ডিজিটাল দেশে অ্যানালগ দুদক

নিউজ ডেস্ক।।

রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ে অভিযোগ। দীর্ঘ অনুসন্ধান, অতঃপর নিষ্পত্তি। পরপরই ঢাকার সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে আরেক অভিযোগ। দীর্ঘ অনুসন্ধান-পরিক্রমা শেষে নথিভুক্ত হয় সেটিও। ফের জমা পড়ে ‘দুর্নীতির অভিযোগ। একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে বারবার দায়েরকৃত অভিযোগে প্রতিবারই ‘অনুসন্ধান’ করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। প্রমাণিত না হওয়ায় প্রতিবারই দেয়া হচ্ছে অব্যাহতি। এভাবে ‘অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধানের নামে দুর্নীতিবিরোধী এই সংস্থা এক ব্যক্তির পেছনেই ব্যয় করেছে ৩২ বছর। এর মধ্যে ‘ব্যুরো’ থেকে ‘কমিশন’ হয়েছে। গত হয়েছে, একের পর এক কমিশন। কর্মকর্তাদের বদলি হয়েছে। অবসরেও চলে গেছেন অনেকে। কিন্তু ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে এখনও অনুসন্ধান চলছে।

তিন দশকের এই ঘটনা পরম্পরা বেশ দীর্ঘ। তবে এর সংক্ষিপ্ত বিবরণ মোটামুটি এরকম : নথির স্মারক অনুযায়ী ১৯৯০ সালে তৎকালীন দুর্নীতি দমন ব্যুরোতে কে বা কারা একটি বেনামী দরখাস্ত ফেলে যায়, নাটোর, গোয়ালডাঙ্গা গ্রামের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী মো: আবুল কাশেমের বিরুদ্ধে। অপরাধ,আবুল কাশেম সরকারি চাকরির পাশাপাশি ব্যবসা করছেন। অভিযোগ ভিত্তিহীন হওয়ায় তিনি অব্যাহতি (স্মারক নং-দর/৯০/নাটোর/৬৯৫,তারিখ:১০/০১/১৯৯৪) লাভ করেন। অনুসন্ধানটি পরিচালিত হয় দুর্নীতি দমন ব্যুরোর নাটোর জেলা কার্যালয় থেকে। ২০০৪ সালে আইনের মাধ্যমে ‘ব্যুরো’ ‘কমিশনে’ পরিণত হয়। কিন্তু তার আগেই ব্যুরোর ঢাকা অফিসে আবুল কাসেমের বিরুদ্ধে জমা পড়ে আরেকটি অভিযোগ। সত্যতা না পাওয়ায় দুদকের অনিষ্পন্ন বিশেষ সেল-২ এর উপ-পরিচালক আব্দুল কাদের মিয়া ২০০৬ সালের ২৪ জুন নথিভুক্তির সুপারিশ করেন। কমিশন প্রতিবেদনটির অনুমোদন না দিয়ে পুনঃঅনুসন্ধানে পাঠায়। তৎকালীন উপ-পরিচালক কেএম আমিরুল আলমও পূর্বতন কর্মকর্তার সুপারিশের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করে ২০০৯ সালের ২২ এপ্রিল সংশ্লিষ্ট পরিচালক বরাবর ফরোয়ার্ড করেন। একইবছর ১১ নভেম্বর তৎকালীন উপ-পরিচালক (পরে পরিচালক) মোহাম্মদ বেলাল হোসেন নথিভুক্তির সুপারিশ করে কমিশনে প্রতিবেদন দেন। কমিশন তখন কিছু ‘কয়েরি’ দিয়ে ফাইলটি পরিচালকের টেবিলে ফেরত পাঠায়। পরিচালক মেজর শাহরিয়ার আমিন ২০০৯ সালের ৯ ডিসেম্বর অনুসন্ধান কর্মকর্তার সঙ্গে সহমত পোষণ করে মহাপরিচালককে (বিশেষ অনুসন্ধান ও তদন্ত) ফরোয়ার্ড করেন। নির্ধারিত ছক অনুযায়ী উপস্থাপিত না হওয়ায় ছক অনুযায়ী উপস্থাপনের জন্য তৎকালীন উপ-পরিচালক মনিরুজ্জামান খান ২০১০ সালের ১০ জানুয়ারি চিঠি লেখেন। ২০১০ সালের ২১ মার্চ উপ-পরিচালক মোহাম্মদ বেলাল হোসেন নথিভুক্তির সুপারিশ করে পুনঃপ্রতিবেদন দেন। পরিচালক মেজর শাহরিয়ার আমিন ২০১০ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি একমত পোষণ করে মহাপরিচালককে আবারও ফরোয়ার্ড করেন। ২০১০ সালের ২১ মার্চ কিছু ‘কয়েরি’র আলোকে মনিরুজ্জামান খান পুনঃপ্রতিবেদন দাখিল করতে চিঠি দেন। ২০১০ সালের ৩ জুন ‘কয়েরি’র আলোকে অনুসন্ধান করে মোহাম্মদ বেলাল হোসেন পুনরায় নথিভুক্তির সুপারিশ করেন। অবশ্য এর আগেই ২০০৯ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পৃথক আরেকটি অভিযোগের প্রেক্ষিতে দুদকের ঢাকা সমন্বিত জেলা কার্যালয় আবুল কাশেমকে সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিশ (স্মারক নং-দুদক/সজেকা/ঢাকা-২/১০৯৭) দেয়। তিনি এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট (নং-৩৯৪১/২০১০) করেন। শুনানি শেষে হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ দুদকের নোটিশ কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে নাÑ এই মর্মে রুল জারি করেন। রুলের চূড়ান্ত শুনানি শেষে হাইকোর্ট তার আদেশে বলেন, আবুল কাশেম একজন করদাতা এবং গ্রুপ অব কোম্পানির মালিক। তিনি তিতাসে কর্মরত থাকলেও সরকারি চাকরিতে সক্রিয় ছিলেন মাত্র আড়াই বছর। ২০০৩ সালে প্রাপ্য পূর্ণ বেনিফিট নিয়ে তিনি চাকরি থেকে ইস্তফা দেন। হাইকোর্টে আবুল কাশেমের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ এবং অ্যাডভোকেট মো.আবুল কালাম পাটওয়ারি।

এ রায়ের বিরুদ্ধে দুদক সিভিল পিটিশন ফর লিভ টু আপিল (সিপি) করে। কিন্তু দুদক সিপি ফাইল করে নির্ধারিত সময় অতিক্রান্ত হওয়ার অনেক পরে। ফলে তামাদিজনিত কারণে সুপ্রিম কোর্ট সিপি ডিসমিস করে দেন।
ইতোপূর্বেকার অনুসন্ধান যেহেতু বৈধতা হারিয়েছে তাই নতুন অভিযোগের ভিত্তিতে ২০১৮ সালে আবুল কাশেম এবং তার স্ত্রী উম্মে কুলসুম মমতাজের বিরুদ্ধে দুদকের সজেকা,ঢাকা-১ আবারও অনুসন্ধান (স্মারক নং-৩১৩৭,তারিখ-৩০/১০/১৮ ই/আর নং-৩৪/১৮) শুরু করে। এক পর্যায়ে ২০১৯ সালের ২৮ মার্চ আবুল কাশেম এবং উম্মে কুলসুম মমতাজের বিরুদ্ধে একই তারিখে পৃথক সম্পদ বিবরণী নোটিশ (স্মারক নং-০০.০১.২৬০০.৭০২.০১.০৩৪.১৮-১২৭৬ এবং স্মারক নং-০০.০১.২৬০০.৭০২.০১.০৩৪.১৮-১২৭৬) জারি হয়। নির্ধারিত সময়ে তারা সম্পদ বিবরণী দাখিলও করেন। দাখিলকৃত সম্পদ বিবরণী যাচাই করেন উপ-পরিচালক মো: আব্দুল মাজেদ। তিনি এ বিষয়ক রেকর্ডপত্র সংগ্রহ, জিজ্ঞাসাবাদ এবং ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তার পাশাপাশি একই অনুসন্ধান চালান দুদকের সহকারী পরিচালক মো: রেজাউল করিম। উভয়ের অনুসন্ধানে আবুল কাশেম দম্পতির অবৈধ সম্পদের কোনো সত্যতা মেলেনি। উভয়েই নথিভুক্তির সুপারিশ দিয়ে প্রতিবেদন দেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও কমিশন ‘কয়েরি’ দিয়ে ফাইলটি নিচে ফেরত পাঠায়। দীর্ঘ দিন ধরে এটি পরিচালক শেখ মো. ফানাফিল্যাহর টেবিলে পড়ে আছে।

এভাবেই ৩২ বছর ধরে ‘চলমান’ রয়েছে শিল্পপতি আবুল কাশেম এবং তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে অনুসন্ধান। কবে এই ‘অনুসন্ধান’ শেষ হবে-বলতে পারছেন না তিনি। উল্লেখ করার মতো বিষয় হচ্ছে, আবুল কাশেম কর্মজীবনের শুরুতে তিতাস গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিতে আড়াই বছর চাকরি করেছেন। এ কারণে প্রতিটি অভিযোগেই তাকে তিতাস গ্যাসের কর্মচারি হিসেবে সনাক্ত করা হয়। অথচ গত তিন দশকে তিল তিল পরিশ্রম করে নিজ মেধা,দক্ষতা ও যোগ্যতার পরিচয় দিয়ে একটি শিল্প পরিবারের মালিক হয়েছেন এবং বহু মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছেন- সেটি উল্লেখ করা হয় না। এটিই হচ্ছে দুদকের চোখে ‘অপরাধ’। তবে দুদক কিসের ভিত্তিতে, কেন বারবার একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে তিন দশক ধরে অনুসন্ধান চালাচ্ছে- সেটির কোনো জবাব নেই।

আইনজ্ঞদের মতে, দেওয়ানি কার্যবিধির ১০ ও ১১ ধারায় ইতিপূর্বে পরিসমাপ্ত/পরিচালিত কোনো অনুসন্ধান/তদন্তের অংশ পুনরায় অনুসন্ধান/তদন্ত করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আপিল বিভাগের রায় হাইকোর্ট প্রতিপালন করতে বাধ্য। সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগের রায়, আইন ও সিদ্ধান্ত অধঃস্তন সব আদালতের অনুসরণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু দুদক সেসবের কোনো তোয়াক্কাই করেনি। একই প্রতিষ্ঠানের রাজশাহী বিভাগ পরিচালিত অনুসন্ধান পরিসমাপ্তির পর ঢাকা বিভাগও অনুসন্ধান করেছে।

এরকম শুধু একজন আবুল কাশেম নন। সংস্থাটিতে এমন অনেক আবুল কাশেম রয়েছেন-যাদের অনুসন্ধান চলছে যুগ যুগ ধরে। চলমান রয়েছে একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে একাধিক অনুসন্ধান। তিতাসের তৎকালীন এমডি নওশাদুল ইসলামের বিরুদ্ধে একই সঙ্গে ৭টি অনুসন্ধান চলেছে। পরে অবশ্য এই প্রকৌশলী এবং তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদের মামলা করেছে দুদক। নৌপরিবহন অধিদফতরের সার্ভেয়ার মির্জা সাইফুর রহমানের বিরুদ্ধে সম্পদের অনুসন্ধান চলছে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে। পরে তাকে ফাঁদ মামলায় গ্রেফতার করে সংস্থাটি। নৌ-বাণিজ্য দফতর চট্টগ্রামের প্রিন্সিপাল অফিসার ক্যাপ্টেন গিয়াসউদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে চলমান অনুসন্ধান কেবল হাতবদল হচ্ছে। অর্ধযুগ ধরে চলমান অনুসন্ধানের কোনো কিনারা হয়নি। এমন বহু দৃষ্টান্ত দেয়া সম্ভব। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসবের কিছু হচ্ছে পরিকল্পিতভাবে আবার কিছু হচ্ছে সমন্বয়হীনতার কারণে। তাদের মতে,প্রতিষ্ঠার দেড়যুগ পেরিয়ে গেলেও দুদক একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার (সেন্ট্রাল ডাটাবেজ) প্রণয়ন করতে পারেনি। ফলে কোন নথি কার কাছে কতদিন ধরে আছে কমিশনের পক্ষে সেটি জানা সম্ভব হচ্ছে না। এ বিষয়ে দুদকের সাবেক মহাপরিচালক (লিগ্যাল) মো. মঈদুল ইসলাম বলেন, ডিজিটালের এই যুগে এ ধরনের ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। দুদকে দায়িত্ব পালনকালে আমার কাছেও এরকম অনেক নথি এসেছে যেটি কি না হেড অফিসেরই একাধিক অফিসার অনুসন্ধান-তদন্ত করছেন। এটি সংস্থাটির বড় ধরণের সমন্বয়হীনতা। ডাটাবেজ থাকলে এমনটি হতো না। একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে ৩২ বছর ধরে একই অনুসন্ধান বারবার পরিচালনা প্রসঙ্গে সাবেক এই মহাপরিচালক বলেন, তাহলে অনুসন্ধান-তদন্তের নির্ধারিত সময়সীমা থাকার মানে কী? অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কমিশন ইও নিয়োগ দিয়েই অনুসন্ধানের কোনো খোঁজ রাখে না। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা যখন প্রতিবেদন দাখিল করেন, তখন কমিশনের খবর হয়। তখনই ‘কয়েরি’ দিয়ে অনুসন্ধান আরো বিলম্বিত করা হয়। নিরপরাধ মানুষের হয়রানি লাঘবে-এর একটি উপায় বের করা জরুরি।

এদিকে দুদকের অনুসন্ধান-তদন্তে স্বচ্ছতা এবং হয়রানিমুক্ত করার লক্ষ্যে একটি ‘সেন্ট্রাল ডাটাবেজ’ প্রণয়নের কাজ চলছে ৬ বছরেরও বেশি সময় ধরে। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও অগ্রগতি বলতে শূন্য শতাংশ। কি প্রক্রিয়ায় ডাটাবেজ প্রণয়ন করা সম্ভব, কোন্ কোন্ সেকশনে কি ধরনের পরিবর্তন আনতে হবেÑ ইত্যাদি বিষয়ে বুয়েটের একজন আইটি বিশেষজ্ঞকে পরামর্শক নিয়োগ করা হয়েছিল। তিনিও কোনো অগ্রগতি দেখাতে না পারায় ‘পেমেন্ট’ আটকে দেয়া হয়েছে। প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল আওয়াল এ প্রতিবেদককে বলেন, সেন্ট্রাল ডাটাবেজ প্রণয়নের কাজ অব্যাহত রয়েছে। এ প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ ২টি বিষয় এর মধ্যেই রেডি হয়েছে। এর একটি হচ্ছে ফরেনসিক ল্যাব। সেন্ট্রার ডাটাবেজ প্রকল্পের কাজ চলছে এ সংক্রান্ত কমিটির নির্দেশনা-পরামর্শ অনুযায়ী। মহাপরিচালক সৈয়দ মো: ইকবাল হোসেন কমিটির প্রধান। করোনা এবং কৃচ্ছ্রতা সাধন নীতিকেও প্রকল্প না এগোনোর পেছনে অনেকটা দায়ী বলে জানান এই পরিচালক।