দুর্নীতি ছাড়েনি বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদকেও

শিক্ষাবার্তা ডেস্কঃ দুর্নীতি ছাড়েনি বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদকেও। কর্তৃপক্ষের যোগসাজশে ইমাম নিয়োগে বিভিন্ন জালিয়াতি হয়েছে গত দেড় যুগে। ১৪ মাসে তিনবার কমিটি গঠন ও পুনর্গঠনের পর তদন্তে দুর্নীতির প্রমাণ মিললেও ব্যবস্থা নেয়নি ধর্ম মন্ত্রণালয় ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন (ইফা)। ১৫ মাস পড়ে আছে তদন্ত প্রতিবেদন। শাস্তি না দিয়ে দুর্নীতি ধামাচাপা দেওয়ার নেপথ্য আয়োজন চলছে বলে অভিযোগ।

ধর্মপ্রাণ মানুষের আস্থার প্রতিষ্ঠান দেশের প্রধান মসজিদে যে ইমামদের পেছনে লাখো মানুষ নামাজ আদায় করেন, সাম্প্রতিক সময়ে তাঁদের চারজনের নিয়োগ হয়েছে দুর্নীতির মাধ্যমে। আরেকজন এসেছেন ‘পেছনের দরজা’ দিয়ে। এক ইমামের পদোন্নতিতে অনিয়মের অভিযোগ করে আরেক ইমাম উচ্চ আদালতে রিট করেছেন। নিয়োগের অনিয়ম নিয়েও চলছে মামলা।

তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, উপসচিব পদমর্যাদার পঞ্চম গ্রেডে পদোন্নতি পাওয়া সিনিয়র পেশ ইমাম মাওলানা মিজানুর রহমানের চাকরিতে আবেদন করার যোগ্যতা ছিল না। খতিবের পরই সিনিয়র পেশ ইমামের অবস্থান। তাঁর বিরুদ্ধে বয়স জালিয়াতি, স্বীকৃতিহীন সনদে চাকরি এবং অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পাওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে তদন্তে।

আরেক পেশ ইমাম মাওলানা এহসানুল হকেরও চাকরিতে আবেদনের যোগ্যতা ছিল না। তিনি ইফার সাবেক মহাপরিচালক সামীম মোহাম্মদ আফজালের ভাগ্নে। সন্দেহযুক্ত অভিজ্ঞতার সনদে সরাসরি সিনিয়র সহকারী সচিব পদমর্যাদার ষষ্ঠ গ্রেডে তিনি নিয়োগ পান।

মন্ত্রণালয় ও ইফা সূত্র বলছে, ধর্ম প্রতিমন্ত্রী মো. ফরিদুল হক খানের অনীহার কারণে তদন্ত প্রতিবেদন আমলে নেওয়া যায়নি। ফলে দায়ী ব্যক্তিরা আসেননি শাস্তির আওতায়।

জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী  বলেন, ‘এখন এগুলো নিয়ে আলোচনা না করাই বেটার (ভালো)। সব সুস্থভাবে চলছে, সুস্থভাবে চলতে দেন। নির্বাচন পার হোক, তখন এগুলো নিয়ে আসেন। যদি কোনো কিছু (অনিয়ম) থাকেও ভবিষ্যতে দেখা যাবে।’

তদন্তের নামে ইঁদুর-বিড়াল খেলা :২০১৯ সালে মুক্তিযোদ্ধা এনামুল হক মন্ত্রিপরিষদ সচিব বরাবর ইমাম নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ করেন। তাঁর অভিযোগ খতিয়ে দেখতে ২০২০ সালের ২১ জুলাই তিন উপসচিবের সমন্বয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করে ধর্ম মন্ত্রণালয়। এক মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। পরে ১০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ নিয়ে ২০২১ সালের ৩০ মে ফাউন্ডেশন সচিবের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আরেকটি কমিটি করে ইফা। তবে দুই কমিটি তদন্তই করেনি।

এনামুল হক হাইকোর্টে রিট করলে ২০২১ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর কমিটি পুনর্গঠন করে ধর্ম মন্ত্রণালয়। তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। পুনর্গঠিত পাঁচ সদস্যের কমিটির আহ্বায়ক মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. সাখাওয়াৎ হোসেন ও ইফা পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম সই করে ওই বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর ধর্ম সচিবের কাছে প্রতিবেদন জমা দেন। বাকি তিন সদস্য আলাদা প্রতিবেদন দেবেন বলে জানানো হয়।

সংশ্নিষ্ট সূত্র বলছে, প্রতিবেদন জমা নিলে দায়ীদের চাকরিচ্যুত করতে হবে- এ কারণে দুই সদস্যের দেওয়া প্রতিবেদন গ্রহণ করেনি মন্ত্রণালয়। কর্তৃপক্ষের চাপের কারণে কমিটির অন্য তিন সদস্য প্রতিবেদনে সই করেননি। প্রতিবেদন জমা দেওয়ার ছয় দিন পর অফিস আদেশে বলা হয়, উচ্চ আদালতে মামলা চলমান থাকায় তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ নেই। তবে ইফা সূত্রটি সমকালকে জানিয়েছে, দায়ীদের রক্ষার জন্য মামলার অজুহাত দেওয়া হয়েছে।

অথচ কমিটি পুনর্গঠনের আদেশে মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, ‘বায়তুল মোকাররমে ইমাম পদে জাল সনদ ও অবৈধ পন্থায় নিয়োগের বিষয়ে হাইকোর্ট ডিভিশনে রিট হয়েছে। ওই অনিয়মের অভিযোগসহ বায়তুল মোকাররমে ইমামদের নিয়োগ ও পদোন্নতির বিষয়ে তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দিতে পাঁচ সদস্যের কমিটি পুনর্গঠন করা হলো।’ গত ২২ সেপ্টেম্বর পদোন্নতিতে অনিয়ম-সংক্রান্ত আরেকটি রিট মামলার পরিপ্রেক্ষিতে কমিটি গঠন করে প্রতিবেদন চেয়েছে ইফা। তবে হাইকোর্টের আইনজীবী শিশির মুহাম্মদ মনির বলেন, যদি আদালতের কোনো ভিন্ন আদেশ না থাকে, তাহলে মামলা চলমান অবস্থায় বিভাগীয় তদন্ত এবং কারও অপরাধ প্রমাণ হলে ব্যবস্থা নিতে আইনে বাধা নেই।

কমিটির দুই সদস্যের দেওয়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বাকি তিন সদস্য আলাদা প্রতিবেদন দেবেন। তবে মামলার অজুহাত দেখিয়ে তাঁরা আলাদা তদন্ত করেননি, প্রতিবেদনও দেননি। তাঁদের কেউ এ বিষয়ে মন্তব্য করতেও রাজি হননি। ইফা সচিব আবদুল কাদের শেখ বলেন, ‘সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি নেই আমার।’ কমিটির আরেক সদস্য সৈয়দ শাহ এমরান বলেন, ‘আমি এ ব্যাপারে কিছু বলতে পারব না। অনেক আগের কথা, আমার মনে নেই।’

কমিটির আহ্বায়ক মো. সাখাওয়াৎ হোসেন বলেন, ‘তিন সদস্যের কিছু বিষয়ে দ্বিমত ছিল। পরে প্রতিমন্ত্রী নির্দেশ দেন পাঁচ সদস্য মিলে প্রতিবেদন দিতে। তবে হাইকোর্টে মামলা থাকায় আর প্রতিবেদন দেওয়া হয়নি। মামলা থাকলে অন্য কিছু করা যায় না।’ কমিটির সদস্য তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ইমাম নিয়োগে বয়স চুরি, সনদ জালিয়াতি, স্বজনপ্রীতি, নম্বর অনিয়মের প্রমাণ মেলে তদন্তে।

দুর্নীতির বীজ ১৮ বছর আগের :তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইফা দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা সমমর্যাদার ইমাম নিয়োগে বিজ্ঞপ্তি দেয় ২০০৫ সালের ৩ আগস্ট। এই পদে নিয়োগে শিক্ষাগত যোগ্যতা চাওয়া হয় দ্বিতীয় শ্রেণিতে কামিল অথবা সরকার স্বীকৃত দাওরায়ে হাদিস পাস। শর্ত ছিল, বয়স হতে হবে ৩০ বছরের কম।

মিজানুর রহমান বেফাকুল মাদ্রাসিল আরাবিয়ার (বেফাক) দাওরায়ে হাদিসের সনদ জমা দিয়ে আবেদন করেন। তবে সেই সময়ে বেফাকের দাওরায়ে হাদিসের সনদের সরকারি স্বীকৃতি ছিল না। শুধু ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দসহ কয়েকটি মাদ্রাসার সনদকে দুই বছর মেয়াদি স্নাতক সমমান দিয়েছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সমতা কমিটি।

২০০৫ সালে ওই নিয়োগ পরীক্ষায় মিজানুর রহমান ছাড়াও ৩১ জন আবেদন করেন। তাঁদের অধিকাংশ স্নাতকোত্তর সমমানের আলিয়া মাদ্রাসার কামিল ডিগ্রিধারী ছিলেন। দারুল উলুম দেওবন্দের দাওরায়ে হাদিস সনদধারী প্রার্থীও ছিলেন। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বীকৃতিহীন সনদের মাধ্যমে মিজানুর রহমানের নিয়োগের বিষয়টি প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত। তদন্তের সময় মিজানুর রহমান বলেছিলেন, ১৯৯৮ সালের সার্ভিস রুলে ইফা দাওরায়ে হাদিসের সনদকে স্বীকৃতি দিয়েছে। কমিটির তিন সদস্যের অভিমত ছিল, সরকারি স্বীকৃতি না থাকলেও দাওরায়ে হাদিসের সনদ গ্রহণ করা যেতে পারে।

বয়স জালিয়াতি :মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় অভিযোগ ছিল বয়স চুরির। ইলমুল কিস্ফরাত, ফজিলত, তাকমিল এবং হিফজের সনদ অনুযায়ী তাঁর জন্মতারিখ ১৯৭৪ সালের ১৬ মে। তবে চাকরির আবেদনপত্রে জন্মতারিখ লেখেন ১৯৭৭ সালের ১৬ মে। ইলমুল কিস্ফরাত সনদের বয়স বদল করেন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের ছয় দিন পর, অর্থাৎ ২০০৫ সালের ৯ আগস্ট।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চাকরিতে আবেদনের জন্যই জন্মতারিখ পাল্টান মিজানুর রহমান। তদন্ত কমিটি বেফাক কার্যালয়ে নথি পরীক্ষা করেছে। এতে দেখা যায়, ইলমুল কিস্ফরাত পরীক্ষার নিবন্ধনে মিজানুর রহমানের জন্মতারিখ ১৯৭৪ সালের ১৬ মে। ২০০৫ সালের ৯ আগস্ট আবেদন করে তা ১৯৭৭ সালের ১৬ মে করা হয়। বাকি তিনটি সনদে জন্মতারিখ পরিবর্তন করা হয়েছে ২০১৮ সালের ২৭ জুলাইয়ের পর কোনো এক সময়ে।

মিজানুর রহমান কমিটিকে বলেন, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট ও বিয়ের সনদে তাঁর জন্মতারিখ ১৯৭৭ সালের ১৬ মে। তবে দ্বিমতকারী কমিটির তিন সদস্য এসব নথিকে গ্রহণযোগ্য বলেন। কমিটির আহ্বায়ক সাখাওয়াৎ হোসেন বলেন, একেকজনের অভিমত একেক রকম হতেই পারে।

তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জন্মতারিখ পরিবর্তন কবে করা হয়েছে, তা নিয়ে ভিন্নমত থাকলেও তিনি তিন বছর বয়স কমিয়েছেন, তাতে সবাই একমত। বয়স কমিয়ে চাকরিতে আবেদনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।

প্রথম বানাতে উদারহস্তে নম্বর :মিজানুর রহমানের নিয়োগে নম্বর জালিয়াতিরও প্রমাণ মিলেছে। ইমাম নিয়োগে শিক্ষাগত যোগ্যতার জন্য ২০ নম্বর রাখা হয়েছিল। দাখিল, আলিম, ফাজিল ও কামিল পরীক্ষার প্রথম শ্রেণির জন্য ৫, দ্বিতীয় শ্রেণির জন্য ৪ এবং তৃতীয় শ্রেণির জন্য ৩ নম্বর ধরা হয়। এ ছাড়া দাওরায়ে হাদিসের জন্যও ৫ নম্বর রাখা হয়। মিজানুর রহমানের দাখিল, আলিম, ফাজিল ও কামিলের সনদ নেই।

প্রতিবেদনে বলা হয়, মিজানুর রহমান দাওরায়ে হাদিসের জন্য ৫, দাওরায়ে শরইয়ার জন্য ৫, হিফজুল কোরআনের জন্য ৫ এবং ইলমুল কিস্ফরাতের জন্য ৫; সর্বমোট ২০ নম্বর দেওয়া হয়। দাওরায়ে শরইয়ায় তিনি ১০ দিনের কোর্স করেছেন, যা ডিগ্রি নয়। এর জন্য তিনি নম্বর পেতে পারেন না।

মিজানুর রহমানকে শিক্ষাগত যোগ্যতার জন্য পুরো ২০ নম্বর দেওয়ায় তিনি ৫৮ নম্বর পেয়ে নিয়োগ পান। কমিটির তিন সদস্য পুরো নম্বর দেওয়াকে যৌক্তিক বলেন। হিফজুল কোরআন এবং ইলমুল কিস্ফরাতের সনদ সব প্রার্থীর জন্য বাধ্যতামূলক ছিল। কিন্তু এই দুই সনদের জন্য অন্য প্রার্থীদের নম্বর দেওয়া হয়নি।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সমতা কমিটির অনুমোদিত দাওরায়ে হাদিসের সনদধারী আহসান উল্ল্যাহ সাড়ে ৫৭ নম্বর পেয়ে দ্বিতীয় হন। শিক্ষাগত যোগ্যতায় তাঁকে দেওয়া হয় ১৯ নম্বর। তাঁকেও হিফজুল কোরআন এবং ইলমুল কিস্ফরাতের নম্বর দিলে এবং কিংবা শিক্ষাগত যোগ্যতার জন্য পূর্ণ নম্বর পেলে তিনি সাড়ে ৬৮ নম্বর পেয়ে নিয়োগ পেতেন। আহসান উল্ল্যাহ নিয়োগ পেতে ২০০৭ সালে মামলা করেন।

আবেদনের অযোগ্য আরেক ইমাম :সিনিয়র সহকারী সচিব পদমর্যাদার তথা ষষ্ঠ গ্রেডের পদে রয়েছেন পেশ ইমাম মাওলানা এহসানুল হক। তদন্ত অনুযায়ী, তিনিও চাকরিতে আবেদনের যোগ্য ছিলেন না। ২০১২ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে প্রথম শ্রেণির কামিল অথবা দাওরায়ে হাদিস সনদ চাওয়া হয়। এহছানুল হক বেফাকের দাওরায়ে হাদিস সনদ দিয়ে আবেদন করেন, যার স্বীকৃতি ছিল না। তারপরও পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয় ইফার তৎকালীন ডিজি সামীম আফজালের ভাগ্নে এহছানুল হককে। তদন্তে বলা হয়েছে, স্বীকৃতিহীন সনদের অভিযোগ প্রমাণিত।

অভিজ্ঞতা শর্ত চাতুরিপূর্ণ, সনদও ভুয়া :বিজ্ঞপ্তিতে ইমাম পদকে দ্বিতীয় শ্রেণির উল্লেখ করা হয়। তবে বেতন উল্লেখ করা হয় ষষ্ঠ গ্রেডের। দ্বিতীয় শ্রেণির পদে নিয়োগে প্রথম শ্রেণির পদে ৮ বছর চাকরির অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, বিজ্ঞপ্তি ছিল চাতুর্যপূর্ণ। প্রথম শ্রেণির পদে আট বছর চাকরির অভিজ্ঞ কেউ দ্বিতীয় শ্রেণির পদে আবেদন করবেন না।

বিজ্ঞপ্তিতে সহকারী অধ্যাপক সমমান মুফাসসির হিসেবে পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়। এহছানুল হক ‘মুফাসসির হিসেবে পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতার’ সনদপত্র হিসেবে দুটি মসজিদে চাকরির প্রত্যয়ন জমা দেন। তদন্তে বলা হয়েছে, মসজিদে মুফাসসির পদ থাকে না, থাকে মাদ্রাসায়। এর জন্য তাফসির শাস্ত্রে ডিগ্রি থাকতে হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এহছানুল হকের তাফসির শাস্ত্রে ডিগ্রি নেই।

প্রথম শ্রেণির পদে আট বছর চাকরি অভিজ্ঞতার প্রমাণ হিসেবে এহছানুল হক তিনটি মসজিদ এবং দুটি মাদ্রাসায় কাজের যে প্রত্যয়ন জমা দেন, সেগুলো সরকার অনুমোদনহীন। ২০০৬ সালে দাওরায়ে হাদিস পাস করা এহছানুল হক ২০১২ সালে নিয়োগ পান। ফলে তাঁর পক্ষে আট বছর অভিজ্ঞতার শর্ত পূরণ সম্ভব ছিল না। মিথ্যা অভিজ্ঞতার সনদ দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলেছে তদন্ত কমিটি।

বিতর্কিত নিয়োগ :এহছানুল হকের নিয়োগে জালিয়াতির কারণে নিয়োগ কমিটির সদস্য সচিবসহ ১৪ জনের মধ্যে ৯ জন সই করেননি। সইকারী সবাই ছিলেন ইফার বোর্ড অব গভর্নরসের সদস্য। ইফা আইন অনুযায়ী, বোর্ড অব গভর্নরস নিয়োগ অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ। আইন ভেঙে নিয়োগ কমিটির সদস্য হয়ে, সুপারিশকারী কর্তৃপক্ষও হন বোর্ড অব গভর্নরস সদস্যরা। ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়াই ছিল অবৈধ।

পদোন্নতিতেও অনিয়ম :মিজানুর রহমানকে দশম গ্রেড থেকে সরাসরি পঞ্চম গ্রেডের সিনিয়র পেশ ইমাম পদে পদোন্নতি দেওয়া হয় ২০১৫ সালে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই বছরের ১২ মার্চ সিলেকশন কমিটির সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, ইমামদের মধ্যে মিজানুর রহমান জ্যেষ্ঠতম। তবে কিসের ভিত্তিতে তিনি জ্যেষ্ঠতম তা বলা নেই।

আরেক পেশ ইমাম মুহিবুল্লাহিল বাকী তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করলে, ইফা জানায় ২০০২ সালের পর ইমামদের জ্যেষ্ঠতার তালিকা করা হয়নি। ওই বছরের তালিকায় মুহিবুল্লাহিল বাকীর নাম থাকলেও মিজানুর রহমানের ছিল না। কারণ তিনি চাকরিতে যোগ দেন ২০০৬ সালের জুলাইয়ে। মেধা তালিকা ছাড়াই তাঁকে পদোন্নতি দেওয়ার অভিযোগের সত্যতা মিলেছে তদন্তে।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতীয় পে-স্কেল অনুযায়ী, প্রথম শ্রেণির পদে ১০ বছর চাকরি পূর্ণ হওয়ার আগে কেউ পঞ্চম গ্রেড প্রাপ্য হবেন না। তবে দশম গ্রেডে ৯ বছর চাকরি করে সরাসরি উপসচিব পদমর্যাদার পঞ্চম গ্রেডে পদোন্নতি পান মিজানুর রহমান।

ষষ্ঠ গ্রেডের পেশ ইমাম মুহিবুল্লাহিল বাকীর রিট মামলায়, অর্থ বিভাগ হাইকোর্টকে জানায় সরাসরি নয়, ষষ্ঠ গ্রেড থেকে পঞ্চম গ্রেডে পদোন্নতি দিতে হবে। মিজানুর রহমান পদোন্নতি পাওয়ার যোগ্য ছিলেন না। মিজানুর রহমান তদন্তে বলেন, দশম গ্রেডে বেতন পেলেও তাঁর আগের পদটি ষষ্ঠ গ্রেডের জন্য বিবেচনাধীন ছিল।

তাঁকে পদোন্নতি দিতে ইফা বাছাই কমিটি যুক্তি দেখায়, বায়তুল মোকাররম দেশের সেরা মসজিদ। চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লা মসজিদের জনবল ইফার অধীন হলেও, বায়তুল মোকাররমের সঙ্গে তুলনীয় হবে না। বায়তুল মোকাররমের সিনিয়র পেশ ইমাম পদ বায়তুল মোকাররমের ইমামদের মধ্য থেকে পূরণ করা হবে। চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর ২০০৬ সালের ৯ জুলাই মিজানুর রহমানকে আন্দরকিল্লা মসজিদের পদায়ন করা হয়। ওই বছরের ১৪ ডিসেম্বর তাঁকে বদলি না করে বায়তুল মোকাররমে সংযুক্ত করা হয়। তিনি সিনিয়র পেশ ইমাম পদে পদোন্নতি পাওয়ার আগ পর্যন্ত আন্দরকিল্লায় পদায়ন ছিলেন। তাঁর পদোন্নতিতে অনিয়ম এবং আর্থিক বিধি লঙ্ঘন প্রমাণিত হয়েছে। যদিও ভিন্নমত পোষণকারী তিন সদস্যের যুক্তি ছিল, ইফা স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান হওয়ায় পদোন্নতির নিয়ম ভিন্ন হতে পারে।

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/০১/১৮/২৩