তিন বছরেও শেষ হয়নি শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া

প্রকাশিত: ১০:৫১ পূর্বাহ্ণ, সোম, ১১ অক্টোবর ২১

অনলাইন ডেস্ক।।

বেসরকারি স্কুল-কলেজে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা গভর্নিং বডির কাছ থেকে সরিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত প্রতিষ্ঠান এনটিআরসিএর কাছে ন্যস্ত করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধ করা এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও গতি আনা। কিন্তু এতে খুব একটা লাভ হয়নি। সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে দূরদর্শীতার অভাবে এমনটি হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

১৫তম শিক্ষক নিবন্ধনের সার্কুলার প্রকাশ পায় ২০১৮ সালের ২৮ নভেম্বর। ২০১৯ সালের ১৯ এপ্রিল নেওয়া হয় প্রিলিমিনারি পরীক্ষা। উত্তীর্ণ প্রার্থীদের ২০১৯ সালের জুলাইয়ে লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশ পায় ২০১৯ সালের ২২ অক্টোবর। ২০২০ সালের ১৫ জানুয়ারি চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করে। ৩০ মার্চ ৩য় গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এবং ১৫ জুলাই শূন্যপদের বিপরীতে প্রাথমিকভাবে ৩৮ হাজার ২৬৮ জন শিক্ষক প্রার্থীকে সুপারিশ করে এনটিআরসিএ। এখন আবার পুলিশ ভেরিফিকেশনে আটকে আছে এই প্রক্রিয়া।

শুধু ১৫তম নিবন্ধনের প্রার্থীদের নিয়োগ প্রক্রিয়াই যে থমকে আছে তাই নয়, এর আগে যারা ১৪তম নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে দ্বিতীয় গণবিজ্ঞপ্তিতে সুপারিশ না পেয়ে তৃতীয় গণবিজ্ঞপ্তিতে আবেদন করেছেন তাদের সময় লাগছে চার বছরেরও বেশি।

২০০৫ সালে বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগের জন্য সনদ দিত এনটিআরসিএ। ২০১৫ সালে এই পদ্ধতির পরিবর্তন আনে সরকার। ১২তম নিবন্ধন পরীক্ষা পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনে মেধা তালিকা করা হয় উপজেলাভিত্তিক। শিক্ষার্থীদের সনদ দেওয়ার আগে পাশ হয় নতুন আইনও। এখন প্রথম নিবন্ধন থেকে ১৫তম নিবন্ধনধারীরা আবেদন করতে পারছে। ফলে নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও চাকরির জন্য একজনকে দীর্ঘ ১৫ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

তথ্য অনুযায়ী, তৃতীয় গণবিজ্ঞপ্তিতে ৫৪ হাজার ৩০৪ জন শূন্য পদে নিয়োগের বিপরীতে আবেদন জমা পড়ে ৯০ লাখ। সে হিসাবে একটি পদের বিপরীতে ১৬০ জনের বেশি প্রার্থী আবেদন করেন। এর মধ্যে ৩৮ হাজার ২৬৮টি পদে প্রাথমিক সুপারিশ প্রদান করে এনটিআরসিএ। পুলিশ ভেরিফিকেশন শেষ হলে চূড়ান্ত যোগদান পত্র দেওয়া হবে। এসব শিক্ষক চূড়ান্ত যোগদানের জন্য অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছেন। দীর্ঘ সময় ধরে এসব শিক্ষক বেকার অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন। প্রার্থীরা জানিয়েছেন, অনেকেই ধারদেনা করে নিয়োগের জন্য আবেদন করেছিলেন।

আব্দুর রহিম নামে এক প্রার্থী জানান, আমি তৃতীয় গণবিজ্ঞপ্তিতে আবেদন করে সুপারিশপ্রাপ্ত হই। আমার পরিবারে আমিই একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। আমার সন্তান ব্লাড ক্যানসারে ভুগছে অনেক দিন ধরে। এই অবস্থায় পরিবার নিয়ে খুব মানবেতর জীবনযাপন করছি। নিয়োগে দীর্ঘ সময় ক্ষেপণ হচ্ছে। আর সহ্য হচ্ছে না। পুলিশ ভেরিফিকেশনে সময় ব্যয় হচ্ছে। ভেরিফিকেশনে অযোগ্য বলে প্রমাণিত হলে চাকরিচ্যুতি করবে এমন শর্তে হলেও শিক্ষকদের নিয়োগের দাবি জানান এই প্রার্থী।

সবুজ আযম নামে এক প্রার্থী জানান, ভৌত বিজ্ঞানে প্রাথমিকভাবে একটি মাধ্যমিক স্কুলে সুপারিশপ্রাপ্ত হই। এর আগে আমি একটি কোম্পানিতে চাকরি করতাম। কিন্তু ফল পাওয়ার পরেই আমি আগের চাকরিটা ছেড়ে দেই। কারণ আমি জানতাম খুব দ্রুত পদায়ন হবে। কিন্তু এখন বিলম্ব হচ্ছে। এতে আমি অর্থকষ্টে আছি।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখার উপসচিব আনোয়ারুল হক জানান, আমরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পুলিশ ভেরিফিকেশনের জন্য পাঠিয়েছি। পুলিশ ভেরিফিকেশন শেষে কবে নাগাদ এবং কীভাবে প্রার্থীদের তালিকা পাঠাবে সে বিষয়ে কিছুই বলতে পারছি না। তবে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এ কাজে বেশ সময় লেগে যেতে পারে।

এর আগে সরকারি মাধ্যমিক স্কুলে সহকারী শিক্ষকের নিয়োগের জন্য পুলিশ ভেরিফিকেশনের জন্য দুই দফা তাগিদপত্র দেওয়া হয়। তবে গতকাল পর্যন্তও পুলিশ ভেরিফিকেশন শেষে উত্তীর্ণদের তালিকা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়নি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তৃতীয় গণবিজ্ঞপ্তি জারির ঠিক আগে ১৩তম শিক্ষক নিবন্ধনে চাকরিবঞ্চিত ২ হাজার ২০০ জন হাইকোর্টে মামলা করেন। মামলায় রায় তাদের পক্ষে গেলে ঐ শিক্ষকদের নিয়োগ দিতে আদেশ দেন হাইকোর্ট। কিন্তু এনটিআরসিএ নিয়োগ না দিয়ে রায় রিভিউ চেয়ে আবেদন করে। এসব কারণে নিয়োগে বিলম্ব হয়। তবে পুলিশ ভেরিফিকেশনের প্রয়োজন না হলে এসব প্রার্থী ইতিমধ্যেই নিয়োগ পেতেন।

অন্যদিকে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এভাবে ধীরগতির কারণে বেসরকারি স্কুল-কলেজে শূন্যপদের সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। লক্ষাধিক শিক্ষক পদ শূন্য। তথ্যমতে, এনটিআরসিএ-এর ৩য় গণবিজ্ঞপ্তিতে ৫৪ হাজার শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার কথা থাকলেও প্রাথমিক সুপারিশ হয়েছে মাত্র ৩৮ হাজার ২৬৮ জন প্রার্থীর । তাছাড়া, এবছরের জানুয়ারি থেকে সামনের নভেম্বর পর্যন্ত বর্তমান ও সম্ভাব্য মিলে লক্ষাধিক পদ শূন্য হবে।

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.