নজিরবিহীন সঙ্কটে সংবাদপত্র শিল্প

নিজস্ব প্রতিবেদক।।

নজিরবিহীন সঙ্কটের মুখে পড়েছে দেশের সংবাদপত্র শিল্প। এ শিল্পের প্রধান কাঁচামাল নিউজপ্রিন্টের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে স্থানীয় নিউজপ্রিন্টের দাম বেড়েছে শতভাগ। গত বছর অক্টোবর শেষে যেখানে প্রতি টন নিউজপ্রিন্ট গড়ে ৫৩ হাজার টাকায় বিক্রি হতো, গতকাল ২৩ নভেম্বর তা বেড়ে হয়েছে কাগজের মিলভেদে ৯৭ হাজার থেকে ৯৮ হাজার টাকা। আর এই নিউজপ্রিন্ট গ্রাহকের কাছে বিক্রি হয়েছে ১ লাখ ১ হাজার টাকা পর্যন্ত। অর্থাৎ প্রতি টন স্থানীয় নিউজপ্রিন্টের দাম এক বছরের ব্যবধানে বেড়েছে প্রায় শতভাগ। আমদানিকৃত নিউজপ্রিন্টের দাম বাড়ার হার আরো বেশি।
সংবাদপত্র শিল্পের প্রধান কাঁচামাল নিউজপ্রিন্টের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় হুমকির মুখে পড়েছে দেশের এ শিল্প। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশের চলমান পরিস্থিতিতে এক দিকে এ শিল্পের অন্যতম আয়ের খাত বিজ্ঞাপন থেকে রাজস্ব অর্ধেকে নেমে গেছে, এর ওপর নিউজপ্রিন্টের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যে অর্থসঙ্কটে অনেক পত্রিকার কলেবর ছোট হয়ে এসেছে। অনিয়মিত হয়ে পড়েছে ছোটখাটো অনেক পত্রিকা ছাপানো। দাম বৃদ্ধির ধারা চলতে থাকলে অনেক পত্রিকা ছাপানোই বন্ধ হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এ দিকে, নিউজপ্রিন্টের দাম আরো কতটা বাড়বে তার কোনো সদুত্তর নেই মিলারদের কাছে। গতকাল একটি কাগজের মিলের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সংবাদপত্রের নিউজপ্রিন্টের দাম কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই তা এক লাখ ২০ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। কারণ, কাঁচামাল সঙ্কটের পাশাপাাশি এক সাথে নিউজপ্রিন্টের চাহিদা অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে। সামনে স্কুল কলেজের নতুন বই, নতুন বছরের খাতা, গাইড ইত্যাদি ছাপানোর চাহিদা রয়েছে। পাশাপাশি ফেব্রুয়ারি মাসে বই মেলাকে কেন্দ্র করে নতুন নতুন বই ছাপানোর চাহিদা বেড়ে গেছে। সব মিলেই এক সাথে কাগজের চাহিদা বেড়ে গেছে। পাশাপাশি নতুন শাড়ি, কাপড়ে আগে যেখানে পুরনো পত্রিকা ব্যবহার হতো, এখন সেখানে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নতুন নিউজপ্রিন্ট ব্যবহার হচ্ছে। এভাবে সব ধরনের কাগজের চাহিদা বেড়ে গেছে। কিন্তু যে হারে নিউজপ্রিন্টের চাহিদা বাড়ছে ওই হারে উৎপাদন হচ্ছে না। নিউজপ্রিন্ট উৎপাদনকারী বেশ কয়েকটি মিল পাঠ্য বইয়ের কাগজ উৎপাদন করায় নিউজপ্রিন্টের সঙ্কট আরো বেড়ে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের সংবাদপত্র শিল্পে।

এ দিকে, নিউজপ্রিন্টের দাম বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ হারে সংবাদপত্র শিল্পের অন্যান্য উপকরণ কালি, প্লেট ইত্যাদির দাম বেড়েছে। এর ফলে সংবাদপত্রের উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে। এ ব্যয় বেশির ভাগ পত্রিকায়ই বহন করতে হিমশিম খাচ্ছে। অনেক পত্রিকাই অর্থ সঙ্কটে এর কলেবর অর্ধেকে নামিয়ে এনেছে। আগে যেখানে প্রতিদিন ২০ পৃষ্ঠা ছাপা হতো, এখন তা ১২ থেকে ১৬ পৃষ্ঠায় নামিয়ে আনা হয়েছে। শুধু ছাপানোর কলেবরই কমানো হয়নি, পত্রিকা শিল্পের সাথে জড়িত সাংবাদিক, কর্মকর্তা, কর্মচারীর বেতন-ভাতাতেও টান পড়েছে। অনেক পত্রিকার জনবলের বেতন-ভাতা বকেয়া পড়ে গেছে। সব মিলেই এ শিল্পের সামনে এগুনো কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
দেশের কাগজ ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের কথা বলে জানা গেছে, গত এক মাস ধরেই সবার মুখে মুখে ছিল নতুন পাঠ্যবই ছাপা নিয়ে সঙ্কটের বিষয়ে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে খবর ছিল মূলত পাঠ্যবই ছাপানোর বাইরে মূল সঙ্কট কাগজের দুষ্প্রাপ্যতা নিয়ে। পাঠ্যবই ছাপানোর পর্যাপ্ত কাগজেরও মজুদ নেই। ডলার সঙ্কটের কারণে এলসি বন্ধ থাকায় দেশের বাইরে থেকে কাগজ এমনকি দেশীয়ভাবে উৎপাদনকারী কাগজ কলগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালই আমদানি করা যাচ্ছে না। ফলে দেশে এখন সব ধরনের কাগজেরই সঙ্কট তৈরি হয়েছে। সংবাদপত্র ছাপানোর কাজে ব্যবহারের জন্য নিউজপ্রিন্টের দাম গত সেপ্টেম্বরে ছিল ৬৫ টাকা। এমনকি গত ১ নভেম্বরেও প্রতি কেজি কাগজের দাম ছিল ৮৩ টাকা। মাত্র ২০ দিনের ব্যবধানে তা বেড়ে হয়েছে ১০১ টাকা। আগামী সপ্তাহে এই দাম ১২০ টাকা ছাড়িয়ে যাবে এমন আশঙ্কা করছেন কাগজ ব্যবসায়ীরা।

অন্য দিকে কাগজের বর্তমানের যে সঙ্কট এটা চাহিদার পিক সময়ের কারণেও অনেকটা তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন কাগজ ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রিন্টিং খাতের পিক সিজন। এই সময়ে নানা কারণে সঙ্কট আরো ঘনীভূত হয়েছে। এর মধ্যে এক নাম্বার হলো- কোনো ব্যাংক ঋণপত্র (এলসি) খুলছে না। ফলে কোনো কাঁচামাল আমদানি করা যাচ্ছে না। আবার যেসব কাঁচামাল স্বাভাবিক সরবরাহ ছিল সেগুলোর দামও কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, গ্যাস ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অভাবে কাগজ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে দেশে। প্রায় এক বছর ধরে কম-বেশি কাগজ নিয়ে সমস্যা থাকলেও এখন তা জটিল আকার ধারণ করছে। আগামী দুই মাস চরম পর্যায়ে সঙ্কট থাকবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। কাগজ শিল্প সংশ্লিষ্টদের অনেকে বলছেন, ডলার সঙ্কট না মিটলে এবং লেখা ও ছাপার কাগজে শুল্কহার না কমালে এই সমস্যা দীর্ঘায়িত হবে। অন্য দিকে উৎপাদন খরচ বাড়ায় সব ধরনের কাগজের দামও বাড়বে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যানুসারে, ‘বাংলাদেশে মোট ২০৬টি পেপার মিল। এর মধ্যে চলমান রয়েছে ৭০ থেকে ৭৫টি। এদের মধ্যে প্যাকিংয়ের জন্য বা গ্রাফ পেপার ইত্যাদি তৈরি করে কিছু পেপার মিল। যদি লেখা ও ছাপার কাগজের মিলের হিসেব মিলানো হয় দেখা যাবে তাহলে ৩০ থেকে ৩৫টা রয়েছে। তারা মাসে ২০ থেকে ২৫ হাজার মেট্রিকটন কাগজ বানায়, যা ব্যবহার হয়ে যায়। এ ছাড়া পাঠ্যবইয়ের কাগজ তো রয়েছেই।’ দেশের এই কাগজ সঙ্কটের মধ্যে মুদ্রণশিল্পের পাশাপাশি বিপাকে পড়েছে সংবাদপত্র শিল্পও। নিউজ প্রিন্টের দাম বৃদ্ধির কারণে সংবাদপত্রের খরচ বেড়েছে অনেক। গত কয়েক মাস ধরেই প্রতিনিয়ত দাম বাড়ছে। ফলে সংবাদপত্র শিল্পের প্রকাশনা ভয়াবহ সঙ্কটের মুখে পড়তে যাচ্ছে। পুরাতন ওয়েস্টেজের দামও অনেক বেড়েছে বলে জানান সংবাদপত্র প্রকাশনার সাথে জড়িতরা।

আল নূর পেপার মিলের কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন গতকাল বুধবার বিকেলে নয়া দিগন্তকে জানান, কাগজের বর্তমান কোনো বাজারমূল্য নেই। লাফিয়ে বাড়ছে কাগজের দাম। দুই সপ্তাহের ব্যবধানেই টনপ্রতি দ্বিগুণের বেশি দাম বেড়েছে। তবে আগামী এক মাস কাগজের চাহিদা বাড়তি থাকলেও ফেব্রুয়ারি মাসের পর কাগজের চাহিদা তুলনামূলকভাবে কমে যাবে বলে জানান তিনি।
এমএস এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী সাইদুর রহমান স্বপন জানান, কাগজের মূল সঙ্কট এখন কাঁচামালের দুষ্প্রাপ্যতা। আর বছরের এই সময়টাতে সবাই কাগজের চাহিদা বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড এনসিটিবি তাদের বোর্ডবই ছাপতেই অনেক কাগজের চাহিদা দেন। একই সাথে ফেব্রুয়ারি মাসকে সামনে রেখে নতুন বই প্রকাশকদেরও কাগজের চাহিদা বাড়ে। ফলে একসাথে সব চাপ থাকায় কাগজের চাহিদা বেড়ে যায় অনেকগুণ বেশি।

অন্য দিকে সংবাদপত্র প্রকাশনা শিল্পের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সব ধরনের কাগজের দাম কমানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব)। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাথে সংস্থাটির কার্যালয়ে গত জুনে চলতি অর্থবছরের ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রাক-বাজেট আলোচনায় জানানো হয়, সরকারের সহযোগিতা ছাড়া এ শিল্পের টিকে থাকা কঠিন। নোয়াব সংবাদপত্র শিল্পের জন্য নিউজপ্রিন্ট আমদানির ওপর ভ্যাটমুক্ত সুবিধা দেয়া অথবা সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ ভ্যাট নির্ধারণের দাবি জানিয়েছিল।
কাগজ কল মালিকপক্ষ বলছে, দেশে কাগজ সঙ্কটের এই সময় পাঠ্যবই ছাপার জন্য প্রায় এক লাখ ২০ থেকে ৩০ হাজার টন কাগজের চাহিদা রয়েছে সরকারের। এ ছাড়া বছরের শেষ দিকে এসে ডায়েরি, ক্যালেন্ডার ছাপানোর জন্যও বাড়তি কাগজের চাপও আছে। এই পরিস্থিতিতে মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলো শুল্কমুক্ত আমদানির অনুমতি চেয়েছে। তবে সরকার ডলার খরচ করে কাগজ আমদানি করতে দেবে না। দেশের কাগজ কলগুলোকে সরবরাহ নিশ্চিত করতে অনুরোধ জানিয়েছে সরকার।

অন্য একটি সূত্র জানায়, এলসি খুলতে না পারায় ‘অফসেট’ কাগজ বা উন্নত কাগজের জন্য ভার্জিন পাল্প আমদানি করতে পারছেন না কাগজ কল মালিকরা। তাই চাহিদা মতো কাগজ সরবরাহও করতে পারছেন না তারা। ভার্জিন পাল্প ছাড়া রিসাইকেল করে যারা নিউজপ্রিন্ট উৎপাদন করেন, তা চাহিদার তুলনায় খুবই কম। পাশাপাশি উৎপাদন খরচও বেড়ে গেছে। একইসাথে আম্বার পেপার মিল, লিপি পেপার মিল, টিকে পেপার মিল, মেঘনা পেপার মিল ও রশিদ পেপার মিল মালিকরা ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, টাকার মূল্যস্ফীতি, গ্যাস ও বিদ্যুৎসঙ্কটের কারণে তাদের উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে বলে সরকারকে জানিয়েছেন। বিশেষ করে গ্যাসসঙ্কটের কারণে মিলের উৎপাদনক্ষমতা এক-তৃতীয়াংশে নেমে গেছে বলে তারা জানিয়েছেন।

একটি পত্রিকার একজন নির্বাহী জানিয়েছেন, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে সংবাদপত্র শিল্পের প্রধান আয়ের খাত বিজ্ঞাপন থেকে আয় অর্ধেকে নেমে গিয়েছিল। কিন্তু করোনাভাইরাসের রেশ কাটতে না কাটতেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও ডলার সঙ্কটের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছে। যেহেতু দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে বিজ্ঞাপন আয় জড়িত। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়লে ও নতুন বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেলে নতুন নতুন শিল্পকারখানা গড়ে ওঠে। আর এ শিল্পের পণ্যের পরিচিতি ও বিক্রি বাড়াতে শিল্পোদ্যোক্তারা পত্রিকা, টিভিতে বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকে। কিন্তু চলমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগ কাক্সিক্ষত হারে হচ্ছে না। আর এ কারণে বিজ্ঞাপন থেকে আয় অস্বাভাবিক হারে কমে গেছে। সেই সাথে নিত্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেছে। আর এ কারণে পত্রিকা বিক্রিও কমে গেছে। সবমিলেই সংবাদপত্র শিল্পের আকাশে কালো মেঘের ছায়া পড়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এ থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হলো সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বাড়ানো ও তা ন্যায়ানুগ করা। সেই সাথে পত্রিকার উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির সাথে এর মূল্য সমন্বয় করা। অন্যথায় এ শিল্প টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়বে বলে তারা আশঙ্কা করেন।