দ্বৈতসত্তা বর্জন, নির্লোভ ও নিরাসক্ত হওয়ার আহ্বান

৪০তম রবীন্দ্র সংগীত সম্মেলন

বিশ্বজুড়ে সাম্প্রদায়িকতাকে কেন্দ্র করে দিকে দিকে যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত, এ নিয়ে আকরম হোসেন বলেন, ‘সমাজে যে “আমি”র জন্ম হয়েছিল, সেই “আমি”র প্রথম জিনিসটা হলো লোভ। লালসার কারণে প্রযুক্তিকে অন্তর্গত করে একটি আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে ক্রমে মানুষের সুকুমারবৃত্তি, কল্যাণবোধ, মানবধর্মকে বিনষ্ট করার জন্য সচেষ্ট থেকেছে সেই “আমি”। এই শক্তিটি সংগীত, শিল্প, সাহিত্য বা সামগ্রিকভাবে নন্দনতত্ত্বের চর্চাকে বিনষ্ট করে মানুষকে শাসন-শোষণ ও প্রতিবাদহীন করে তোলার প্রয়াস নিয়েছে।’

সকাল সাড়ে ৯টায় বোধনসংগীত ‘আপনি অবশ হলি, তবে বল দিবি তুই কারে’গেয়ে শিল্পীরা শুরু করেন উত্সব। বিভিন্ন সময়ে জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদের সঙ্গে যুক্ত হওয়া ৪০ জন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব প্রদীপ প্রজ্বালনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা করেন। এ সময় সম্মিলিত কণ্ঠে শিল্পীরা গাইছিলেন ‘আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে’ গানটি।

স্বাগত বক্তব্যে সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক বুলবুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের অত্যন্ত কাঙ্ক্ষিত সম্মেলন এটি। সমাজের ভেতর শুভশক্তির জন্ম নিক, মানুষের ভেতরে সাংস্কৃতিক বোধের উদয় হোক এবং শিশুদের মধ্যে সংগীতের পিপাসা তৈরি হোক, সেই লক্ষ্যে আমরা এতটা বছর ধরে কাজ করে যাচ্ছি। সমাজে অশুভ শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। আমরা ঘুরেফিরে একই কথাই বলতে চাই, আমরা সম্প্রীতির বাংলাদেশ চাই।’

সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আতিউর রহমান বলেন, ‘একাত্তরের কোটি মুক্তিযোদ্ধার কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের গানের অনুভব আমরা লক্ষ করেছি। স্বদেশ পর্যায়ের গানগুলোয় তিনি যে মুক্তির ডাক দিয়েছেন, তা অনুরণিত হতে দেখেছি একাত্তরে। ‘আমাদের যাত্রা হলো শুরু’, ‘আমি ভয় করব না ভাই, করব না’, ‘সার্থক জনম আমার’, ‘ও আমার দেশের মাটি’সহ অসংখ্য গানের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের হীরন্ময় সময়ে আমরা রবীন্দ্রনাথকে কাছে পেয়েছি। তরুণ প্রজন্মকে তিনি ডাক দিয়ে বলেছেন, ‘ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা, আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা’। তারুণ্যের প্রতি এই আস্থাই আমাদের মুক্তির বড় উপায়, তিনিই আমাদের শিখিয়ে গেছেন।’

বিশ্বে চলমান সংকটে বিশ্বকবির প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে আতিউর রহমান বলেন, ‘চলমান বিশ্বে অর্থনৈতিক ও সভ্যতার সংকট যখন দিনকে দিন প্রকট থেকে প্রকটতর হয়ে উঠছে, তা বোঝা ও মোকাবিলা করতে রবীন্দ্রনাথ ক্রমেই প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছেন। গ্রামীণ ও নাগরিক সংস্কৃতি বিকাশে দেশজ প্রয়োজন, রাজনৈতিক উদারতা তৈরির টেকসই জমিন তৈরি করা প্রয়োজন। সেখানে রবীন্দ্রনাথ প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছেন বাঙালির প্রতিদিনের জীবন চলায়।’

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর পরিবেশিত হয় আতিউর রহমান লেখা গীতি-আলেখ্য ‘সম্প্রীতির বাংলাদেশ’। দিনব্যাপী প্রতিযোগিতা ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের পর সন্ধ্যার তালিকায় রয়েছে আরও একটি গীতি-আলেখ্য ‘তোমায় নতুন করে পাব’। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যেসব গান রণাঙ্গনে গীত হয়েছে, সেসব গান নিয়ে এটি রচনা করেছেন মফিদুল হক।

আগামীকাল শনিবার বিকেলে ‘সম্প্রীতির সমাজ গঠনে সংস্কৃতির দায়’ শিরোনামে একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে। সম্মিলন পরিষদের সহসভাপতি সারওয়ার আলীর সভাপতিত্বে মূল প্রবন্ধ পাঠ করবেন মফিদুল হক। আলোচনায় অংশ নেবেন নাসির উদ্দীন ইউসুফ ও সাধন ঘোষ।

সম্মেলনের সমাপনী অধিবেশন রোববার বিকেল সাড়ে ৪টায়। সেদিন প্রধান অতিথি থাকবেন শিক্ষাবিদ সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। সমাপনী অধিবেশনে রবীন্দ্র পদক দিয়ে সম্মাননা জানানো হবে শিল্পী, শিক্ষক ও সংগঠক সর্বোপরি সংগীতসাধক নীলোত্পল সাধ্য ও মিতা হককে।

জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত প্রতিযোগিতায় কিশোর বিভাগের চূড়ান্ত পর্বটি অনুষ্ঠিত হয় শুক্রবার দুপুরে। সাধারণ বিভাগের প্রতিযোগিতা হবে শনিবার সকাল সাড়ে ৯টায়। এবারের সম্মেলনের তিন দিন সান্ধ্য-অধিবেশন সাজানো হয়েছে গুণীজনের সুবচন রবিরশ্মি, গীতি-আলেখ্য, আবৃত্তি, পাঠ, নৃত্য ও গান দিয়ে। বার্ষিক অধিবেশন উপলক্ষে যথারীতি প্রকাশিত হয়েছে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির নানা দিক নিয়ে বিশিষ্টজনদের লেখা প্রবন্ধের সংকলন ‘সংগীত সংস্কৃতি’।

১৯৭৯ সালে শিল্পী জাহিদুর রহিমের প্রয়াণ দিবসে কাজ শুরু করে ‘জাহিদুর রহিম স্মৃতি পরিষদ’। দেশব্যাপী বৃহত্তর পরিসরে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার লক্ষ্য নিয়ে পরে বাঙালির চিরকালের সঙ্গী রবীন্দ্রনাথের নাম যুক্ত করে সংগঠনটির নামকরণ হয় জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ। সংগঠনের মূল লক্ষ্য হয়ে ওঠে সব প্রতিবন্ধকতা দূর করে বাঙালির জাতীয় সংস্কৃতির সুষ্ঠু ও স্বাভাবিক বিকাশের ধারাকে সমৃদ্ধ ও গতিশীল করে তোলা।

প্রয়াত স্মরণীয় রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মী জাহিদুর রহিমের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য নিয়মিত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে দেওয়া হয় ‘জাহিদুর রহিম স্মৃতি পুরস্কার’। বর্তমানে সারা দেশে জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদের সক্রিয় শাখা রয়েছে ৮৪টি।