দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি: তিন মাসে দাম বেড়েছে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত

নিউজ ডেস্ক।।

ঊর্ধ্বমুখী দ্রব্যমূল্যের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে হিমশিম খেতে হচ্ছে দেশের মানুষকে। নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্ত সবাই অর্থনৈতিক সংকটে। করোনা মহামারির ধাক্কা সামাল দিতে না দিতে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যবৃদ্ধি ও ডলারের দাম বেড়ে যাওয়া নতুন সংকট তৈরি করেছে। বাড়তি বাজার দরের এই পরিস্থিতিতে দিশেহারা সাধারণ মানুষ।

গত ৫ আগস্ট জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় তিন মাসের বাজার দর বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই তিন মাসে কোনো পণ্যের দাম কমেনি। বরং ক্রমাগত বেড়েই চলছে। চাল, ডাল, শাক-সবজি, মাছ, মাংস, ডিমসহ নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে ২০ থেকে ৭০ শতাংশ।

ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, কাটাবন, কলাবাগান, কাঁঠাল বাগানসহ রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে যে আটাশ চাল জুলাই মাসে প্রতি কেজি ৫২ থেকে ৫৫ টাকায় বিক্রি হতো, সেই চাল এখন ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। জুলাইয়ের ৮০ টাকা কেজির নাজিরশাইল ৯৫ টাকা কেজি, ৬৫ থেকে ৬৮ টাকার মিনিকেট ৭৫ টাকা কেজি এখন। এই হিসাবে তিন মাসের ব্যবধানে আটাশ চালে কেজিপ্রতি আট টাকা বেড়েছে, নাজিরশাইল চালে ১০ থেকে ১৫ টাকা এবং মিনিকেট চালের কেজিপ্রতি ৮ থেকে ১০ টাকা বেড়েছে। সার্বিকভাবে চালের বাজারে ১০ থেকে ১৬ শতাংশ বেড়েছে।

এছাড়া জুলাই মাসে লম্বা বেগুন প্রতি কেজি ৫০ টাকা থেকে ৭০ টাকা ছিল। সেই বেগুন এখন কেজিপ্রতি ৮০ থেকে ৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ৮০ থেকে ৯০ টাকার গোল বেগুন ১০০ থেকে ১১০ টাকা, ৯০-১১০ টাকার টমেটো ১৪০ টাকা, ৪০ টাকার পটল ৬০ টাকা, ৪০ টাকার শসা ৮০ টাকা, ৪৫-৫০ টাকার ঢেঁড়স কেজিপ্রতি ৬০-৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এই হিসাবে তিন মাসের ব্যবধানে সবজির দাম ১০ থেকে ৩০ শতাংশ বেড়েছে।

মাছের বাজারেও প্রায় একইচিত্র। জুলাই মাসে শিং মাছ আকার ভেদে ৩০০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি হয়, সেই মাছ এখন ৫২০-৭০০ টাকা। ১৫০ টাকার পাঙ্গাশ মাছ ১৮০ থেকে ২০০ টাকায় কেজি বিক্রি হচ্ছে। তিন মাসের ব্যবধানে মাছের মূল্য ১০ থেকে ২০ শতাংশ বেড়েছে।

অন্যদিকে একটি ডিম কিনতে ক্রেতাকে গুণতে হচ্ছে ১৩ টাকা। এক হালি ৫০ টাকা। আর এক ডজন ১৫০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। তবে জুলাই মাসে ৪০ থেকে ৪৫ টাকায় প্রতি হালি ডিম বিক্রি হয়েছে। ডজন ছিল ১২০ টাকা। তিন মাস আগে প্রতিটি ডিম কেনা যেত ১০ টাকায়।

এছাড়া, জুলাই মাসে গরুর মাংস প্রতি কেজি ৬৫০ টাকা, খাসির মাংস ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকা, মুরগি ১৪০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হয়। তবে এখন গরুর মাংস ৭০০ টাকা, খাসির মাংস ৯০০ থেকে ৯৫০ টাকা ও মুরগির কেজিপ্রতি ১৭০ থেকে ১৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

মুদি দোকান ঘুরে দেখা গেছে, সাদা চিনি প্রতিকেজি ৯৫ টাকা, লাল চিনি ১১০ টাকা, দেশি পেঁয়াজ প্রতিকেজি ৫০ থেকে ৬০ টাকা, ইন্ডিয়ান পেঁয়াজ কেজিপ্রতি ৬০ থেকে ৬৫ টাকা, দেশি মসুর ডাল ১৪০ টাকা, ইন্ডিয়ান মসুর ডাল ১২০ টাকা কেজি, মুগডাল ১১৫ টাকা, বুটের ডাল কেজিপ্রতি ১০০ টাকা, দেশি রসুন ৮০ থেকে ৯০ টাকা, চায়না রশুন ১২০ টাকা, আদা ১৪০ টাকা, তীর আটা প্রতি কেজি ৬২ টাকা, ময়দা কেজিপ্রতি ৭৫ টাকা, সয়াবিন তেল এক লিটার ১৭৮ টাকা, সয়াবিন তেল পাঁচ লিটার ৮৮০ টাকা, আর খোলা সয়াবিন তেল ১৬২ থেকে ১৬৫ টাকা, এসইআই ও ফ্রেস লবণ প্রতিকেজি ৩৮ টাকা, ৫০ গ্রাম রাঁধুনি পাঁচ ফুরন গুড়ো ২২ টাকা, ২০০ গ্রাম রাঁধুনি ধনিয়া গুড়ো ৬০ টাকা, ২০০ গ্রাম রাঁধুনি গুড়ো জিরা ১৭০ টাকা, ৪০ গ্রাম রাঁধুনি গরম মশলা ৬৮ টাকা, ২০০ গ্রাম রাঁধুনি গুড়ো হলুদ ৯০ টাকা, ২০০ গ্রাম রাঁধুনি গুড়ো মরিচ ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত তিন মাসে এসব পণ্যের দাম ৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

অন্যান্য পণ্যের মধ্যে তিন মাসের ব্যবধানে ১২৫ গ্রামের ডেটল সাবান ৫০ টাকা থেকে বেড়ে ৭৫ টাকা, সেভলন সাবান ৫৫ থেকে বেড়ে ৬৫ টাকা, ডাব সাবান ১২৫ থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, লাক্স সাবান ৫৫ থেকে বেড়ে ৭০ টাকা, কসকো সাবান ৩০ থেকে বেড়ে ৪৫ টাকা, তিব্বত সাবান ৩৮ থেকে বেড়ে ৪২ টাকা, ১২৫ গ্রাম হুইল সাবান ২০ থেকে বেড়ে ৩০ টাকা, রিন পাউডার কেজিপ্রতি ১৩০ থেকে ১৮০ টাকা, পেপসোডেন্ট ১০০ গ্রাম ৮৫ থেকে বেড়ে ৯০ টাকা, ক্লোজআপ ১০০ গ্রাম ৮৫ থেকে বেড়ে ৯৫ টাকা, গ্লো অ্যান্ড লাভলি ১২৫ থেকে বেড়ে ১৪৫ টাকা, গ্লো অ্যান্ড লাভলি ফেস ওয়াশ ১৫০ থেকে বেড়ে ১৬০ টাকা করা হয়েছে।

সাংস্কৃতিক কর্মী শেখ আনিছুর রহমান আনিস বলেন, জুলাইয়ে ডেটল সাবানের মিনিপ্যাক ১০ টাকায় কিনতাম, এখন ১৫ টাকায় কিনতে হয়। এরকম সব ধরনের পণ্যের দাম বেড়েই চলছে। মাস শেষে সব মিলিয়ে অতিরিক্ত খরচ হয়ে যায়।

শান্তি নগর এলাকার ক্রেতা ওবাইদুর রহমান রাজু  বলেন, চাল, ডাল, মাছ, মাংস, শাক-সবজি, ডিমসহ সবকিছুর দাম সীমাহীন বেড়েছে। এখন কোনো কিছু কিনতে গেলেও মানিব্যাগ দেখতে হয় অনেক বার। সব কিছুর মূল্য ১০, ২০ এমনকি ৫০-৬০ টাকাও বেড়েছে। এ রকম বাজারের অবস্থা থাকলে তো জীবন চালাতে অসুবিধায় পড়ে যাবো।

কারওয়ান বাজার এলাকার সবজি বিক্রেতা মো. ফজুলর রহমান  বলেন, ক্রেতা বিপদের মধ্যে আছে সেটা সবাই জানে। কিন্তু আমার মতো বিক্রেতারাও যে অনেক সমস্যার মধ্যে আছে এই কথা কেউ বলে না। আমরাও বেশি দামে কিনতে হয়। তাহলে দেখা গেলো বেশি টাকা ব্যবসায় পুঁজি দিতে হয়।

ফজুলর রহমান বলেন, জুলাই মাসের পর থেকে নভেম্বর মাস এসে ঢুকলো। তারপরও বাজারের মূল্যবৃদ্ধি। আগে দুই লাখ খাটালে হয়ে যেতো এখন তিন লাখ টাকা খাটানোর পরও আরো লাগে। তার মানে শুধু ভোক্তা নয়, আমরাও মহাবিপদের মধ্যে আছি।

কাঁটাবন এলাকার ক্রেতা মো. আকবর হোসেন ঢাকা টাইমসকে বলেন, বাজারে গেলেই সমস্যায় পড়তে হয়। চাল কিনলে মাছ কিনতে হিমশিম খেতে হয়। এর মধ্যে শাক-সবজি, মশলা কিনতে গেলেই জান বেরিয়ে যায়। দ্রব্যমূল্যের এমন লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি আর কতো চলবে!ঢাকা টাইমস