দেশ কীভাবে দেউলিয়া হয়?

নিজস্ব প্রতিবেদক।।

বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে ‘দেউলিয়া’র শাব্দিক অর্থ বলা হয়েছে ‘দেনা পরিশোধ করতে অক্ষম’, ‘নিঃস্ব’। দেউলিয়া শব্দের ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘ব্যাংক্রাফসি’ যা ইতালিয় শব্দ-যুগল থেকে এসেছে। এর অর্থ ‘ভাঙা বেঞ্চ’।

পৌরাণিক কাহিনী থেকে জানা যায়, প্রাচীনকালে বিনিয়োগকারী, অর্থলগ্নিকারী ও অর্থ বিনিময়কারীরা ভেনিসের শহরতলীর বিভিন্ন স্থানে বেঞ্চ পেতে বসতেন এবং মানুষকে সুদে টাকা ধার দিতেন অথবা তাদের বৈদেশিক মুদ্রা পরিবর্তন করে দিতেন। বলা হয়ে থাকে অর্থ বিনিময়কারী যদি তার দেনা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হতেন তবে তার বেঞ্চটি ভেঙে ফেলা হতো। এভাবেই ‘দেউলিয়া’ শব্দটির লোকমুখে ব্যবহার শুরু হয়।

দেউলিয়া শব্দটি ব্যক্তি প্রতিষ্ঠান কিংবা একটি দেশের জন্যও ব্যবহার করা হয়। পৃথিবীতে প্রথম ৩৭৭ খ্রিস্টাব্দে গ্রিসকে দেউলিয়া ঘোষণা করা হয়েছিল। সম্প্রতি ৪ এপ্রিল লেবাননের টেলিভিশন সংবাদমাধ্যম ‘আল জাদিদ’ চ্যানেলে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ লেবাননকে ‘দেউলিয়া রাষ্ট্র’ ঘোষণা করেন দেশটির উপপ্রধানমন্ত্রী সাদেহ আল শামি। দীর্ঘ দিন ধরেই দেশটিতে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা বিদ্যমান ছিল। এর জের ধরেই দেশটিকে দেউলিয়া ঘোষণা করা হয়।

লেবাননের অর্থনীতির পতন শুরু হয় ২০১৯ সালের অক্টোবর দেশটির দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের অবসানের পর থেকে। গৃহযুদ্ধে বিবাদমান পক্ষসমূহের নেতারা দেশটির রাজনৈতিক নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন এবং নিজেদের ক্ষমতা বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় নামেন। ফলে গৃহযুদ্ধ শেষ হলেও রাজনীতি নিয়ে নতুন করে আরেক যুদ্ধ শুরু হয় দেশটিতে। এদিকে দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে দক্ষিণ এশিয়ার আরেক দেশ শ্রীলঙ্কা।

কখন একটি দেশ দেউলিয়া হয়:

করপোরেট ফাইনান্স ইনস্টিটিউটের মতে, ‘একটি রাষ্ট্র তখনই দেউলিয়া হয়ে যায়, যখন তার সরকার নির্ধাারিত সময়ে ঋণ ও অন্যান্য প্রদেয় বিল পরিশোধে ব্যর্থ হয়।’
সাধারণত কোনো দেশে সামরিক অভ্যুত্থান কিংবা বিপ্লব সংঘটিত হলে রাষ্ট্র দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে। বিদায়ী সরকারের আর্থিক কর্মকান্ডের বৈধ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বকেয়া ঋণ ও পাওনা পরিশোধ বাতিল করে রাষ্ট্রকে দেউলিয়া ঘোষণা করতে পারে নতুন সরকার। তারল্য সংকটের কারণেও কোনো দেশ দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে। হতে পারে ওই দেশের কাছে অনেক সম্পত্তি রয়েছে কিন্তু সেগুলো তরল অর্থে রূপান্তর করা যাচ্ছে না। সেক্ষেত্রেও তারল্য সংকট তৈরি হতে পারে। রাষ্ট্রীয় দৈউলিয়াত্বের আরেক কারণ হতে পারে অসচ্ছলতা। পর্যাপ্ত আর্থিক সচ্ছলতার অভাবে ঋণ খেলাপি হয়ে গেলে রাষ্ট্র দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে। এছাড়াও আরো বেশ কিছু কারণ রয়েছে। যেমন ঋণের পরিমাণ বাড়তে থাকা, ঋণ পরিশোধে খরচ সাশ্রয় না করার পদক্ষেপ না নেওয়া, ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের উপর সরকারের কর্তৃত্ব বৃদ্ধি প্রভৃতি।

যখন কোনো দেশ দেউলিয়া হয় তখন কী ঘটে:

যখন একটি দেশ দেউলিয়া হয়ে যায় তখন দেশটিতে দেখা দেয় তীব্র বেকারত্ব, খাদ্য সংকট। রাষ্ট্রের কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন ভাতা দেওয়ার মতো অর্থ তাদের ভাণ্ডারে থাকে না। বিদেশে দেশটির বিরাট অঙ্কের ঋণ থাকলে সেই ঋণের জন্য প্রতিমাসে যেভাবে সুদ পরিশোধ করতে হতো সেটি তারা করতে পারে না। এছাড়া জাতীয় জীবনের কল্যাণের জন্য যেসকল অর্থ বিত্ত দরকার সেটিও থাকে না দেশটির কোষাগারে। ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি ও খাদ্য সংকটে জনজীবন দূর্বিষহ হয়ে ওঠে। রোজই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম।

যেসব দেশ আগে দেউলিয়া হয়েছিল:

শুধু লেবানন কিংবা শ্রীলঙ্কাকে ঘিরে রাষ্ট্রের দেউলিয়াত্বের বিষয়টি সামনে এসেছে তা কিন্তু নয়। মহামারি করোনার থাবায় কুলাতে না পেরে ২০২১ সালে রাষ্ট্রের দেউলিয়াত্ব ঘোষণা করে ব্রাজিল। ইউরোপের প্রায় অর্ধেক দেশ, আফ্রিকার ৪০ শতাংশ দেশ এবং এশিয়ার প্রায় ৩০ ভাগ দেশ নানা সময়ে দেউলিয়া হয়েছে গত দুই শতকে। এই তালিকায় কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, জাপান, যুক্তরাজ্য এবং চীনও আছে। তবে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশিবার দেউলিয়া হয়েছে ইকুয়েডোর। মোট ১০বার দেশটি নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করেছে। ১৯৯০ এবং ২০০১ সালে নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করে রাশিয়া। তবে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে- কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দেউলিয়াত্ব আর রাষ্ট্রের দেউলিয়া ঘোষণা কিন্তু এক বিষয় নয়। কোনো কোম্পানি দেউলিয়া হলে তার স্থাবর, অস্থাবর সব সম্পত্তি জব্দ করতে পারে আন্তর্জাতিক আদালত। তবে রাষ্ট্র দেউলিয়া হলে সেই এখতিয়ার নেই আদালতের।