নতুন শিক্ষাক্রমে প্রস্তুতির ঘাটতি নেই, আছে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে: শিক্ষা উপমন্ত্রী

শিক্ষাবার্তা ডেস্ক, ঢাকাঃ নতুন শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের আগে প্রস্তুতির ঘাটতি ছিল না। এক্ষেত্রে সংকট যেটা ছিল সেটা শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের অভাব। এ বিষয়টি কাটিয়ে উঠতে কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা উপমন্ত্রী  মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল।

সম্প্রতি দেশে নতুন শিক্ষাক্রম চালু হয়েছে। সাধারণত প্রতিটি দেশে শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের আগে দীর্ঘ প্রস্তুতি নেয়া হয়। মাঠপর্যায়ে বিভিন্ন জরিপ করা হয়। অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়। আমাদের এ শিক্ষাক্রম চালু করার আগে কি পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেয়া হয়েছিল ? একটি জাতীয় দৈনিকের সাথে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এই প্রশ্নে শিক্ষা উপমন্ত্রী একথা বলেন।

তিনি বলেন, আমরা এ শিক্ষাক্রম চালু করার প্রস্তুতি নিচ্ছি ২০১৭ সাল থেকে। শিক্ষাবিদ, শিক্ষক, অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করেই এটি চূড়ান্ত করা হয়েছে এবং শিক্ষাক্রম চালুর আগে এটি পাইলটিং করা হয়েছে। এরপর ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এক কথায় শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের আগে প্রস্তুতির ঘাটতি ছিল না। এক্ষেত্রে সংকট যেটা ছিল সেটা শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের অভাব। এ বিষয়টি কাটিয়ে উঠতে কাজ চলছে।

নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে অভিভাবক ও শিক্ষকদের মাঝে নানা সমালোচনা রয়েছে। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন প্রশ্নে তিনি বলেন, আগে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল মুখস্থনির্ভর। কে কত ভালো মুখস্থ করছে তার ওপর নির্ভর করে ফলাফল তৈরি হতো। শিক্ষার্থীরা তখন পড়ত পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের জন্য। অল্প সময়ে ভালো ফলাফলের প্রচেষ্টাকে কাজে লাগিয়ে লাভবান হচ্ছিলেন কোচিং এবং গাইড বই ব্যবসায়ীরা। নতুন শিক্ষাক্রমে এ সুযোগটা থাকছে না। শিক্ষার্থীরা এখন হাতে-কলমে শিখবে। এ কারণে গাইড বই এবং কোচিংয়ের ব্যবসা কমে যাবে। ফলে তারা চাচ্ছে না এ শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন হোক। এছাড়া আমাদের কিছু অভিভাবক রয়েছেন যারা চান সন্তান সারা দিন স্কুল-কোচিং-হোম টিউটর নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। এখন যেহেতু স্কুলের শিক্ষাই যথেষ্ট, তারাও কিছুটা উদ্বিগ্ন। আবার এ শিক্ষাক্রমে প্রথম-দ্বিতীয়-তৃতীয় তথা সেরা শিক্ষার্থী, মেধাবী-মেধাহীন শিক্ষার্থীর কোনো বিষয় থাকবে না। আগে যার অর্থ ছিল তার সন্তানের ভালো ফলাফলে সম্ভাবনা বেশি ছিল, কিন্তু এখন শহরের ধনী ব্যক্তির সন্তান যেভাবে যা শিখবে প্রান্তিক অঞ্চলের দরিদ্র ব্যক্তির সন্তানেরও তেমন শিক্ষারই সুযোগ থাকবে। ফলে স্কুলগুলোর মধ্যে ফলাফলের মাধ্যমে সুনাম অর্জনের যে প্রবণতা ছিল সেটি আর হবে না। তাই স্বনামধন্য কিছু স্কুলও চায় না এটি বাস্তবায়ন হোক।

তিনি আরও বলেন, আর এ শিক্ষাক্রম নিয়ে বেশকিছু গুজব ছড়ানো হয়েছে। যেমন বলা হচ্ছে, এ শিক্ষাক্রমে কোনো হোমওয়ার্ক থাকবে না। কিন্তু এটি সত্যি নয়। বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা যা শিখে আসবে সেটি তো তাদের বাসায় চর্চা করতে হবে। বিভিন্ন রিপোর্ট তৈরির জন্যও তাদের বাসায় সে বিষয়ে কাজ করতে হবে। তবে এখানে বিষয় হলো, তাদের আলাদা কোচিং করতে হবে না, বাড়িতে শিক্ষকের প্রয়োজন হবে না, স্কুলেই সব শেখানো হবে। আরেকটি গুজব ছড়ানো হয়েছে যে ধর্মীয় শিক্ষা তুলে দেয়া হয়েছে। এটিও সত্যি নয়। ধর্মীয় শিক্ষা এখনো রয়েছে। পার্থক্য হলো, আগে যেখানে মুখস্থ করানো হতো—নামাজ কয় ওয়াক্ত, এখন সেখানে দেখা হবে সে নামাজ পড়তে জানে কিনা। তাকে নামাজ পড়ে দেখাতে হবে।

শিক্ষা উপমন্ত্রী বলেন, আরেকটি গুজব হলো পরীক্ষা থাকবে না। এটিও সঠিক নয়। প্রচলিত পরীক্ষা না থাকলেও বছরব্যাপী মূল্যায়ন কিন্তু থাকবে। আগে শিক্ষার্থীরা ফেল করলে আমরা সর্বোচ্চ কী ব্যবস্থা নিতাম? তাদের এমপিও বাতিল করতাম, বেতন বন্ধ করতাম। এত শিক্ষার্থীর শিখন ঘাটতি তো পূর্ণ হতো না। কিন্তু এখন যেটা হবে ছয় মাস পরপর যখন শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন প্রতিবেদন পর্যালোচনা করা হবে তখন সেখানে শিখন ঘাটতি থাকলে তা ধরা পড়বে এবং তাৎক্ষণিক শিক্ষকদের কৈফিয়তের আওতায় এনে শিখন ঘাটতি কাটিয়ে ওঠার ব্যবস্থা নেয়া যাবে। আমাদের এ শিক্ষাক্রমে দেশে শিক্ষা নিয়ে যারা কাজ করেন সেসব শিক্ষাবিদ যুক্ত ছিলেন। এর সঙ্গে ইউনিসেফও যুক্ত আছে। উন্নত বিশ্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই এ শিক্ষাক্রম তৈরি করা হয়েছে।

নতুন শিক্ষাক্রমে নবম-দশম শ্রেণীতে বিজ্ঞানশিক্ষায় নম্বর ১০০-তে নামিয়ে আনা হয়েছে। শিক্ষাবিদরা বলছেন, এত উচ্চ মাধ্যমিকে বিজ্ঞানশিক্ষা তাদের জন্য কঠিন হয়ে যাবে এবং শিক্ষার্থীরাও বিজ্ঞানশিক্ষায় আগ্রহ হারাবে কি’না এমন প্রশ্নে নওফেল বলেন,  মাধ্যমিকে বিজ্ঞান শিক্ষায় নম্বর কমানো হলেও এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী তাদের যতটুকু বিজ্ঞান শেখা প্রয়োজন সেটি তাদের শেখানো হবে। আগে যেটা হতো আমাদের বেশির ভাগ শিক্ষার্থীকে বিজ্ঞানের তেমন কিছুই শেখানো হতো না আর কিছু শিক্ষার্থীকে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি শেখানো হতো। এ বেশি শেখানোর ফলে কিছু শিক্ষার্থী এত প্যানিকড হয়ে যেত যে মাধ্যমিকে বিজ্ঞান নিয়ে পড়েও উচ্চ মাধ্যমিকে আর বিজ্ঞান নিত না। এখন সেটি হবে না। বয়স অনুযায়ী আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী যতটুকু বিজ্ঞান শেখা প্রয়োজন তার এর কমও শিখবে না, বেশিও শিখবে না। আর এখন যেহেতু তারা শুধু মুখস্থনির্ভর নয়, বরং হাতে-কলমে শিখবে তাই পরবর্তী সময়ে বিজ্ঞান নিয়ে পড়তে আরো বেশি আগ্রহী হবে।

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/২৭/১০/২০২৩    

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়