জটিল হচ্ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ

নিউজ ডেস্ক।।

প্রায় প্রতিদিনই রেকর্ড ছাড়াচ্ছে ডেঙ্গু। চাপ বাড়ছে হাসপাতালগুলোতে। বিশেষ করে রাজধানীর সরকারি কোনো হাসপাতালে ডেঙ্গুর রোগীর জন্য বরাদ্দ শয্যা ফাঁকা নেই। তারপরও প্রতিদিন বহু রোগী আসছে। গতকাল ৮৫৭ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এক হাজার ৫১৬ জন। সেখানে মৃত্যু হয়েছে ১১ জনের এবং এখনও ভর্তি আছে ১৭৩ জন।

স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিডফোর্ড হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এক হাজার ৫৮৩ জন। মৃত্যু হয়েছে সাত জনের এবং চিকিৎসা নিচ্ছেন ১২৯ জন। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ভর্তি হয়েছে ৬৫২ জন। মৃত্যু হয়েছে ৯ শিশুর আর ভর্তি আছে ৮২ জন। সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়েছে ৭৪২ জন। সেখানে এখনও ভর্তি আছে ১১১ জন। রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে ৩২৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। সেখানে এখনও ৪২ ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন।

মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দুই হাজার ১৩৮ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। চিকিৎসা নিচ্ছেন ১১৫ জন। কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে এক হাজার ৭২ রোগী ভর্তি হয়েছে। মৃত্যু হয়েছে দুই জনের। আর এখনও ভর্তি আছে ১১০ জন। সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ৮৫৪ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। মৃত্যু একজনের হয়েছে। এখনও ভর্তি আছে ১২৬ জন। কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে ৪৬৬ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। সেখানে চিকিৎসা নিচ্ছে এখন ৩৯ জন।

এছাড়াও রাজধানীর অন্যান্য সরকারি বেসরকারি ও শায়ত্বশাসিত হাসপাতালে রোগী ভর্তি রয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব ড. মু আনোয়ার হোসেন হাওলাদার গতকাল এক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে বলেন, আমরা চাই না ২০১৯ সালের মতো গুরুতর পরিস্থিতি সৃষ্টি হোক। ঢাকা মেডিকেল, সোহরাওয়ার্দী ও বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোর কোনোটিতেই শয্যা খালি নেই। কিন্তু আমরা রোগীদের ফেরত পাঠাতে পারি না। যেভাবেই হোক চিকিৎসা দিচ্ছি। এখনই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে।

গত রোববার থেকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ও আজ থেকে উত্তর সিটি কর্পোরেশন ডেঙ্গুর উৎস নিধনে সপ্তাহব্যাপী অভিযান পরিচালনা করছে বলে জানিয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ড. ফজলে শামস কবির বলেন, গত রোববার থেকে ঢাকা দক্ষিণে অভিযান শুরু হয়েছে। সাত দিন চলবে। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জোবায়দুর রহমান বলেন, আমরা ১৮ অক্টোবর থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গু নিধনের বিশেষ অভিযান পরিচালনা করব।

এদিকে বাংলাদেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্ব ব্যাংক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব। আর্দ্রতা কমে আসার পাশাপাশি তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাত উভয়ই বাড়ছে। ফলে দেশের শহরাঞ্চলে দেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়তে পারে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ১৯৭৬ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে বাংলাদেশে গড় তাপমাত্রা বেড়েছে শূন্য দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ফলে ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে ঋতুভেদে আবহাওয়ার বৈচিত্র্য। এই রোগে প্রতি বছর যত সংখ্যক মানুষ আক্রান্ত হয় তার ২৫ শতাংশ হয় বর্ষাকালে। আর শীতকালে হয় ১৪ শতাংশ। এই তথ্য বলে দিচ্ছে, বর্ষার মাত্রা বাড়লে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ইতোমধ্যে দেশের অধিকাংশ জেলায় ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে। এ পর্যন্ত সেখানে ২৬ হাজার ৩৮ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে ১০টি জেলায় সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে— শুধু ঢাকা মহানগরে এ পর্যন্ত ১৮ হাজার ৯৭০ জন; ঢাকার বাইরে সাত হাজার ৬৮ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। শুধু কক্সবাজারে ১৪২৬ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। আর মৃত্যু হয়েছে ২১ জনের।

মাস হিসাবে আক্রান্ত ও মৃৃত্যুর তথ্যে দেখা যায়, জানুয়ারিতে আক্রান্ত হয়েছেন ১২৬ জন, ফেব্রুয়ারি ও মার্চে ২০ জন করে, এপ্রিলে ২৩ জন, মে মাসে ১৬৩ জন, জুনে ৭৩৭ জন, জুলাইয়ে এক হাজার ৫৭১ জন, আগস্টে তিন হাজার ৫২১ জন এবং সেপ্টেম্বরের ৯ হাজার ৯১১ জন এবং অক্টোবরের ১৭ দিনে ৯ হাজার ৯৪৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছে।

এদিকে চলতি বছরের প্রথম মৃত্যু হয়েছে জুন মাসে একজন, জুলাইয়ে ৯ জন, আগস্টে ১১ জন , সেপ্টেম্বরে ৩৪ জন এবং অক্টোবরের গত ১৭ দিনে ৪১ জনসহ এ পর্যন্ত ৯৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০০০ সালে বাংলাদেশে প্রথম ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দেয়। এর পর ২০১৮ সাল পর্যন্ত সরকারি হিসাবে ৫০ হাজার ১৪৮ জনের রোগটিতে আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকার বাইরের রোগী ছিল মাত্র ১৫৮ জন। ২০০০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ঢাকার বাইরে ডেঙ্গু আক্রান্তের কোনো তথ্য নেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে। ২০১৬ সালে সারা দেশে ছয় হাজার ৬০ জন ডেঙ্গু আক্রান্তের মধ্যে ৩৭ জন ছিলেন ঢাকার বাইরের। ২০১৭ সালে দুই হাজার ৭৬৯ জনের মধ্যে ঢাকার বাইরে ১১৬ জন এবং ২০১৮ সালে সারা দেশে ১০ হাজার ১৪৮ জনের মধ্যে পাঁচজন ডেঙ্গু রোগী ছিল ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলায়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবির বলেন, ‘আমরা মনে করি এডিস মশার হটস্পট নির্ধারণ করলে বা উৎসস্থল নষ্ট করা গেলেই ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা কমবে। বাসা বাড়ি, নির্মাণাধীন ভবনেও যাতে পানি জমে না থাকে এ নিয়েও নিজেদের কাজ করতে হবে। এ বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত যারা মারা যাচ্ছে, অধিকাংশই শেষ পর্যায়ে গিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। মোট মৃত্যুর ৪৮ জনই মারা গেছে ভর্তির তিন দিনের মধ্যে। এছাড়া তিন থেকে ছয় দিনের মধ্যে ১৮ জন, ছয় থেকে নয় দিনের মধ্যে ছয় জন এবং ৯ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে তিনজনের।

তিনি বলেন, চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ৪০ থেকে ৫০ বছর বয়সিদের। ঢাকা মহানগর ছাড়া সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি কক্সবাজারে। এবার পুরুষের চেয়ে নারী মৃত্যুর হার বেশি দেখা গেছে। আক্রান্তদের বেশির ভাগের বয়স ২০ বছর।’

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরীন বলেন, ‘কক্সবাজারে আমাদের টিম ডেঙ্গু নিয়ে কাজ করেছে। সেখানে ডেঙ্গু সেল ডেন-৩ এর সাথে ডেন-১ এর উপস্থিতি দেখা গেছে। যদি কয়েকটি সেল টাইপ একসাথে থাকে, তাহলে সে ক্ষেত্রে ইনফেকশনের চান্স বেশি থাকে, সিভিয়ার ডেঙ্গুর আশঙ্কাও থেকে যায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘২০১৩ সাল থেকে আইইডিসিআর ডেঙ্গুর সেল পর্যবেক্ষণ করছে। এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুর চারটি ধরন পাওয়া গেছে। ২০১৭ সাল পর্যন্ত আমাদের সার্কুলেশনে ডেন-১ ও ডেন-২ ছিল। ২০২১ সাল থেকে দেখছি ডেন-৩ এর প্রকোপ। ২০২১ সালে এটি শতভাগ ছিল। কিন্তু ২০২২ সালে এসে দেখছি যে, ডেন-৪ এর উপস্থিতি এখন পর্যন্ত ১০ শতাংশ।’

আইইডিসিআর পরিচালক বলেন, ‘২০১৮ সালের পর ডেন-১ এর সেল উপস্থিতি আমাদের স্যাম্পল কালেকশনে পাইনি। কিন্তু এখন সেটা আমরা কক্সবাজারে পাচ্ছি, যদিও ঢাকায় পাচ্ছি না। কক্সবাজারে ডেন-১, ডেন-৩ ও ডেন-৪ এক সাথে অ্যাকটিভ। বাংলাদেশ তো ছোট রাষ্ট্র। আজ ঢাকা, কাল কক্সবাজার। এভাবে মানুষের মুভমেন্ট হচ্ছে। এভাবে সব সেলের ডেঙ্গু ছড়াতেই পারে।

দেশের সর্বশেষ অবস্থা : এদিকে গতকাল সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের নিয়মিত ডেঙ্গুবিষয়ক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ৮৫৭ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ঢাকায় ৫২৩ জন এবং ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলায় ৩৩৪ জন চিকিৎসাধীন আছেন। অধিদপ্তরের তথ্য ইউনিটের (এমআইএস) ইনচার্জ ডা. মো. জাহিদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে তিন হাজার চার জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাদের মধ্যে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে দুই হাজার ১৫ জন এবং ঢাকার বাইরে অন্যান্য বিভাগে ৯৮৯ জন।