‘জরুরি সংশোধনবার্তা’ যাচ্ছে সব উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে

শিক্ষাবার্তা ডেস্কঃ  প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে ২০২৩ শিক্ষাবর্ষের জন্য বিতরণ করা বিনামূল্যের পাঠ্যবইয়ে বেশ কিছু ভুলত্রুটি ধরা পড়েছে। এগুলো সংশোধনে জরুরি ভিত্তিতে কাজ শুরু করেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। পাঠ্যবই এরই মধ্যে শিক্ষার্থীদের হাতে চলে যাওয়ায় ‘জরুরি সংশোধনবার্তা’ ই-মেইলে পাঠানো হবে সব উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের কাছে। তাঁরা নিজ নিজ আওতাধীন স্কুলগুলোতে এই সংশোধনী বার্তা পৌঁছে দেবেন, যেন শিক্ষকরা পাঠদানের সময় সঠিক তথ্য দিতে পারেন।

এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফরহাদুল ইসলাম বলেন, পাঠ্যবইয়ে কিছু ভুল আমাদের নজরে এসেছে। আমরা এ বিষয়ে ত্বরিত পদক্ষেপ নিয়েছি। ভুলগুলো যথাযথভাবে চিহ্নিত করে তা সংশোধন করে ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে। এ ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকেও জানানো হবে। তিনি আরও বলেন, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের মাধ্যমে তাঁদের অধীন স্কুলগুলোতে এই সংশোধনী দ্রুত পৌঁছানো যাবে। তাই আমরা সরাসরি ই-মেইলে তাঁদের সংশোধনী পাঠিয়ে দেব।

মাধ্যমিক স্তরের একাধিক শিক্ষক জানান, ২০২৩ শিক্ষাবর্ষের নবম-দশম শ্রেণির পাঠ্যবই ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’-এর ১৬ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ ক্যাম্প, পিলখানা ইপিআর ক্যাম্প ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় আক্রমণ চালায় ও নৃশংসভাবে গণহত্যা ঘটায়’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে দুটি তথ্যগত ভুল আছে- রাজারবাগ পুলিশ ক্যাম্প ও পিলখানা ইপিআর ক্যাম্প। প্রকৃতপক্ষে রাজারবাগে ছিল পুলিশ লাইন্স, আর পিলখানায় ছিল ইপিআর সদরদপ্তর। গত বছরের বইয়েও একই ভুল ছিল।

একই শ্রেণির ‘বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্বসভ্যতা’ বইয়ের ২০০ নম্বর পৃষ্ঠায় বলা আছে, ‘১২ই জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের নিকট প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।’ এই তথ্যটিও সঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে বঙ্গবন্ধুকে শপথ পড়িয়েছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। পরদিন অর্থাৎ ১৯৭২ সালের ১৩ জানুয়ারি ঢাকার সব দৈনিকের প্রথম পাতায় এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

একই বইয়ের ১৮১ পৃষ্ঠায় ‘অবরুদ্ধ বাংলাদেশ ও গণহত্যা’ অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে- ‘২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশজুড়ে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী নির্যাতন, গণহত্যা আর ধ্বংসলীলায় মেতে ওঠে।’ প্রকৃত তথ্য হলো, পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর নির্যাতন, গণহত্যা ও ধ্বংসলীলা শুরু হয় ২৫ মার্চ কালরাতে। এ ছাড়া এই বইয়ের তৃতীয় অধ্যায়ের (পৃষ্ঠা-২৫) শুরুর দিকে একাধিকবার ‘সময়কাল’ শব্দ উল্লেখ আছে। সময় ও কাল দুটি শব্দ, তবে একই অর্থ। তাই যে কোনো একটি ব্যবহূত হবে। একই পৃষ্ঠায় এক জায়গায় আছে ‘নদ-নদীগুলো’। ‘নদনদী’ শব্দটিই বহুবচন। আরেক জায়গায় ‘কোনো দেশের’ বদলে ‘কোন দেশের’ ছাপা হয়েছে। যতিচিহ্ন-কোলনের ব্যবহারও অনেক ক্ষেত্রে সঠিক হয়নি। কোনো কোনো বইয়ে ‘পরিপ্রেক্ষিত’ শব্দের বদলে একই অর্থে ‘প্রেক্ষিত’ ছাপা হয়েছে।

নবম-দশম শ্রেণির ‘পৌরনীতি ও নাগরিকতা’ বইয়ের প্রথম অধ্যায়ে (পৃষ্ঠা-১) ‘অংশগ্রহণের’ বদলে ‘অংশগ্রহনের’ ছাপা হয়েছে। ‘ছিল না’-র বদলে ছাপা হয়েছে ‘ছিলনা’। এই বইয়েও কোলনের ব্যবহার বেশিরভাগই ভুল। বিতরণ করা অধিকাংশ পাঠ্যবইয়েই হাইফেন, ড্যাশ ও কোলনের ভুল ব্যবহার দেখা গেছে। এ ছাড়া গত বছরের মতো বিভিন্ন বইয়ে একই ভুল এবারও ছাপা হয়েছে।

এনসিটিবির সদস্য (কারিকুলাম) অধ্যাপক মশিউজ্জামান বলেন, পাঠ্যবইয়ের ভুলগুলো চিহ্নিত করা হচ্ছে। ২০১৭, ২০২০ ও ২০২১ সালেও নানা ধরনের সংশোধন করা হয়েছে। এরপরও কীভাবে ভুল রয়ে গেছে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

পাঠ্যবইয়ের ভুল সংশোধনে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত কমিটিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, গত বছর বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও বিদ্যালয় শিক্ষকদের সমন্বয়ে কমিটি করে পাঠ্যবইয়ের ভুল সংশোধন করা হয়। তাদের মাধ্যমে পুরো বই মূল্যায়ন করে যেসব ভুল চিহ্নিত হয় তা সংশোধন আনা হয়। এরপরও কীভাবে এসব বইয়ে ভুল রয়ে গেল তা খতিয়ে দেখা হবে।

অধ্যাপক মশিউজ্জামান জানান, প্রতি বছর তাঁদের চেষ্টা থাকে নির্ভুল পাঠ্যবই তৈরি করা। যেসব ভুল ধরা পড়ছে তা সঙ্গে সঙ্গে ঠিক করা হচ্ছে। বইয়ের মধ্যে আরও কী ভুল রয়েছে তা দ্রুত বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে যাচাই করা হবে। যেসব ভুল চিহ্নিত হয়েছে ও আরও যেসব পাওয়া যাবে- সবগুলো সংশোধন করে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানো হবে। ক্লাসে সংশ্নিষ্ট অধ্যায় পড়ানোর সময় সঠিকটি সংশোধনী দেখে পড়াতে শিক্ষকদের নির্দেশনা দেওয়া হবে।

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/০১/০৮/২৩