইনার করা হয়েছে দুই হাজার ১০০ জনকে৷ আর উপজেলা পর্যায়ে ১৭ হাজার শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে৷  উপজেলা পর্যায়ের এই ট্রেইনাররা তিন লাখ ৫০ হাজার শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেবে বলে জানান তিনি৷ তবে সেই প্রশিক্ষণ এখনো শুরু হয়নি৷

মোহাম্মদ তারিক আহসান জানান, ‘‘শিক্ষকরা অনলাইনে দুই ধাপে এবং সরাসরি পাঁচ দিনের একটা প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন৷” আর আগের প্রশিক্ষণগুলো ছিল দুই দিনের৷ অনলাইন প্রশিক্ষণ হবে দুই ঘণ্টার৷ মশিউজ্জামান জানান, শিক্ষা কর্মকর্তাদেরও প্রশিক্ষণ দেয়া হবে৷

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে বাংলাদেশে এক লাখ ১৯ হাজার স্কুল ও কিন্ডারগার্টেনে চার লাখ তিন হাজার শিক্ষক দুই কোটিরও বেশি শিক্ষার্থীকে পড়াচ্ছেন৷

বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ১৮ হাজার ৮৭৪টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে দুই লাখ ৩৭ হাজার শিক্ষক ৮৯ লাখ ৩০ হাজার শিক্ষার্থীকে পড়াচ্ছেন৷ সুত্রঃ ডয়েচে ভ্যালে

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/০১/২০/২৩