তরুণ সমাজ ভয়াবহ আক্রান্ত: মোটরসাইকেল এবং মোবাইল রোগে

অধ্যাপক আবুল ইসলাম শিকদার।।

মাথার রঙ করা চুলের বখাটে ছাট, হাতের কব্জিতে ব্রেসলেট কিংবা চুড়ি বয়লা টাইপের কিছু পরা, পরনে জিন্সের শার্ট প্যান্ট, মুখে বখাটে মার্কা দাড়ি, চোয়ালটা গাঁজাখোরের মতো ভাঙা, বয়স ষোল থেকে পঁচিশ।
এধরনের ষন্ডা মার্কা তরুণ কোন কষ্ট কল্পিত চরিত্র নয়।শহরের চেয়ে গ্রামের রাস্তাঘাটে বহুগুণ বেশি দৃশ্যমান। পাছার নিচে মোটরসাইকেল নেই এমন সংখ্যা খুবই কম।

এরা প্রায়ই নিম্নবিত্ত ঘরের ছেলেবেলে। বাপ হয়তো কোনরকমে ভিটেমাটি বেচে বিদেশে গেছে,কিংবা দেশেই দিনমজুর হিসেবে কাজ করে, রাজমিস্ত্রী, কাঠমিস্ত্রী, চায়ের দোকানদার, বাজারে কলা বিক্রেতা বা কোন কষ্টকর পেশায় নিয়োজিত।

এদের সন্তানদের স্কুলে ভর্তি করে বটে কিন্তু কোনদিনই লেখাপড়ার খোঁজখবর নেবার অবকাশ পায় না। ফেল করে করে পাশ করে। তারপর নাইন টেইনে উঠলেই আব্দার করে মোবাইল আর মোটরসাইকেলের।গাঁজা সহ নানা মাদকের সাথে এদের ঘটে ঘনিষ্ঠ পরিচয়। শুরু হয় দরিদ্র পিতামাতার উপর অত্যাচার।

দিতে হবে। কোত্থেকে দেবে তা তারা জানে না।চুরি চামারি শুরু করে।মারধোর করে মা বাবাকে। এরা আবার রাজনৈতিক দলের সাথেও যুক্ত হয়ে যায়। দলবেঁধে হাফপ্যান্ট পরে নিম্নবর্গের এক প্রাণীর মতো রাস্তায় হাটে। ঐ নিম্ন বর্গের প্রাণী কামড় দিলে তবু চৌদ্দ সুইতে রোগী সেরে ওঠে, কিন্তু এরা কামড়ালে তাৎক্ষণিক মৃত্যু নিশ্চিত করে।

হোন্ডা বা মোটরসাইকেলের আব্দারে এরা অশিক্ষিত মা বাপের কাছে আত্মহত্যার হুমকি দেয়।অসহায় অবিবেচক, পিতামাতা শেষপর্যন্ত কিনে দিতে বাধ্য হয়।ভিটেমাটি বিক্রি করে, নয়তো এনজিও থেকে লোন করে।তারপর কিস্তি পরিশোধ করতে করতে না খেয়ে মরে।

এদের বেপরোয়া গতির নিচে মানুষ মরে। শেষ পর্যন্ত নিজেও মরে।কোনভাবেই এদের নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। প্রতিদিনই দশ বিশজন বেঘোরে মারা যাচ্ছে। এদের বয়স্কদের প্রতি বিন্দুমাত্র ভক্তি শ্রদ্ধা নেই। রাস্তাঘাটে সালাম আদাব নেই।গলায় চেইন, বুকখোলা শার্ট, হাতে সিগারেট।

মাস্তানি ভাব নিয়ে হোটেল রেস্তোরাঁয় বসে। পাশে কে আছে না আছে কোন তোয়াক্কা নেই। মুখে অশালীন ভাষা। ঢাকার বিশেষ বিশেষ গালি এখন এদের দখলে। কেউ এদের কিছু সাহস করে বলতে পারে না। এরা সংখ্যায় একজন দু’জন নয়– হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ। এরা ধ্বংসের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। এরা মাঝে মাঝে জেল হাজত খেটে আরো পাকাপোক্ত মাস্তানে পরিণত হচ্ছে।

আমাদের প্রশ্ন হলো এরা কী করে ড্রাইভিং লাইসেন্স পায়? অবশ্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়াই চালায়। অনেক অশিক্ষিত পরিবার আবার মনে করে তাদের সন্তান হোমরাচোমরা একটা কিছু হয়ে গেছে। কারণ এরা আবার চাঁদাবাজি, মাস্তানি করে, গ্রামে বিচার সালিশিতে বাহিনী হিসেবে কাজ করে কিছু রোজগারও করে থাকে। এদের নির্দিষ্ট কোন কাজ নেই।

মানুষকে কখনো থাপড় কখনো ফাঁপর দিযে টাকা পয়সা হাতিয়ে নেয়। এদের ভাষায় ” ঠ্যাক” দিয়ে পয়সা কামায়। এইসব নষ্ট, মাতাল উদ্ভ্রান্ত, উন্মাদ তরুণরা রাজনৈতিক দলের মহা সম্পদ। একজন সম্ভবনাময় ভালো ছাত্র, তরুণ যুবকের কিন্তু এদের মতো কদর নেই। দেখবেন ভালো ছাত্রদের মোটরসাইকেল নেই।ক্ষেত্র বিশেষে মোবাইলও নেই। তাদের মা বাবার সামর্থ্য থাকার পরও এহেন মানসিক বৈকল্যপূর্ণ আব্দার দ্বারা তারা মা বাবাকে বিব্রত করে না।

জাতির ভবিষ্যৎ এই বিশাল তরুণ সমাজ আজ এহেন দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত। এভাবে দশ বিশ বছর চললে বাংলাদেশের অলিগলি পরিণত হবে নিষিদ্ধ পল্লীর মতোই।জানিনা আমাদের বর্তমান নেতৃত্ব এসব বিষয়ে সামান্যও উদ্বেগাক্রান্ত কিনা।

আমাদের সমাজের মেয়েগুলোও কি ভয়াবহ রকমের বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। এইসব বখাটে ছেলেদের মোটর সাইকেলের পেছনেই এরা চুল উড়িয়ে ভোঁ ভোঁ করে চলে যাচ্ছে। পেছনে সুন্দরী তরুণী বসিয়ে ওর মোটরসাইকেলের গতিবেগ উঠে যায় দেড়শোতে। মাঝে মাঝে তরুণী সহই ওপারে চলে যাচ্ছে।

আফসোস নেই।তবুও জীবন সার্থক। আচ্ছা কোন ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে মেয়েরা ওদের গাড়ির পেছনে ওঠে? ক্লাসের কোন ফার্স্ট বয়কে কোনদিন কোন মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে যেতে তো দেখিনি।

এদের নিয়ে ভাবনার জরুরি প্রয়োজন। পিতামাতা, অভিভাবকদের ‘আজাইরা’ স্নেহ আদর দমন করতে হবে। আত্মহত্যা করতে চায় করুক। করবে না।কারণ ও দেখেছে বন্ধু বান্ধবরা এভাবেই আদায় করেছে। বড়ই সস্তা কৌশল। সমাজের গণ্যমান্যদের গা এড়িয়ে গেলে চলবে না। সবাই এক হয়ে ধমক দিতে হবে।

প্রশাসনের কার্যকর নজর দিতে হবে। ড্রাইভিং লাইসেন্সের জোচ্চুরি বন্ধ করতে হবে। সকল প্রকার বখাটেপনা কঠোর হাতে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। এসব করার জন্য কোন অপেক্ষার সময় নেই।এখন থেকেই শুরু করতে হবে। পরিবার,সমাজ এবং রাষ্ট্রকে একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।