‘দুর্নীতির সুপারিশ অধিকাংশই বাস্তবায়ন করে না মন্ত্রণালয়’

শিক্ষাবার্তা ডেস্কঃ উচ্চ শিক্ষার তত্ত্বাবধান ও দিকনির্দেশনা প্রদানে একক ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। তবে কোনো অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার নেই এই সংস্থাটির। অনিয়ম ও দুর্নীতির তদন্ত করে শিক্ষামন্ত্রণালয়ে পাঠাতে হয়। কিন্তু ইউজিসির অভিযোগ, এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রতিবেদনের সুপারিশ অধিকাংশই বাস্তবায়ন করে না মন্ত্রণালয়।

ইউজিসির তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে এই তথ্য উল্লেখ করেছে। গত বৃহস্পতিবার এই প্রতিবেদন সরাসরি গিয়ে রাষ্ট্রপতির হাতে তুলে দিয়েছে ইউজিসির চেয়ারম্যানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

ইউজিসির তাদের অভিযোগে জানায়, বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের নানা অনিয়ম দুর্নীতির বিষয়ে দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ সম্বলিত প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে ইউজিসি সুপারিশ অনেকাংশে বাস্তবায়ন করা হয় না। এ লক্ষ্যে ইউজিসি মনে করে, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের অনিয়ম, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি, সনদ বাণিজ্য, আর্থিক অনিয়ম এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম তদন্তপূর্বক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা কমিশনের থাকা অতীব জরুরি। এছাড়া কমিশনকে তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়নের ক্ষমতা প্রদানের জন্য সরকারের কাছে সুপারিশ করে।

ইউজিসির একাধিক কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে জানিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরেই এই অভিযোগ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে। ইউজিসির কর্মকর্তারাও বিভিন্ন সময়ে মৌখিকভাবে এই অভিযোগ করে আসছিল। অনিয়ম ও দুর্নীতির কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণে ইউজিসির ক্ষমতা বৃদ্ধি করে উচ্চ শিক্ষা কমিশনের গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এ জন্য আইন তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা এগোচ্ছে না। খসড়া আইনের কপি বছরের পর বছর মন্ত্রণালয়ে পড়ে থাকে। কর্মকর্তা বদল হয়, কিন্তু ফাইল আর এগোয় না।

ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আব্দুল মান্নান বলেন, ‘মন্ত্রণালয় যে ইউজিসির সুপারিশগুলো আমলে নেয় না তা আমি আগে থেকেই বলে আসছি। বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির তদন্ত করতে গিয়ে ইউজিসির অনেক কর্মকর্তাদের কষ্ট করতে হয়। নানা হুমকিরও শিকার হতে হয়। এরপরও ঝুঁকি নিয়ে, তদন্ত করে সেই সুপারিশ মন্ত্রণালয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পাঠায়। কিন্তু মন্ত্রণালয়ে গিয়ে সেই প্রতিবেদন চাপা পড়ে থাকে। মাঝখান থেকে ইউজিসির ঐ তদন্ত কর্মকর্তা বিপাকে পড়ে। ইউজিসির সাবেক এই চেয়ারম্যান বলেন, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনিয়ম তদন্ত করে আমি একাধিকবার মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। ঐ সময়ে শিক্ষামন্ত্রীর হাতে পর্যন্ত দিয়েছি। কিন্তু তাতেও কাজ হয়নি। একসময় আমিও হতাশ হয়েছি।

ইউজিসির এক কর্মকর্তা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অনিয়ম ও দুর্নীতি বেড়েই চলছে। কিন্তু এসবের তদন্ত করেও কোনো লাভ হয় না। কারণ মন্ত্রণালয়ে গিয়েই সব আটকে যায়। গত ১০ বছরে অন্তত ১০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে নিয়োগের অনিয়ম ও আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ পাবার পর ইউজিসির শীর্ষ কর্মকর্তারা এসব অনিয়মের তদন্ত করে। প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়েও পাঠায়। কিন্তু ব্যতিক্রম ছাড়া কোনো প্রতিবেদনই আলোর মুখ দেখে না ।

ইউজিসির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগের জন্য নাম প্রস্তাব করে মন্ত্রণালয়ে পাঠায় সংশ্লিষ্ট ট্রাস্টি বোর্ড। সে নামের তালিকা যাচাই-বাছাইয়ের জন্য ইউজিসিতে পাঠায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এমনও দেখা গেছে, যে শিক্ষকের নিয়ম অনুযায়ী উপাচার্য হবার যোগ্যতা নেই, এমনও উদাহরণ আছে ঐ শিক্ষককে উপাচার্য পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (বিশ্ববিদ্যালয়) মো. আবু ইউসুফ মিয়া বলেন, আমি দায়িত্বে থাকাকালীন এমন কোনো প্রতিবেদন পাইনি। তবে যেহেতু ইউজিসির যে বার্ষিক প্রতিবেদনে বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে, তা এখনো আমি পাইনি। দেখার পরই মন্তব্য করা যাবে।

ইউজিসি তাদের প্রতিবেদনে আরও বেশ কিছু সুপারিশ করেছে। সুপারিশে ইউজিসি উল্লেখ করে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে প্রায়ই স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির অভিযোগ জাতীয় গণমাধ্যমগুলোয় প্রকাশিত হয়। ফলে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়। নিয়োগে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ও যোগ্যতাসম্পন্ন জনবল নিয়োগের উদ্দেশ্যে একটি ‘স্বতন্ত্র নিয়োগ কমিশন’ গঠনের সুপারিশ করে ইউজিসি। ইউজিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ৫৩টি সরকারি ও ১০৮টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে।

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/০১/১৪/২৩