দূর্ণীতিগ্রস্ত শিক্ষা ব্যবস্থা

প্রকাশিত: ৬:২৫ অপরাহ্ণ, শনি, ৯ অক্টোবর ২১

ড. আব্দুল লতিফ মাসুমঃ

দুর্নীতির মহামারী গ্রাস করেছে সমগ্র সমাজকে। বাংলাদেশের এক ইঞ্চি জমিও খালি নেই যেখানে দুর্নীতির বীজ রোপিত হয়নি। এই দুর্নীতির বীজের সোপান হচ্ছে রাজনীতি। একসময় রাজনীতি ছিল সেবার ব্রত, এখন রাজনীতি হচ্ছে অর্থবিত্তের স্রোত। রাজনীতি থেকে নীতিনৈতিকতা, সেবা, কল্যাণচিন্তা, সদাচার ও সততা বিদূরিত হয়েছে। এখন আর রাজনীতি দেশাত্মবোধকে ধারণ করে না। সততার বদলে শঠতা, প্রেমের পরিবর্তে প্রতারণা, বিনয় বিদায় দিয়ে বিকৃতি এবং সদ্ভাব তাড়িয়ে সন্ত্রাস রাজনীতির নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে। কালো টাকার রাজত্ব সর্বত্র। রাজনীতি যেহেতু রাষ্ট্রপরিচালনা করে সুতরাং জাতি, সমাজ ও জনপথ সর্বত্র এর প্রতিফলন হবে এটাই স্বাভাবিক। যেহেতু দুর্নীতি আকণ্ঠ নিমজ্জিত রাষ্ট্রতরণী, আর সেহেতু শিক্ষা যখন রাষ্ট্রেরই অংশ, তখন শিক্ষা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়ে পারে না। শিক্ষানীতির লক্ষ্য উদ্দেশ্য যদি বিবেচিত হয়, তাহলে আমরা দেখব সেখানে নীতিনৈতিকতার কোনো লালন নেই। বরং বস্তুগত লোভ-লালসা, হিংসা-প্রতিহিংসা এমনকি কামনা-বাসনার অনুশীলন, অনুসরণ ও অনুশাসন চলছে।

শিক্ষার প্রাথমিক স্তর বিপর্যস্ত। মাধ্যমিক স্তর দুর্নীতিগ্রস্ত। উচ্চশিক্ষা প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত। শিক্ষা প্রশাসন খড়গহস্ত। সুশাসন ও শুভকামনা অস্তমিত। সর্ব অঙ্গে ব্যথা, মলম দেবো কোথা! বিগত ৫০ বছরে বিশেষত গত ১৩ বছরে শিক্ষার যে সর্বনাশ হয়েছে, তার পুনরুদ্ধার একরকম অসম্ভব বলেই মনে হয়। তাই খোদ সরকারি মহলে এবং সর্বত্র অপারেশনের আওয়াজ উঠেছে। বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে সর্বনাশের যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তারই এক বাস্তব উদাহরণ পাওয়া যায় গত সপ্তাহে টিআইবির সম্পাদিত প্রতিবেদনে। এ চিত্র রীতিমতো ভয়াবহ। মাধ্যমিক শিক্ষার বিভিন্ন দিক-স্বীকৃতি, শিক্ষক নিয়োগ, বদলি, নিরীক্ষা, পরিদর্শন ও পাঠদান সর্বত্র দুর্নীতির ছড়াছড়ি। প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে যে, এ ক্ষেত্রে রাজনীতিই দুর্নীতির প্রধান কারণ। শিক্ষাদানের পরিবর্তে রাজনীতিকরণই সেখানে মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুর্নীতি তথা অনৈতিকতার বিস্তার রাষ্ট্রযন্ত্রকে উইপোকার মতো খেয়ে খেয়ে ভেতরে ভেতরে ফোকলা করে ফেলেছে। এর অবয়ব বা কাঠামোটিই বেঁচে আছে মাত্র। সবাই বুঝি যে ব্যক্তি নষ্ট হলে, সমষ্টি নষ্ট না হয়ে পারে না। সমষ্টি যদি পদ্ধতিগতভাবে দুর্নীতিকে নীতি হিসেবে গ্রহণ করে তবে ব্যক্তি অসহায় হয়ে পড়ে। অপর দিকে ব্যক্তি শুদ্ধাচারে যদি বিশ্বাস না করে, তাহলে পদ্ধতি বিফল হতে পারত।

‘মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়ন : সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক টিআইবির প্রতিবেদনটি ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। মাধ্যমিক শিক্ষায় ঘুষ-বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অনিয়ম দূর করতে বেসরকারি শিক্ষক কমিশনের মাধ্যমে সম্পন্ন করাসহ মোট ২০টি সুপারিশ করে টিআইবি। প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামন বলেন, শিক্ষক নিয়োগ-বদলি, এমপিওভুক্তি, পাঠদান অনুমোদন ইত্যাদি ক্ষেত্রেও দুর্নীতির বিষয়টি সত্যিই উদ্বেগজনক। এ ধরনের অনিয়ম দুর্নীতি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের পথে বড় রকমের অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ হয়েছে। ইফতেখার জানান, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই গবেষণাগুলোর সুপারিশ গুরুত্বসহকারে নেবে বলে তিনি আশা করেন। উল্লেখ্য, বিগত বেশ কিছু বছর ধরে বার্লিনভিত্তিক দুর্নীতি নিরোধ প্রতিষ্ঠান টিআইবি বাংলাদেশসহ বিশে^র বেশির ভাগ দেশের দুর্নীতির অবস্থান নিয়ে কাজ করছে। বাংলাদেশে তাদের গবেষণা যথেষ্ট আলোচনা ও সমালোচনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব ক্ষেত্রে প্রতি বছরই প্রতিটি সরকার তাদের গবেষণাকে ‘অসত্য ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে অভিহিত করে আসছে। কিন্তু বিদ্বজ্জন মহল তথা সিভিল সোসাইটিতে তাদের এই গবেষণা ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে আসছে।

মাধ্যমিকের এই গবেষণা প্রকাশিত হওয়ার পর যথারীতি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর একে নাকচ করেছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট পর্যায় থেকেও নেতিবাচক মন্তব্য এসেছে। যা হোক, টিআইবি গবেষণায় ভুলত্রæটি থাকতে পারে। কিন্তু এর সারবত্তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। টিআইবি এই গবেষণাকে ‘গুণগত’ বলেছে। এ জন্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উভয় উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। পাশাপাশি কিছু কিছু ক্ষেত্রে পরিমাণ তত্তে¡র ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ৩২৫ জন মুখ্য তথ্যদাতার সাক্ষাৎকার এবং মাধ্যমিক অধিদফতরের বিভিন্ন পর্যায়ের কার্যালয়, ১৮টি উপজেলার ৫৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে তথ্য সংগ্রহ করে তার ভিত্তিতে গবেষণা কর্মটি শেষ করা হয়েছে। ২০১৯ সালের মে মাস থেকে অক্টোবর পর্যন্ত তথ্য সংগ্রহের পর ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ পর্যন্ত তা যাচাই ও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, দেশে ২০ হাজারেরও অধিক মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে। শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী প্রকাশিত প্রতিবেদন সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, সার্বিকভাবে শিক্ষা প্রশাসনে দুর্নীতি একটি চ্যালেঞ্জ। সবাইকে জবাবদিহির আওতায় আনা কঠিন। তিনি আরো বলেন, শিক্ষা প্রশাসনের কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন। সরকার সেই কাঠামোগত সংস্কার আনার চেষ্টা করছে। ঘুষের বিনিময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর এমপিওভুক্তির অভিযোগ রয়েছে ওই প্রতিবেদনে। মোট চার ধাপে এমপিওভুক্তির প্রতিটি ধাপেই ঘুষের আদান-প্রদান হয় বলে টিআইবির গবেষণায় উঠে এসেছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষক এমপিওভুক্তির জন্য পাঁচ হাজার টাকা থেকে এক লাখ পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়। প্রকাশিত প্রতিবেদনে ‘চমকপ্রদ’ তথ্য হলো, প্রধান শিক্ষক পদে মনোনয়নে ১৫ লাখ পর্যন্ত ঘুষের প্রমাণ। স্থানীয় পর্যায়ের এসব নিয়োগে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক তদবির, স্বজনপ্রীতি ও নিয়মবহিভর্র্‚ত টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
এসব নিয়োগে আগে থেকে পছন্দের প্রার্থী সম্পর্কে নিয়োগ বোর্ডকে বলে দেয়া হয়। আর সেভাবেই তারা নম্বর দিয়ে থাকেন। এসব টাকার লেনদেন হয় রাজনৈতিক নেতা ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির মধ্যে। টিআইবি বলছে, এনটিআরসিএর সুপারিশ করা, সহকারী শিক্ষকদেরও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যোগদানে দুই লাখ থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। সাধারণত একজন সরকারি চাকরিজীবীকে তিন বছর পর বদলি করাই নিয়ম। অনেকে দীর্ঘকাল একই স্থানে কর্মরত আছেন। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, রাজধানীর ২৫টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৩৭ জন শিক্ষক টানা ২৭ বছর একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন। টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষক বদলিতে এক লাখ থেকে দুই লাখ টাকা দিতে হয়। এই টাকা দিতে হয় মধ্যস্বত্বভোগী, মাধ্যমিক অধিদফতরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের। এই রিপোর্টে বলা হয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন ও নিরীক্ষায় উত্থাপিত আপত্তিতে নিষ্পত্তিতে ‘ব্যাপক’ ঘুষ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা বোর্ডের মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদান ও অ্যাকাডেমিক পাঠদান ও স্বীকৃতির অনুমোদন দেয়া হয়। প্রতিষ্ঠানের পাঠদানের অনুমোদনের জন্য এক লাখ থেকে শুরু করে পাঁচ লাখ টাকা দিতে হয়। রিপোর্টে আরো বলা হয়, মাধ্যমিক শিক্ষা খাতে শিক্ষকদের পদোন্নতিতে দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে। দীর্ঘ দিন পদোন্নতি না হওয়ায় শিক্ষকদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হয়। পাঠদানে তারা উৎসাহ হারান। মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। একজন প্রভাষক যতই অভিজ্ঞ হন না কেন, তার কেবল সহকারী অধ্যাপক পদ পর্যন্ত পদোন্নতির সুযোগ রয়েছে।

শিক্ষা খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনতে টিআইবি ২০টি সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে শিক্ষানীতি-২০১০-এর আলোকে পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন। মাঠপর্যায়ে সরাসরি রাজস্ব খাতের আওতাভুক্ত সমন্বিত জনবল কাঠামো তৈরি করতে হবে। মাধ্যমিকের সব শিক্ষককে কোভিড-১৯ টিকার আওতায় আনতে হবে। অনলাইনে শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে। ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের ফিরিয়ে আনতে হবে। শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতি পূরণে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। এ ছাড়াও ইউনেস্কোর সুপারিশ অনুযায়ী জাতীয় বাজেটের শিক্ষা খাতে ব্যয়বৃদ্ধি করতে হবে। সব শিক্ষকদের আর্থিক সুবিধাদি বাস্তবতার নিরিখে বৃদ্ধি করতে হবে। লিখিত এসব সুপারিশের সাথে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান আরো সুপারিশ পেশ করে বলেন, মাধ্যমিক শিক্ষা খাতে এখনো সুষ্ঠু জবাবদিহি ও তদারকি ব্যবস্থা পর্যাপ্ত মাত্রায় প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সরকারি ক্রয়ে ই-জিপি বহুল প্রচলিত হওয়ায়ও মাধ্যমিক শিক্ষা খাতে এখনো শুরু হয়নি। ফলে অনিয়ম-দুর্নীতি চলছেই। সরকার ও সংশ্লিষ্ট সবাই কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে শিক্ষা খাতে এসব ঘাটতি দূর করবেন বলে তিনি আশা করেন।

আমরা আগেই বলেছি, সামগ্রিকভাবে দেশ-জাতি-রাষ্ট্র সর্বগ্রাসী দুর্নীতির কবলে নিমজ্জিত। পাঠক সাধারণ এই কলামে শুধু মাধ্যমিক শিক্ষা ক্ষেত্রে দুর্নীতির সামান্য বিবরণ জানলেন। দেশের সব ক্ষেত্রের মতো শিক্ষার অন্যান্য স্তর- প্রাথমিক, মাদরাসা, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় দুর্নীতির প্লাবনে আকণ্ঠ প্লাবিত। সর্বত্রই দুর্নীতির মহামারী। শিক্ষা যদি ‘জাতির মেরুদণ্ড’ হয়ে থাকে তাহলে অবিলম্বে অন্তত শিক্ষা ক্ষেত্র থেকে দুর্নীতির মূলোৎপাটন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে যত বিলম্ব হবে ততই নতুন প্রজন্মের সর্বনাশ সাধিত হবে। বিশেষ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তথা শিক্ষার্থীদের জাতীয় মূল্যবোধ ও নীতিনৈতিকতায় শিক্ষিত এবং দীক্ষিত করা না হলে জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে উঠবে। এ ক্ষেত্রে অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের মন্তব্যটি স্মরণীয়। তিনি বলেন, ‘ইট ইজ এসেনশিয়াল দ্যাট দ্য স্টুডেন্টস অ্যাকুয়ার অ্যান আন্ডারস্ট্যান্ডিং অব অ্যান্ড অ্যা লাইভলি ফিলিং ফর ভ্যালুস… … আদারওয়াইজ হি উইথ হিজ স্পেশালইজড নলেজ, মোর ক্লজলি রিসেম্বেলস অ্যা ওয়েল ট্রেইনড ডগ দ্যান হারমোনিয়াসলি ডেভেলপড পারসন’।

লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
Mal55ju@yahoo.com

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.