জাল রায়ে ফাঁসল এটিওরা

নিউজ ডেস্ক।।

সহকারী থানা শিক্ষা কর্মকর্তাদের (এটিও) মধ্য থেকে পদোন্নতির মাধ্যমে থানা শিক্ষা কর্মকর্তা (টিও) হওয়ার জন্য ২০ শতাংশ কোটা রয়েছে। ১৯৯৪ সালের ওই বিধি চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করা হয় ২০১৬ সালে। রিট মামলাটি (রিট নং-৮৬/২০১৬) খারিজ হয়ে যায়। তবে রিট মামলাটি মঞ্জুর (রুল অ্যাবসলুট) করে হাইকোর্ট এটিওদের মধ্য থেকে ৮০ শতাংশ টিও নিয়োগ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন- এমন জাল রায় তৈরি করে একটি সিন্ডিকেট। ওই জাল রায় ঢোকানো হয় হাইকোর্টের রেকর্ড শাখায় সংরক্ষিত নথিতেও। রিট খারিজের (রুল ডিসচার্জ) রায় পরিবর্তন করে নথিতে ‘রিট মঞ্জুরের’ রায় ঢুকিয়ে রাখা হয়। রিট মঞ্জুরের এই ‘রায়ের’ বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আপিল করে কর্তৃপক্ষ। তবে সিন্ডিকেটটি এতটাই শক্তিশালী যে, আপিল শুনানিকালে জাল রায়ের বিষয়টি ধরা পড়ে যেতে পারে- এমন আশঙ্কা থেকে আপিলটি পরবর্তীতে প্রত্যাহার করিয়ে নেওয়া হয়।

অন্যদিকে, ওই জাল রায়ের ভিত্তিতে ‘প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের গেজেটেড অফিসার ও নন-গেজেটেড কর্মচারীদের নিয়োগ বিধিমালা-১৯৮৫’ পুনরায় সংশোধনের উদ্যোগ নেয় সরকার। ‘প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের গেজেটেড অফিসার ও নন-গেজেটেড কর্মচারীদের নিয়োগ বিধিমালা, ২০২১’ নামে নিয়োগবিধি সংশোধনের প্রস্তাব করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ওই প্রস্তাব অনুমোদনও করেছেন। প্রস্তাবটি পাঠানো হয় বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশনেও (পিএসসিতে)। কিন্তু এর মধ্যেই রায় জালিয়াতির বিষয়টি টের পেয়ে যায় শিক্ষা কর্মকর্তাদের আরেকটি গ্রুপ। তারা একই রিট আবেদন খারিজ ও আবেদন মঞ্জুরের ভিন্ন দুটি নকল সার্টিফাইড কপি হাতে পান। পরে বিষয়টি তদন্ত চেয়ে সুপ্রিমকোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল বরাবর চিঠি লেখেন ফেনী পিটিআই ইন্সট্রাক্টর ও বাংলাদেশ পিটিআই কর্মকর্তা সমিতির আইন সম্পাদক জাকির হোসেন।

চিঠির ভিত্তিতে সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসন তদন্ত করে দেখতে পায়, হাইকোর্টে সংরক্ষিত নথিতে রিট মঞ্জুর করা হয়েছে মর্মে রায়ের কপি রয়েছে। তবে নথির ভেতরে রিট খারিজের বিষয়টি উল্লেখ আছে। পরে তদন্তকারী কর্মকর্তা ওই রায় প্রদানকারী দুই বিচারপতিকেও বিষয়টি দেখান। বিচারপতিরাও রায় জালিয়াতির বিষয়টি ধরে ফেলেন। নথির একেবারে ওপরে যেখানে বিচারপতিরা রায় প্রদানকালে রুল খারিজ লিখেছিলেন, সেই অংশটি নথিতে রক্ষিত পাতা থেকে ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। পাশাপাশি আবেদন মঞ্জুর করা হয়েছে মর্মে একটি জাল রায়ের কপি ঢোকানো হয়েছে।

পরে বিষয়টি প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীকে জানানো হয়। তিনি হাইকোর্টের বিচারপতি নাঈমা হায়দারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি বিশেষ বৃহত্তর বেঞ্চ গঠন করে দেন। এতবড় জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত সিন্ডিকেট ধরতেই এই বেঞ্চ গঠন করা হয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। বেঞ্চের অন্য দুই সদস্য হচ্ছেন- বিচারপতি জাকির হোসেন ও বিচারপতি কাজী জিনাত হক। শিগগিরই এই বেঞ্চ বসে জালিয়াতির বিষয়ে আদেশ দেবেন বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় ফেঁসে যেতে পারেন রিট দায়েরকারী সহকারী থানা শিক্ষা কর্মকর্তা, আইনজীবী, আদালতের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ এই জাল রায় তৈরির সঙ্গে জড়িত সিন্ডিকেটের সদস্যরা।

জানা যায়, পিএসসির সুপারিশক্রমে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ‘প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের গেজেটেড অফিসার ও নন-গেজেটেড কর্মচারীদের নিয়োগ বিধিমালা-১৯৮৫’ তৈরি করে। এই বিধিমালায় এটিওদের মধ্য থেকে টিও পদে পদোন্নতির জন্য ৫০ শতাংশ কোটা রাখা হয়। আর বাকি ৫০ শতাংশ টিও সরাসরি নিয়োগের বিধান রাখা হয়। ১৯৯১ সালে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এটিওদের মধ্য থেকে ৮০ শতাংশ টিও নিয়োগের জন্য শিক্ষা সচিব বরাবর সুপারিশ করে। কিন্তু ১৯৯৪ সালে এই বিধিমালা সংশোধন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এটিও থেকে টিও হওয়ার কোটা ২০ শতাংশে নামিয়ে আনে। ২০০২ সালে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর আবারও এই কোটা ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৮০ শতাংশ করতে সুপারিশ করে। পরে এটিও মুন্সি রুহুল আসলাম হাইকোর্টে রিট করেন। ২০১৬ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রিটটি পর্যবেক্ষণ সহকারে খারিজ করে দেন বিচারপতি আশফাকুল ইসলাম ও বিচারপতি জাফর আহমেদের বেঞ্চ।

এরপরই জালিয়াতির ঘটনাটি ঘটে। রিট মঞ্জুর হয়েছে মর্মে জাল রায় তৈরি করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের কাছে দাখিল করা হয়। জাল রায়ে বলা হয়, হাইকোর্ট প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ২০০২ সালে এটিও থেকে টিও পদে পদোন্নতির কোটা ২০ শতাংশ থেকে ৮০ শতাংশে বৃদ্ধি করতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে যে সুপারিশ করে তা বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরে এই জাল রায়ের বিরুদ্ধে সরকার পক্ষ থেকে আপিল বিভাগে আপিল করা হয়। পরবর্তীতে ২০২০ সালের ৯ জুলাই প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে সরকারের সলিসিটর অফিসে একটি চিঠি পাঠানো হয়। এতে বলা হয়, অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের প্রস্তাব মোতাবেক রিট পিটিশন নং-৮৬/২০১৬ এর রায় বাস্তবায়নে এবং মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়ন ও টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে ওই রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিল প্রত্যাহারের জন্য প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় অনুমতি দিয়েছে। এতে সলিসিটর অফিস ওই আপিল প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেয়। অন্যদিকে ওই জাল রায়ের আলোকে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর গেজেটেড অফিসার ও নন-গেজেটেড কর্মচারীদের নিয়োগ বিধিমালা-১৯৮৫ পুনরায় সংশোধনের উদ্যোগ নেয় সরকার।

জানতে চাইলে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আলমগীর মুহম্মদ মনসুরুল আলম  বলেন, ওই রিটের বিষয়ে দুই ধরনের দুটি রায়ের কপি আমাদের হাতে এসেছে। আমরা বিষয়টি আমাদের আইনজীবীর মাধ্যমে কোর্টকে অবহিত করেছি। কোন রায়টি সঠিক সেটা জানতে চেয়েছি। তবে সর্বশেষ খবর আমার জানা নেই। তিনি আরও বলেন, ওই রায়ের ভিত্তিতে আমরা ‘প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের গেজেটেড অফিসার ও নন-গেজেটেড কর্মচারীদের নিয়োগ বিধিমালা-১৯৮৫’ পুনরায় সংশোধনের জন্য পিএসসিতে প্রস্তাব পাঠাই। আমার জানা মতে, প্রস্তাবটি চূড়ান্ত হয়ে গেছে। এখন কোর্ট থেকে যে সিদ্ধান্ত আসবে আমরা সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেব।