দিনাজপুরে ওয়ার্কশপ থেকে পলিটেকনিক করেছেন সামাদ

দিনাজপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষক থাকাকালেই লুনা ফাউন্ড্রি নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন আবদুস সামাদ। সেটা ১৯৮৬ সালের কথা। কাঁচা লোহা গলিয়ে পিস্টন, লাইনার, স্যালো ইঞ্জিন পাম্পসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ প্রস্তুত করা হতো সেই কারখানায়। সে সময় বড় বড় ফাউন্ড্রির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে তিনি ব্যবসা গুটিয়ে ফেলেন।

নব্বইয়ের দশকে যখন মোটরগাড়ির সংখ্যা বাড়তে শুরু করল, সামাদ ভাবলেন, এত এত গাড়ির যন্ত্রাংশে কোনো ত্রুটি দেখা দিলে মেরামত হবে কোথায়? এই ভাবনা থেকে সদ্য বিলুপ্ত লুনা ফাউন্ড্রির স্থানেই গড়ে তোলেন উত্তরণ ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ। সমস্যা থেকে উত্তরণের চিন্তা থেকেই এই নামকরণ, জানালেন তিনি।

প্রকৌশলপ্রেমী আবদুস সামাদের বয়স এখন ৭৬। কয় দিন আগে কারখানাসংলগ্ন বাসায় বসে কথা হচ্ছিল তাঁর সঙ্গে। বয়সের ভারে শরীর ন্যুয়ে পড়েছেন। মুখের কথা আটকে যাচ্ছিল। তবু খুব আগ্রহ নিয়ে বললেন তাঁর উত্তরণের গল্প।

১৯৯৪ সালের কথা। একটা ধান মাড়াইয়ের যন্ত্র মেরামত করতে সামাদের ওয়ার্কশপে এসেছিলেন এক কৃষক। যন্ত্রটি দেখেই সামাদের মনে হলো, এমন যন্ত্র তো আমরাও তৈরি করতে পারি। কিছু দিনের মাথায় হুবহু যন্ত্রটি বানিয়ে ফেলেন তিনি। নাম দেন উত্তরণ ধান মাড়াই যন্ত্র। ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে উত্তরণ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের নাম। উপকৃত হতে থাকেন কৃষকেরা। উত্তরণ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সঙ্গে পরিচিত হতে দিনাজপুরে আসতে শুরু করেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, ধান ও গম গবেষণা ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীরা। উত্তরণের উদ্ভাবিত কৃষিপ্রযুক্তিপণ্য তৈরি, বাজারজাতকরণের মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের ‍কৃষকদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চুক্তিবদ্ধ হন তাঁরা। সেই থেকে চলছে উত্তরণ ইঞ্জিনিয়ারিং। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির দেখভালের দায়িত্ব নিয়েছেন সামাদের উত্তরসূরিরা।

মোট ৩৫টি কৃষিপ্রযুক্তিপণ্য তৈরি হয়েছে এ প্রতিষ্ঠানে। এর মধ্যে ধান-গম-ভুট্টা মাড়াই যন্ত্র, ওপেন ড্রাম থ্রেসার, ঝাড়াই যন্ত্র, বাদাম মাড়াই যন্ত্র, সূর্যমুখী মাড়াই যন্ত্র, দানাজাতীয় শস্যের ক্লিনিং ও গ্রেডিং, বীজ বপন, বেড প্লান্টার, পাওয়ার উইডার, আলুর চিপস তৈরির যন্ত্র, পাটের আঁশ ছাড়ানোর যন্ত্র উল্লেখযোগ্য।

ওয়ার্কশপ থেকে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটঃ

সামাদ বলেন, ‘ওয়ার্কশপ হয়েছে, বিভিন্ন যন্ত্র তৈরি হচ্ছে। আমি মারা যাব। কিন্তু পরে আমার জায়গায় কাজ করবে কে? দেশের উন্নতি করতে হলে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে, দক্ষ জনবল তৈরি করতে হবে।’ সামাদের এই ভাবনা তাঁকে নিয়ে গেছে অন্য মাত্রায়। ২০১২ সালে দক্ষ জনবল তৈরির লক্ষ্যে নিজস্ব জায়গায় দ্বিতল ভবন নির্মাণ করেন। মাত্র ২৭ জন শিক্ষার্থী নিয়ে ওই বছরই যাত্রা শুরু করে উত্তরণ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট। ২০১৫ সালে ‍প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অনুমোদন পায়। এখন পুরকৌশল, ইলেকট্রিক্যাল এবং কম্পিউটার টেকনোলজি বিষয়ে প্রতিবছর ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন ১২০ শিক্ষার্থী। শিক্ষক–কর্মকর্তাসহ কর্মরত আছেন ১৫ জন।

২০১৫ সাল থেকে গত বছর পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয়ে প্রায় তিন শতাধিক শিক্ষার্থী চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা পাস করে বের হয়েছেন এ প্রতিষ্ঠান থেকে। ভবনের দ্বিতীয় তলায় তিনটি ক্লাসরুম। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য আলাদা কম্পিউটারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আছে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম। শিক্ষার্থীদের বৃত্তিও দেয় এ প্রতিষ্ঠান।

নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করছে উত্তরণঃ

নওগাঁর পত্নীতলা এলাকার বাসিন্দা আক্কাস আলী। উপজেলার ডাঙাপাড়া বাজারে আক্কাস ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপের স্বত্বাধিকারী তিনি।পাঁচ বছর আগে উত্তরণে ওয়েল্ডার পদে চাকরি করতেন আক্কাস। পরে চাকরি ছেড়ে দিয়ে এলাকায় নিজেই ওয়ার্কশপ দিয়েছেন। কিন্তু ভুলে যাননি উত্তরণকে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগিতায় পাঁচ দিনব্যাপী একটি প্রশিক্ষণ কর্মশালা হচ্ছিল উত্তরণে, সেখানেই অংশ নিতে এসেছিলেন আক্কাস।

আক্কাস আলী বলেন, ‘এখানে কাজ শিখেছি। সামাদ স্যার হাতে–কলমে শিখিয়েছেন। সাড়ে চার বছর হয় নিজেই ওয়ার্কশপ দিয়েছি। ভালো আছি। এখনো কোনো সমস্যায় পড়লে স্যারের কাছে ছুটে আসি।’ তিনি জানান, উত্তরণ থেকে বেরিয়ে তাঁর মতো নিজেই ওয়ার্কশপ দিয়েছেন প্রায় ৩০ জন।

উত্তরণ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন রাফেদ উল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘উত্তরবঙ্গে প্রথম এবং এখনো বড় পরিসরে আমরাই মানসম্মত কৃষিযন্ত্র প্রস্তুত ও সরবরাহ করছি। বর্তমান সময়ে কৃষিপণ্য উৎপাদনে কৃষকের খরচ কমেছে। তাই দিন দিন এসব কৃষিপণ্যের চাহিদা বাড়ছে। তবে এখনো আমাদের দেশে কৃষিযন্ত্রের ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভরতা থেকে গেছে। এই নির্ভরতা কমাতে হলে স্থানীয় কৃষিযন্ত্র প্রস্তুতকারকদের জন্য বিশেষ নীতিমালা গ্রহণ করে ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বাড়ানো দরকার।’