জাল সার্টিফিকেট দিয়ে আবারো বহির্গমন ছাড়পত্র নেয়ার চেষ্টা

নিজস্ব প্রতিবেদক।।

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর বহির্গমন ছাড়পত্র বিভাগকে ঘিরে গড়ে উঠেছে দুষ্ট চক্র। কিছু রিক্রুটিং এজেন্সির সদস্যরা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে জাল-জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতে কর্মী প্রেরণ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এভাবে চক্রের সদস্যরা বহির্গমন ছাড়পত্রের নামে টাকা হাতিয়ে নিলেও বিদেশে যাওয়ার পর মহাবিপদে পড়ছেন অসহায় শ্রমিকরা।

সম্প্রতি বিএমইটির কর্মকর্তা-কর্মচারী ও এজেন্সির যোগসাজছে জাল-জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে দুবাইয়ে কর্মী প্রেরণ চক্রের নেপথ্যে রহস্য প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তদন্তে কিছুটা উঠে আসে। এরপরও থামেনি রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর বহির্গমন ছাড়পত্র গ্রহণে জাল-জালিয়াতি আর অনিয়মের কাজ কারবার। এবার বিএমইটি কর্তৃপক্ষ এই চক্রের বিরুদ্ধে কিছুটা সক্রিয় হয়ে উঠছে বলে অভিবাসনের সাথে সম্পৃক্তরা মনে করছেন।

যদিও আবুধাবি, দুবাই ও ইউরোপের কয়েকটি দেশে বহির্গমন ছাড়পত্র প্রদানের নামে চক্রের সদস্যরা কোটি কোটি হাতিয়ে নিয়েছে। তদন্তে কিছু ‘জামাই সিন্ডিকেট’ এর সদস্যরা ছাড় পেয়ে গেছেন বলেও রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকদের পক্ষ থেকেই অভিযোগ রয়েছে। তাদের দাবি- এখনো যেসব এজেন্সি জাল-জালিয়াতি করে বহির্গমন ছাড়পত্র নিয়ে জড়িত থাকার পরও নানা কৌশলে ছাড় পাওয়ার চেষ্টায় তৎপর রয়েছেন। সেই এজেন্সিগুলোর বিষয়ে নতুন করে তদন্ত করে পুরো জালিয়াত চক্রের মুখোশ উন্মোচন করে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার জোর দাবি উঠেছে বায়রার সাধারণ সদস্য ও অভিবাসন সংশ্লিষ্টদের মধ্যে থেকেই।

গত ১৫ নভেম্বর আবারো একটি রিক্রুটিং এজেন্সির নামে সংযুক্ত আরব আমিরাতে কর্মী প্রেরণের জন্য ছাড়পত্র নিতে বিএমইটির বহির্গমন শাখায় ডকুমেন্ট জমা দেয়া হয়। এসব ডকুমেন্ট যাচাই করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হন, জমা দেয়া কাগজের মধ্যে বেশির ভাগ সার্টিফিকেট জাল। এরপরই ওই রিক্রুটিং এজেন্সির মালিককে বিএমইটি থেকে কারণ দর্শানো নোটিশ পাঠিয়ে তিন দিনের মধ্যে সশরীরে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। জবাব দিতে ব্যর্থ হলে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়।

বিএমইটি সূত্র জানিয়েছে, গত ১৬ নভেম্বর বিএমইটির পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ, বহির্গমন) উপসচিব মো: জাকির হোসেন স্বাক্ষরিত কারণ দর্শাও নোটিশটি পাঠানো হয় ফকিরাপুলের জি নেট টাওয়ারের (৭ম) তলার মেসার্স এইচপি ওভারসিজ লিমিটেডের (আরএল-১৩৮৮) ম্যানেজিং ডিরেক্টর প্রবীর বনিকের কাছে। নোটিশে বলা হয়, ১৫ নভেম্বর সংযুক্ত আরব আমিরাতগামী ৩০ জন কর্মীর বহির্গমন ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করেন তিনি। দাখিলকৃত আবেদনে ৯ জনকে প্রত্যাগত কর্মী হিসেবে এবং ২১ জন কর্মীর পিডিও সার্টিফিকেট দাখিল করেন। পিডিও সার্টিফিকেটের কিউআর কোড স্ক্যান করে প্রাথমিকভাবে ২০টি সনদ জাল প্রমাণিত হয়।

আপনার এ ধরনের কার্যকলাপ বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন, ২০১৩ এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী (রিক্রুটিং এজেন্ট লাইসেন্স ও আচরণ) বিধিমালা, ২০১৯-এর লঙ্ঘন। জাল সার্টিফিকেট দাখিল করে প্রতারণার মাধ্যমে বহির্গমন ছাড়পত্র গ্রহণের চেষ্টার তিন কর্মদিবসের মধ্যে সশরীরে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা প্রদানের জন্য অনুরোধ করা হলো। ব্যর্থতায় এ বিষয়ে আপনার কোনো জবাব নেই মর্মে গণ্য করে একতরফা নিষ্পত্তি এবং আইন ও বিধিমোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়। নোটিশের চিঠি অনুযায়ী চার দিন আগেই ব্যাখ্যা প্রদানের সময় শেষ হয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার দুপুরের দিকে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর মহাপরিচালক মো: শহীদুল আলমের সাথে জাল জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে রিক্রুটিং এজেন্সি এইচপি ওভারসিজের বহির্গমন ছাড়পত্র নেয়ার চেষ্টা প্রসঙ্গে জানতে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাড়া দেননি।

তবে বিএমইটির পরিচালক জাকির হোসেন গতকাল দুপুরের দিকে নয়া দিগন্তকে বলেন, রিক্রুটিং এজেন্সি এইচপি ওভারসিজ লিমিটেড কারণ দর্শাও নোটিশের ব্যাখ্যা আমাদের দিয়েছে। পরবর্তী পদক্ষেপ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখন আইন অনুয়ায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। এর আগে বিএমইটি থেকে দুবাইগামীদের বহির্গমন ছাড়পত্র গ্রহণে জাল-জালিয়াতির সাথে সম্পৃক্ত বিএমইটির কর্মকর্তা কর্মচারী ও সংশ্লিষ্ট এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ইতোমধ্যে তাদের কারো কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। তা ছাড়া বিষয়টি প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে দেখা হচ্ছে বলে জানান পরিচালক মো: জাকির হোসেন।

গতকাল মঙ্গলবার বেলা ২টার দিকে মেসার্স এইচপি ওভারসিজের ম্যানেজিং ডিরেক্টর প্রবীর বনিকের দু’টি মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করার পরও তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি। অপর দিকে এসব অনিয়ম জালিয়াতির সাথে রিক্রুটিং এজেন্সির সদস্য জড়িয়ে পড়ার অভিযোগের বিষয়ে বায়রার মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমানের বক্তব্য জানতে গতকাল দুপুরে যোগাযোগ করা হলে তারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি

অভিবাসন বিশ্লেষকরা বলছেন, বহির্গমন ছাড়পত্রে স্বচ্ছতা আনা জরুরি হয়ে পড়েছে। নতুবা এর ফলে আমাদের দেশের অসহায় গরিব মানুষগুলোকে বিদেশে গিয়ে বড় ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হবে। ইতোমধ্যে জাল-জালিয়াতির খপ্পরে পড়ে যেসব শ্রমিক বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন তারা দুবাইসহ অন্যান্য দেশে বেকার জীবন কাটানোসহ নানাভাবে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন, কেউ কেউ জেলে রয়েছেন বলে তারা জানতে পারছেন। এর জন্য অবশ্যই যারা দোষী তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। নতুবা এই সেক্টরে জালিয়াতি প্রতিনিয়ত বাড়তেই থাকবে।