ছিনতাই-খুন বেড়েই চলেছে রাজধানীতে

নিজস্ব প্রতিবেদক।।

রাজধানীতে বেড়েছে ছিনতাই ও খুনের ঘটনা। দিনে প্রকাশ্যে ছিনতাই হচ্ছে বিভিন্ন এলাকায়। রাজধানীর আসাদ গেট এলাকায় ছিনতাইকারীদের ছুরি হাতে তেড়ে আসার ছবি ও ভিডিও প্রকাশের পর অনেকের মনে ভয় জাগিয়েছে। গতকাল ধানমণ্ডি লেকের পাড় থেকে মেরিন ইঞ্জিনিয়ারের লাশ উদ্ধারের পর পুলিশ জানিয়েছে ছিনতাইকারীর হাতেই তার মৃত্যু হয়েছে।

গত ২১শে জুলাই রাজধানীর কাওরান বাজারে একটি যাত্রীবাহী বাস থেকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী পারিসা আক্তারের মোবাইল ফোন ছিনতাই হয়। ঘটনার ১১ দিন পর মোবাইলটি উদ্ধার করে ডিএমপি’র তেজগাঁও থানা-পুলিশ। এ সময় ছিনতাইকারীকেও আটক করা হয়। শিক্ষার্থী পারিসা আক্তার সদরঘাটগামী তানজিল পরিবহনের একটি বাসে করে পুরান ঢাকায় যাচ্ছিলেন। এ সময় কাওরান বাজারের জ্যামে হঠাৎ জানালা দিয়ে তার মোবাইলটি নিয়ে যায় ছিনতাইকারী। সঙ্গে সঙ্গে তিনি বাস থেকে নেমে ধাওয়া করেন ছিনতাইকারীকে। কিন্তু ততক্ষণে ছিনতাইকারী পালিয়ে যায়।

ঠিক একই সময় এ তরুণীর চোখে পড়ে আরেকটি ছিনতাইয়ের দৃশ্য। এক নারীর ব্যাগ ছিনতাই করে পালাচ্ছিল অপর এক ছিনতাইকারী। তখনই ছিনতাইকারীকে ধরে ফেলেন তিনি।
চলতি বছরের ২৭শে মার্চ ভোরে ছিনতাইকারির ছুরিকাঘাতে দন্ত চিকিৎসক আহমেদ মাহী বুলবুল প্রাণ হারান। ঘটনাটি সারা দেশে ব্যাপক দাগ কাটে। নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। এ ঘটনায় পরবর্তীতে ছিনতাইকারী চক্রের সকল সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। রাজধানীর মিরপুর বাউনিয়া বাঁধ ট্রাকস্ট্যান্ড এলাকায় ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে রায়হান নামে এক পোশাককর্মী নিহত হন। মোশারফ হোসেন নামে এক ব্যবসায়ী রাজধানীর শ্যামবাজারে মালামাল কিনতে সায়েদাবাদ ফ্লাইওভারের ঢাল থেকে দয়াগঞ্জের দিকে যাওয়ার সময় সড়কে ছিনতাইকারীর খপ্পরে পড়েন তিনি। তাকে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়।

শুধুমাত্র ফেব্রুয়ারি এবং মার্চ মাসেই ছিনতাইকারীর কবলে পরে খুন হয়েছেন ৮ জন। আহত অর্ধশতাধিকেরও বেশি। মাসিক অপরাধ সভাগুলোতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) এর তত্ত্বাবধানে ২৪ আওয়ার্স রাউন্ড দ্য ক্লোক পেট্রোলিংসহ নানা নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বিশেষ নির্দেশনা দিচ্ছে পুলিশ সদও দপ্তর। রাজধানীতে গত ১৩ই জুলাই থেকে গত ১৪ই আগস্ট পর্যন্ত ৩০ দিনে ছিনতাইকারীর হাতে প্রাণ হারিয়েছেন ৪ জন। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে রাজধানীতে ছিনতাইয়ের মামলা হয়েছে ১০টি। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মামলার তথ্যসূত্র বলছে, গত বছরের শেষ ৬ মাসের তুলনায় চলতি বছরের জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি, মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি বেশি হয়েছে।

ডিএমপি’র সূত্র বলছে, রাজধানীতে প্রতি মাসে ৩০টিরও বেশি বড় ধরনের ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। সেই হিসেবে মহানগরীতে চলতি বছরের জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি, মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে ডাকাতি, দস্যুতা, খুন, দাঙ্গা, নারী নির্যাতন, অপহরণ, চুরি ও ছিনতাইসহ অন্যান্য কারণে গত ৫ মাসে মোট ৭০৫টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় মোট গ্রেপ্তার আসামি ২৩ হাজার ৭৩২ জন। জানুয়ারিতে আসামির সংখ্যা ৪ হাজার ৮৩৪, ফেব্রুয়ারিতে ৪ হাজার ৩৫৯, মার্চে ৫ হাজার ২২৯, এপ্রিলে ৪ হাজার ২২৭ ও মে মাসে ৫ হাজার ৮৩ জন। গত বছরের প্রথম পাঁচ মাসে মোট ৬২৭টি মামলা হয়েছে। পাশাপাশি চলতি বছর ডিএমপি’র ৫০টি থানায় জানুয়ারিতে চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মামলা হয়েছে ১১৭টি। এ ছাড়া ফেব্রুয়ারিতে ১৪০, মার্চে ১৫৪, এপ্রিলে ১৫৯ ও মে মাসে ১৩৫টি। যা গত বছরের প্রথম ৫ মাসের চেয়ে ৭৮টি বেশি। র‌্যাব সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্টের ১৩ তারিখ পর্যন্ত ৮ মাসে র‌্যাব ১ হাজার ৬৭৮ জন ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। সেই হিসেবে চলতি বছর প্রতিমাসে গড়ে ২১০ জন ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এ বিষয়ে ডিএমপি কমিশনার মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, রাজধানীসহ আশেপাশের এলাকায় ছিনতাই বন্ধে ডিএমপি পুলিশ প্রতিনিয়তই কাজ করছে। ছিনতাইয়ের ঘটনা নিয়ন্ত্রণে ইতিমধ্যে রাজধানীর সকল থানার অধীনে পর্যাপ্ত সংখ্যক সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিটি মাসিক সভায় ছিনতাই বন্ধে পুলিশের বিশেষ পেট্রোলিং বৃদ্ধি, ২৪ ঘণ্টা সাইবার মনিটরিংসহ বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও আরও বেশি সচেতন হতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিশেষজ্ঞ তৌহিদুল হক বলেন, কর্মসংস্থানের অভাবসহ আরও বিভিন্ন কারণে রাজধানীতে হঠাৎ করেই ছিনতাই, খুনসহ অন্যান্য অপরাধ বেড়েছে। পরিবারের প্রিয় মানুষটিকে হারানোর পাশাপাশি নিঃস্ব হচ্ছেন তারা। ছিনতাই এবং ছিনতাই করতে গিয়ে খুনের ঘটনা একটি সমাজে কখন ঘটে এটার উৎসমূল আগে খুঁজে বের করতে হবে। সামাজিক অস্থিরতা, কর্মহীন, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিসহ নানা কারণে এসব অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে। এক্ষেত্রে এ ধরনের অপরাধ কমাতে হলে অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি তাদের পুনর্বাসন করতে হবে। সঠিক কর্মসংস্থান, কাউন্সিলিংসহ বিভিন্ন পদক্ষেপই পারে এ ধরনের অপরাধ কমিয়ে আনতে।