দুই মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতায় বিপাকে ৭২৯ বিদ্যালয়

নিউজ ডেস্ক।।

সরকার প্রাথমিক শিক্ষার স্তর পঞ্চম থেকে বাড়িয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত করার কথা বললেও এখন এই নীতি থেকে সরে আসার পরিকল্পনা করছে। যা নিশ্চিত করেছেন সরকারের একাধিক ঊর্ধ্বতন শিক্ষা কর্মকর্তা। ফলে সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত বিপাকে ফেলেছে সেসব প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে যারা এতোদিন নানা জোড়াতালি দিয়ে প্রাথমিকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান করেছেন। দেশের নানা প্রান্তে এরকম বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৭২৯ টি। তারা প্রাথমিকের শিক্ষা-স্তর অষ্টম শ্রেণিতে উন্নীত করা হবে এমনটা ধরে এতদিন পাঠদান করিয়েছেন।

কোন রকম অবকাঠামোগত উন্নয়ন, অতিরিক্ত শিক্ষক পদায়ন কিংবা কোনো সহযোগিতা না করে অতিরিক্ত তিনটি ক্লাস বাড়ানো হয়েছিল দেশের বিভিন্ন স্থানের মোট ৭২৯টি শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে। এসব প্রতিষ্ঠান তখন নানা জোড়াতালি দিয়ে এতোদিন পর্যন্ত তাদের শিক্ষা-কার্যক্রম পরিচালনা করেছিল। এসব প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত তিনটি ক্লাস বাড়লেও বাড়ানো হয়নি সুযোগ সুবিধা।

এমন চিত্র অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত চালু হওয়া প্রায় দেশের সব বিদ্যালয়েরই। সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-কর্মকর্তারা বলছেন, এ বিষয়ে এখন সরকারের আর কোনো পরিকল্পনা দৃশ্যমান নয়। ফলে সরকারি সহযোগিতার অভাবে এখনো পাঠ্যক্রম চালু থাকা স্কুলগুলো পরিচালনা করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। আর শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করে তা বন্ধ করতেও পারছে না প্রতিষ্ঠানগুলো।

তিন স্তরবিশিষ্ট শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত হয় ২০১০ সালের ‘জাতীয় শিক্ষানীতি’র আলোকে। এরপর প্রাথমিক শিক্ষার স্তর পঞ্চম থেকে বাড়িয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত করা হয়েছিল। এই প্রকল্প পরীক্ষামূলক-ভাবে দেশের ৭২৯টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শুরু হয়। সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, ২০১৮ সালের পরে সময় বাড়িয়ে ২০২১ সালের মধ্যে তা সব বিদ্যালয়ে পুরোপুরি বাস্তবায়নের কথা ছিল। প্রকল্পটি নিয়ে সরকার শুরুতে তোড়জোড় করলেও যোজন যোজন ফারাক দেখা যায় বাস্তবায়নে।

মূলত, অচলাবস্থার কারণ দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর দায়িত্ব প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের। আর শিক্ষা মন্ত্রণালয় দেখভাল করে ষষ্ঠ থেকে ওপরের স্তরের শিক্ষা কার্যক্রমগুলো। হিসেব অনুযায়ী শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দেখভাল করার কথা ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির শিক্ষা কার্যক্রম। কাজটি একযোগে করতে পারেনি সরকারের এ দুই মন্ত্রণালয়। আবার সম্ভব হয়নি অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত এক মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টিও। ফলে বিষয়টি থমকে যায় দুই মন্ত্রণালয়ের দ্বন্দ্বে কারণে বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা।
‘প্রস্তাবিত শিক্ষা আইনের’ সর্বশেষ খসড়ায় বলা হয়েছে, দেশে শিক্ষার স্তর চারটি; প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক, দশম শ্রেণি পর্যন্ত মাধ্যমিক, দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত উচ্চ মাধ্যমিক, আর স্নাতক বা সমমান বা তার তদূর্ধ্ব স্তর হবে উচ্চশিক্ষা।

বাধ্যতামূলক শিক্ষা দশম শ্রেণি পর্যন্ত রেখে শিক্ষাব্যবস্থা চার স্তরে রাখা হলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান করার প্রকল্প থেকে সরেও আসতে পারে সরকার। তবে সরকারের সিদ্ধান্ত কোন দিকে যাচ্ছে তা এখনও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। নতুন শিক্ষাক্রমের বিষয়টি নিয়ে নিশ্চয়তা পাওয়া গেলে তা সুস্পষ্ট করে বলা সম্ভব হবে।

এ নিয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) সদস্য অধ্যাপক মো. মশিউজ্জামান বলছেন, এসডিজিতে বলা হয়েছে, মানসম্মত শিক্ষা দিতে হবে মাধ্যমিক পর্যন্ত। ফলে এখন সবাইকে সরকার দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা দিতে বাধ্য। এখন সরকার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ এসডিজি বাস্তবায়নে; তখন চিন্তা করা হয়েছিল অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক ধরে সবার প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত হবে।
মশিউজ্জামান বলছেন, প্রাথমিকের শিক্ষকরা পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান করতে প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ দেওয়া কঠিন হবে তাদের মাধ্যমে। তিনি জানান, এসবের বাইরেও শিক্ষানীতির পরামর্শ বাস্তবায়ন করতে গেলে স্কুলের অবকাঠামোগত উন্নয়নের বিষয়গুলো জড়িয়ে আছে।

অবশ্য আশার কথা বলছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মো. জাকির হোসেন। তিনি বলেন, আমরা প্রকল্পটি পুরোপুরি বাস্তবায়নে আশাবাদী; অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও শিক্ষকদের বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে। বিদ্যালয়গুলো অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত করার সক্ষমতা যখন হবে তখন অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত করার চেষ্টা হবে। তবে এখন দেশের যেসব বিদ্যালয়গুলোতে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত চলমান আছে, সেগুলোতে তা চলবে।