জয়নাল হাজারী কলেজে দুর্নীতির বটবৃক্ষ সাবেক অধ্যক্ষ আবদুল হালিম

ফেনীঃ জেলার জয়নাল হাজারী কলেজে দুর্নীতির বটবৃক্ষ কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ আবদুল হালিম। বিভিন্ন কৌশলে তিনি কলেজের ফান্ড থেকে কয়েক কোটি টাকা সরিয়েছেন। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে অবসর নিলেও কলেজের হিসাবপত্র ও চেকে তিনি স্বাক্ষরসহ সব কাজ করতেন। জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সদস্য আবদুল হালিম জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি এক বছরের জন্য সাধারণ শিক্ষক হিসাবে অনুমোদন পান। কিন্তু ক্লাস না করেই তিনি মাসে ৫০ হাজার টাকা করে বেতন নেন। নবগঠিত কলেজ পরিচালনা কমিটি তার দুর্নীতির মুখোশ উন্মোচন করেছে। ফেনী সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান শুসেন চন্দ্র শীল কলেজ পরিচালনা কমিটির সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর হালিমের দুর্নীতির তথ্য বেরিয়ে আসছে। সাত উপকমিটি কাজ শুরু করেছে।

সাধারণ শিক্ষক হিসাবে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আবদুল হালিম নতুন পন্থা আবিষ্কার করেন। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি এমপির ডিও লেটার নিয়ে ৬ মাসের জন্য অ্যাডহক কমিটি গঠন করেন এবং কমিটির সভাপতি হন। এ কমিটির মেয়াদ আগস্টে শেষ হয়। অ্যাডহক কমিটির সভাপতি হওয়ার পর কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সহকারী অধ্যাপক হারুনুর রশিদকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়ে তাকে সরাতে তিনি উঠেপড়ে লাগেন। একপর্যায়ে তার অনুগত প্রভাষক শাহাদাত হোসেনকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেন। নিজের অনিয়ম ঢাকতে ও কলেজের টাকা লুটপাটের ধারা অব্যাহত রাখতে সাতজন সিনিয়র শিক্ষককে ডিঙিয়ে শাহাদাতকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ করা হয়। এসব বিষয় নিয়ে আবদুল হালিমের সঙ্গে সদর উপজেলা কর্মকর্তা ও কলেজের সাবেক সভাপতি আনোয়ার হোসাইন পাটোয়ারীর বিরোধ সৃষ্টি হয়। ফেনীর একটি প্রাইভেট কলেজের অধ্যক্ষ হিসাবে কর্মরত আবদুল হালিম।

কলেজের কর্মকর্তা ও কর্মচারী সূত্রে জানা যায়, স্থানীয় সংসদ-সদস্যকে (এমপি) খুশি রাখতে কলেজের টাকায় ক্যাম্পাসে বঙ্গবন্ধু কর্নার স্থাপনের পাঁচবারের সিদ্ধান্ত পাশ কাটিয়ে নিজাম উদ্দিন হাজারী এমপির মুর‌্যাল স্থাপন করা হয়। একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার পাঠক সংগঠন ‘বন্ধুসভা’র সভাপতি ও দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সদস্যের প্রভাব খাটিয়ে আবদুল হালিম নিজেই দুর্নীতির স্বর্গরাজ্য তৈরি করেছেন। জয়নাল হাজারী কলেজের ১৩৪ শতক জমির মধ্যে ৯৯ শতক জমি খাস খতিয়ানভুক্ত হওয়ার পর থলের বিড়াল বের হয়ে আসে। এর কারণ খুঁজতে গিয়ে দুর্নীতির মুখোশ উন্মোচন করেছে নবগঠিত কলেজ পরিচালনা কমিটি। পরিচালনা কমিটির সভাপতি হলেন ফেনী সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান শুসেন চন্দ্র শীল।

সদর উপজেলা চেয়ারম্যান শুসেন চন্দ্র শীল বলেন, সাবেক অধ্যক্ষ আবদুল হালিম কলেজে স্বৈরতন্ত্র চালিয়েছেন। তার ইচ্ছেতে চলত কলেজ। কলেজ পরিচালনায় তিনি কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করতেন না। শুসেন বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর দেড় মাসে কয়েকটি সভা করেছেন। সব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আনতে ইতোমধ্যে সাতটি উপকমিটি করা হয়েছে। অনিয়ম তদন্তে পরিচালনা পরিষদের সদস্য শহীদ খন্দকারকে প্রধান করে তিন সদস্যের অডিট কমিটি গঠন করেছেন। প্রয়োজনে অডিট ফার্ম দিয়ে অডিট করানো হবে।

১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত কলেজটিতে ১৯৯৭ সালে সোনাগাজীর বক্তারমুন্সি কলেজের প্রভাষক আবদুল হালিম অধ্যক্ষ হিসাবে যোগ দেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর কলেজের হিসাবরক্ষক ভূষণ দেবনাথ ও তিন প্রভাষককে তিনি কব্জায় নেন। কলেজের উন্নয়নের নামে ২৩ বছর শিক্ষার্থী ভর্তির সময় ৫০০ টাকা করে নেওয়া হয়েছে। হাজার হাজার শিক্ষার্থীর কাছ থেকে এ টাকা আদায় করা হলেও এসব টাকার কোনো হিসাব নেই। আয়-ব্যয়ের সব হিসাব পরিচালনা করতেন অধ্যক্ষ আবদুল হালিম। কলেজের দেড় কোটি টাকার এফডিআরের হদিস নেই। ২০১৯ সালে কলেজের প্রথম ভবন ‘ডিসি ইফতেখার ভবন’ ব্যবহারের অনুপযোগী দাবি করে ২ লাখ টাকা নিলামে বিক্রির উদ্যোগ নেন হালিম। তবে তাৎকালীন পরিচালনা কমিটির সদস্য শুকদেব নাথ তপন একই ভবন ৭ লাখ টাকায় বিক্রির উদ্যোগ নেন। তবে নগদ সুবিধা না পেয়ে হালিম ভবনটি বিক্রি বন্ধ করে দেন। বর্তমানে ভবনটিতে নিয়মিত ক্লাস চলছে। আবদুল হালিমের বিরুদ্ধে শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তার পছন্দের শিক্ষকদের নিয়োগ দিতে না পেরে তিনি তিন শিক্ষকের এমপিও এক বছর বন্ধ রাখেন। এছাড়া কলেজে অনার্স ও ডিগ্রি ক্লাস চালু থাকলেও নিজের চেয়ার রক্ষায় কলেজকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত করেননি তিনি। কলেজের শিক্ষকরা বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন পেলে তিনি আর অধ্যক্ষের দায়িত্বে থাকতে পারতেন না। তিনি কলেজটির বড় ক্ষতি করে গেছেন।

২০২০ সালে ফেনী জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান কলেজটিতে শহিদ মিনার স্থাপনে ৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেন। এ টাকা নিলেও আবদুল হালিম কলেজে শহিদ মিনার স্থাপন করেননি। সর্বশেষ ৪ জুলাই কলেজ ক্যাম্পাসের রাস্তা মেরামতের নামে দরপত্র ছাড়াই কোটেশন দেখিয়ে ৬ লাখ টাকা হালিম হাতিয়ে নিয়েছেন।

জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি এবং কলেজ পরিচালনা কমিটির সাবেক সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মোতালেব বলেন, আবদুল হালিম খুবই চতুর লোক এবং নিজের লাভ ভালো বোঝেন।

এমপি নিজাম হাজারীর মুর‌্যাল স্থাপন বিষয়ে আবদুল হালিম বলেন, নিজাম হাজারী স্থানীয় সংসদ-সদস্য হিসাবে কলেজ পরিচালনা কমিটির সভাপতি। সশরীরে তিনি থাকতে পারলে তার মুর‌্যাল প্রমাণ করবে-কলেজে তিনি আছেন।

কলেজের প্রধান হিসাবরক্ষক ভূষণ দেবনাথ বলেন, আমার কাছে কোনো টাকা-পয়সা, ব্যাংকের চেক বই, ক্যাশ বই, মিটিং বই কিছুই থাকত না। অফিসের চাবিসহ সবকিছু অধ্যক্ষ আবদুল হালিম স্যার নিয়ন্ত্রণ করতেন। তার কথা অনুসারে কলেজের বই বিক্রি করতে গিয়ে আমাকে ২০০৮ সালে জেলে যেতে হয়েছে। চাকরির ভয়ে সত্য প্রকাশ করতে পারিনি। ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ শাহাদাত হোসেন বলেন, আমাকে দায়িত্ব দেওয়ার সময় তিনি (হালিম) সাদা কাগজে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়েছেন। বিল-ভাউচারসহ কোনো কিছুই বুঝিয়ে দেননি। কলেজের কোটি কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে। নতুন পরিচালনা পরিষদ দায়িত্ব গ্রহণের পর আয়-ব্যয়ে স্বচ্ছতা আনতে কলেজের পাঁচটি ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে। অতীতে লুটপাটের সুবিধার্থে একটি হিসাবে সব টাকা লেনদেন করা হতো।

পরিচালনা কমিটির সভাপতি শুসেন চন্দ্র শীল বলেন, অনেক গন্ডগোল রয়েছে। সাবেক অধ্যক্ষ হালিম কলেজের অনেক ক্ষতি করে গেছেন। জেনেশুনে তিনি খাজনা না দিয়ে কলেজের ৯৯ শতক জমি খাস করিয়েছেন। নবগঠিত উপকমিটিগুলো কাজ শুরু করেছে।

অভিযুক্ত আবদুল হালিম মোবাইল ফোনে বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ মিথ্যা ও কাল্পনিক। আমার কাছে সব কাগজপত্র রয়েছে। তিনি আরও বলেন, হাতি খাদে পড়লে মাছিও লাথি দেয়।

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/১৩/০৯/২০২৩     

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়