ঢাবির প্রথম ট্রান্সজেন্ডার শিক্ষার্থী অঙ্কিতা ইসলাম

শিক্ষাবার্তা ডেস্কঃ  সাধারণ শিশুর মতো জন্ম হলেও বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজের মধ্যে এক ধরনের পরিবর্তন বুঝতে পারেন ‘জাহিদুল ইসলাম’। ছোটবেলা থেকেই শাড়ি, চুড়ি পরতে ভালো লাগত তার। স্বপ্ন দেখতেন বড় হয়ে সংসার করবেন। তবে এ স্বপ্নের সঙ্গে সমানতালে চলতে থাকে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন। তারপরও থেমে থাকেননি। গ্রাম থেকে উঠে আসা জাহিদুল ইসলাম রূপান্তরিত হয়ে এখন অঙ্কিতা ইসলাম। চাকরি করছেন ব্র্যাক ব্যাংকে। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ব্যবস্থাপনা বিভাগে এক্সিকিউটিভ এমবিএ করার সুযোগ পেয়েছেন তিনি।

অঙ্কিতা জানান, টাঙ্গাইল জেলার দেলদুয়ার উপজেলায় বাড়ি তার। বেলায়েৎ হোসেন বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করার পর তিনি ভর্তি হন টাঙ্গাইলের সরকারি সা’দত কলেজে। সেখান থেকে গণিতে স্নাতক পাস করেন। ছোটবেলা থেকে অনেক ভয় ও নির্যাতনের মধ্যে দিন কেটেছে তার। নিয়মিত যাতায়াত করতে পারেননি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন থাকলেও ভয় ও দারিদ্র্যের কারণে ভর্তি পরীক্ষায় বসেননি। তবে স্নাতক পাস করার পর ব্র্যাক ব্যাংকে চাকরির সুযোগ হলে নিজের পরিচয়ে নতুন জীবন ফিরে পান তিনি। ব্র্যাক ব্যাংকও তার স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে আসে। একপর্যায়ে তিনি ঢাবিতে ভর্তি হওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালান। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় টিকেও যান। তবে সমস্যা সৃষ্টি হয় কোর্স ফি নিয়ে। সাড়ে ৩ লাখ টাকা জোগাড় করা অঙ্কিতার পক্ষে সম্ভব ছিল না। তার পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সদয় হয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। দুই বছরের বাণিজ্যিক প্রোগ্রামের টাকা মওকুফ করে ঢাবি কর্তৃপক্ষ। এই লড়াইয়ে তার পাশে থেকেছেন ট্রান্সজেন্ডার অ্যাক্টিভিস্ট হোচিমিন ইসলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও বিষয়টি ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন।

এ বিষয়ে অঙ্কিতা ইসলাম বলেন, আমি সবার থেকে আলাদা, সেটি ছোটবেলা থেকেই বুঝতে পারতাম। পুতুল দিয়ে খেলা, শাড়ি, চুড়ি পরা আমার ভালো লাগত। সংসার, বিয়ের স্বপ্ন আমি ছোটবেলা থেকেই দেখতাম। তবে আমি ট্রান্সজেন্ডারের বিষয়টি পরিবারকে বোঝাতে গেলে পরিবারে ট্রান্সজেন্ডার বাচ্চা থাকা অশুভ বলে সবাই বলতে থাকল। এ কারণে পরিবারের সঙ্গে আমার সম্পর্ক খারাপ হতে থাকল। সমাজের মানুষ আমাকে ভিন্ন চোখে দেখা শুরু করল।

ছোটবেলায় নির্যাতনের বিষয়ে তিনি বলেন, আমি স্কুলে গেলে বুলিংয়ের শিকার হতাম। যখন ক্লাসে যেতাম, তখন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা আমাকে বুলিং করত। বিচার দিলে বিচার না করে উল্টো আমাকে দোষ দিত।

ব্র্যাক ব্যাংকের অবদানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ব্র্যাক ব্যাংক বিজ্ঞপ্তি দিলে আমি আবেদন করি। তারা আমার পরিচয় জেনেও আমাকে নিয়োগ দিয়েছে। এ ব্যাংকে চাকরি হওয়ার পর আমি নিজের পরিচয় প্রকাশের জন্য পরিবার থেকে বের হয়ে আসি। আমি এখানে আমার জেন্ডার আইডেন্টি নিয়ে সম্মানের সঙ্গে অনেক স্বচ্ছ পরিবেশে কাজ করছি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির বিষয়ে তিনি বলেন, আমার জীবনের অনেকটা সময় ট্রমার মধ্যে কাটিয়েছি। কারও সঙ্গে ঠিকমতো কথা বলতে পারতাম না। পরিবার দরিদ্র থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিতে পারিনি। তবে চাকরি নেওয়ার পর মনে হলো মাস্টার্স করব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞপ্তি দেখার পর আবেদন করি। ভাবছিলাম হবে না। আমাদের তো সব জায়গায় সুযোগ থাকে না। এখানে লিখিত পরীক্ষা দেওয়ার পর পাস করি। ভাইভার সময় ভয় করছিল। তবে মৌখিক পরীক্ষায় শিক্ষকরা অনেক আন্তরিক ছিলেন।

ঢাবির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে অঙ্কিতা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্স ফি ছিল সাড়ে ৩ লাখ টাকা। এটি দেখার পর ভাবছিলাম ভর্তি হতে পারব না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। সেজন্য তাদের ধন্যবাদ জানাই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মুহাম্মাদ আব্দুল মঈন বলেন, আমরা উদ্যোগ নিয়ে তাকে সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, বিভাগ, আমাদের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও এটিকে ইতিবাচকভাবে দেখছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া দরকার, বিশ্ববিদ্যালয় সেটি চেষ্টা করছে। এটি আমাদের প্রথম অভিজ্ঞতা। তাকে যে ধরনের সহায়তা করা দরকার, আমরা করব।

উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. তানিয়া হক বলেন, ট্রান্সজেন্ডার তাদের অধিকার থেকে বিতাড়িত হয়েছে অনেক বছর। এক সময় নারীরা পড়াশোনা করতে না। কিন্তু এখন সবাই পড়াশোনা করে। এখন ট্রান্সজেন্ডার শুরু করেছে। এটি আমাদের কাছে আশ্চর্যের বিষয় নয় যে, সমাজে তারা জায়গা পাচ্ছে। আসলে জায়গা তাদের প্রথম থেকেই পাওয়ার কথা। তবে দেরিতে হলেও বর্তমান সরকার তাদের বিষয়ে যে ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে, সেজন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানাই। রাষ্ট্র যেহেতু তাদের জায়গা করে দিচ্ছে, সেহেতু স্বয়ংক্রিয়ভাবে তারা পরিবার ও সমাজেও সম্মান পাবে।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি মানবিক, অসাম্প্রদায়িক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ক্যাম্পাস। অঙ্কিতা নিজের যোগ্যতায় এতদূর পর্যন্ত এসেছে। তার পাশে থাকা আমাদের দায়িত্ব, সে দায়িত্বটা আমরা পালন করার চেষ্টা করেছি। এটি জেন্ডার সমতা নিশ্চিত করার একটি ধাপ। বিশ্ববিদ্যালয়ের এ উদাহরণটি দেশের অন্য প্রতিষ্ঠানকে অনুপ্রেরণা দেবে।

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/০১/১৩/২৩