ছাত্র-শিক্ষক-শিক্ষাঙ্গন : অতীত ও বর্তমান

বিলাল হোসেন মাহিনী।।

শুধু চোখে দেখলে বা শুনতে পারলে হলো যে, শিক্ষক আসছেন। সাথে সাথে সাইকেল বা গাড়ি থেকে নেমে পড়তাম। শুধু তাই নয়, এখনো সেই ছোট্ট বেলার প্রাইমারি স্কুলের কোনো শিক্ষককে দেখলেও মনের অজান্তেই সাইকেল বা গাড়ী থেকে নেমে পড়ি।

এক ধরনের শ্রদ্ধা মিশ্রিত ভয় কাজ করতো শিক্ষকদের দেখলে; আজও মনে পড়লে গা শিউরে ওঠে। এখন তার সম্পূর্ণ বিপরীত। আদর্শ, শ্রদ্ধা-সম্মানের লেশমাত্র নেই। একজন ছাত্র তখনই মানুষ হবে; যখন ধর্মীয়, নৈতিক ও পারিবারিক সঠিক শিক্ষার সমন্নয় হবে। কেননা, শিক্ষার্থী শিক্ষালয়ে থাকে ৪-৫ ঘন্টা। বেশি সময় তারা বাড়িতে ও বাইরেই থাকে। তাই পারিবারিক শিক্ষাকে অধিকতর গুরুত্ব দিতে হবে।

একবার সম্ভবত দশম শ্রেণিতে পড়া না হওয়ায় একজন শিক্ষক আমার দু’হাতে বেতের আঘাতে করেছিলেন। ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হয়েছিলো। কিন্তু, ঘটনাটি বাড়িতে এসে কাউকে বলার সাহস হয়নি।
জানতাম, শিক্ষক মেরেছেন একথা বাড়ির কেউ (আব্বা-আম্মা) জানলে পিঠের চামড়া থাকবে না। আব্বা মাদরাসায় গিয়ে আমার শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে বলতেন, ‘স্যার গোশত আপনার, হাড্ডি আমার’।
হ্যাঁ, তখন ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক ছিলো শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার। ছাত্ররা যেমনি শিক্ষককে শ্রদ্ধা করতেন, তেমনি শিক্ষকগণও আমাদের স্নেহ করতেন।

এখনতো শিক্ষকগণ ছাত্রের বাসায় যান না, আমাদের সময় শিক্ষকগণ প্রায় প্রতি মাসে বাড়িতে আসতেন। খোঁজ খবর নিতেন। আমরাও প্রাইমারি ও হাইস্কুল লাইফে অনেক শিক্ষকের বাড়িতে গেছি। একসাথে খেয়েছি, খেলেছি।
শিক্ষককের নানা কাজ করে দিয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলতাম। শিক্ষকগণও সাধ্যমতো আমাদের সহায়তা করতেন, খাতা-কলম কিনে দিতেম গোপনে। শুধু তাই নয়, শিক্ষকগণ আমাদের জন্য প্রাণভরে দোয়া করতেন।

প্রাইমারিতে বয়াতি বক্কার, আবু বক্কার, রাহিলা ম্যাম, নিরিপন স্যার এবং দাখিলে (মাধ্যমিক) আলহাজ্ব সিরাজ স্যার, মরহুম আলী স্যার, ইলিয়াস স্যার, মাও. কাবিল, মাও. আমজাদ হুজুরসহ প্রায় সবাই আমাকে বাজান, আব্বা, বাপ বলে ডাকতেন। তাঁরা লেখাপড়ার জন্য যতোটা না শাসন করতেন, তারচেয়ে বেশি শাসন করতেন অভদ্রতা ও উচ্ছৃঙ্খল আচরনে।

শিক্ষকগণ ক্লাসে এসেই ‘ চুল লম্বা কেনো? নখ লম্বা কেনো, শার্টের হাতা গোছানো কেনো? বোতাম খোলা কেনো? বাইরে অভদ্রের মতো চলাফেরা করো কেন? ইত্যাদি নিয়ে কড়া শাসন করতেন। শিক্ষকদের নিজের পকেট থেকে চুল কাটতে টাকা দিতেও দেখেছি।
তবে আমর জীবনে আমি মাত্র ২৫ বছর বয়সে যশোরের অভয়নগর উপজেলার আকিজ আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজে জয়েন করি। সেখানে আমার এবং আমার স্কুলের সর্বোচ্চ ক্লাসের ছাত্রের বয়সের পার্থক্য ছিলো ৯-১০ বছরের। এই তো, ২০১২-১৩ সালের কথা। তখন আমার ছাত্রদের মধ্যে সম্মানবোধ দেখেছি, পেয়েছি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। আমরা একসাথে খেলেছি, খেয়েছি। আবাসিকে ছাত্রদের সাথে ঘুমিয়েছি। আর এখনতো স্কুল লাইফেই ছাত্ররা বেপরোয়া হয়ে যাচ্ছে, আর কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে হলে তো কথাই নেই। রাজনীতি’র নোংরা খপ্পরে পড়ে নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে এক ছাত্র অপর ছাত্রভাইকে অমানুষিক নিরযাতন করছে, খুনও করছে। শুধু ছাত্রভাই-ই নয় ছাত্রের হাতে শিক্ষক খুন হচ্ছে। জাতি হিসেবে এর চেয়ে লজ্জার আর কী হতে পারে?

প্রভাষক হিসেবে গাজীপুর রউফিয়া কামিল মাদরাসায় জয়েন করার পর হাজারো স্মৃতিমাখা আমার মরিচা মাদরাসায় গিছিলাম। সুপারসহ সকলেই বললেন -“বাপ, তোমাদের কয়েকজন ছাত্রের জন্য গর্বে বুক ভরে যায়। তোমাদের সুনামে অন্যরকম আনন্দ পাই।”
তখন বলেছিলাম- “স্যার, গর্বের মতো তেমন কিছু করতে বা হতে পারিনি। তবে আপনাদের শেখানো মানবিকতা ও ভদ্রতার যে শিক্ষা পেয়েছি, সেই শিক্ষাই আমাকে পৌঁছে নিয়ে আসছে এ পর্যন্ত। মনবিক মূল্যবোধ আর সততার যে শিক্ষাটুকু পেয়েছি তা আপনাদের শাসনের জন্যে।” পৃথিবীতে বাবা-মা’র পরে একমাত্র শিক্ষকই মানুষের কল্যান কামনা করেন নিঃশর্তভাবে। শিক্ষকদের শাসন আমাদের মানুষ হতে শিখিয়েছে। আর এখন তার উল্টো!
তবে সেদিন আলহাজ্ব সিরাজ স্যার বলেছিলেন, তুমি আমাদের গর্ব, তোমার একাধিক গ্রন্থ প্রকাশ পেয়েছে। তুমি একাধারে লেখক, সম্পাদক, শিক্ষক, সুসাহিত্যিক, গবেষক, সাংবাদিক, কবি-খতিব ও সাংস্কৃতিক সংগঠক।
এমন একটি ছেলে আজও আমাদের প্রতিষ্ঠান থেকে বের হয়নি।

আমারতো মনে হয়, পিতামাতা ও শিক্ষক-গুরুজনের দোয়ার বরকতে এবং সর্বপরি আল্লাহর অশেষ মেহেরবানিতে একজন সামান্য শ্রমিকের (আমার কাছে সমান্য নয়) ছেলে হিসেবে আজকে আমার এই অবস্থান। (আলহামদুলিল্লাহ) হতদরিদ্র একজন জুটমিল শ্রমিকের সন্তান হিসেব আমি গর্বিত। এখনকার শিক্ষার্থীরা বাবার কর্ম বা পেশা নিম্ন শ্রেণির হলে (যদিও কোনো কর্মই নিন্ম বা ছোট নয়) তা প্রকাশ করতে চায় না।

বর্তমান সংকটের কারণ ও প্রতিকার :

হ্যাঁ, এটাও ঠিক, আগে শিক্ষক নিয়োগে মোটা অঙ্কের বাণিজ্য হতো, ঘুষ দিয়ে শিক্ষক হতো অনেকে। যারা অনৈতিকভাবে শিক্ষক হতো, তাদের কাছ থেকে নৈতিকতা আশা করা যায় কি?
যদিও এখন পিএসসি’র আদলে প্রিলি, রিটেন ও ভাইভার মাধ্যমে জাতীয়ভাবে শিক্ষক নিয়োগ হয়। তাই সমস্যাটা নিয়োগ সংক্রান্ত নয় বলে মনে হয়। বরং সঙ্গ সমস্যা (ছাত্র কার সাথে, কোন বড় ভাই/নেতার আন্ডারে লালিত পালিত হচ্ছে এবং মোবাইলকে কতটা সঙ্গ দিচ্ছে তার ওপর নির্ভর করছে বলে মনে হয়)।

তবে শিক্ষকরাও (দু-একজন বাদে) আগের মতো নেই। তাদেরও অনেক নৈতিক অবক্ষয় ঘটেছে অনেক ক্ষেত্রে। কোচিং বানিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার, লোভ-লালসা, অনেক কিছুই তাদের উপর জেঁকে বসেছে। তাই ছাত্র-অভিভাবকদের পাশাপাশি শিক্ষকদেরও অনেক বিষয়ে নিজেদের শোধরাতে হবে। আমাদের সময় স্যাররা প্রাইভেট পড়াতেন ঠিকই, কিন্তু নামমাত্র সম্মানীতে। কতো মাস যে টাকা না দিয়ে পড়েছি তার ইয়াত্তা নেই। তবে এটাও ঠিক, শিক্ষকগণ প্রকৃত প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত। শিক্ষা নিয়ে নীতি বাক্য কম শুনি না। শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড.. এই সেই ইত্যাদি। কিন্তু আমরা কি জানি একজন মাস্টার্স পাশ শিক্ষকের সম্মানী কতো? শুনলে অবাক হবেন, মাত্র ১২হাজার টাকা মাসিক অনুদান (বেতন) ও মাত্র ২৫% উৎসব ভাতা। মানে সিকি বোনাস! যা দিয়ে সাতভাগের কুরবানিতেও ভাগী হওয়া যায় না। আহারে- শিক্ষক সমাজ!!

মূলতঃ যেসব কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজের কিশোর-যুবদের মাঝে এই অস্থিরতা, তা হলো-

ক. ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার অভাব।
খ. জবাবদিহিতার অভাব।
গ. মূল্যবোধের অভাব।
ঘ. পরিবারে সভ্যতা ও শৃঙ্খলার অভাব।
ঙ. সামাজিক অসুস্থতা, রাজনৈতিক সাপোর্ট ও অবাধ আকাশসংস্কৃতি এবং প্রযুক্তির অপব্যবহার এর জন্য অনেকাংশে দায়ী বলে মনে করেন শিক্ষা ও সমাজ বিশ্লেষকগণ।

একটু ভিন্ন প্রসঙ্গ :
গত কয়েক বছরে শিক্ষাঙ্গনে যা ঘটছে সেই হিসেবে- দেশের কোনো মাদরাসায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে এমন ঘটনা খুঁজে পাওয়া ভার!
কেনো জানেন, তারা ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষাকে প্রাকটিস করে, শুধু বইতে পড়া আর খাতায় লেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।
সর্বপরি, মৃত্যু পরবর্তী জীবনে দুনিয়ায় জীবনের প্রতিটি কর্মের হিসেব দিতে হবে, এই ভীতি তাদের অন্যায় করতে বাধা দেয়।
কওমি / আলিয়া মাদরাসার শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভয়ংকর কী কী অনৈতিক কর্মকান্ড দেখেছেন জানি না, থাকতে পারেও কিছু বিছিন্ন ঘটনা। তবে তা উদাহরণ দেওয়ার মতো নয়, যেমনটি স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীদের মাঝে দেখা যায়।

আমি চ্যালেন্জ দিয়ে বলছি, দেশের বৃহৎ হাটহাজারী মাদরাসাসহ কোনো মাদরাসায় ছাত্র কর্তৃক শিক্ষক লাঞ্ছিত হয়েছে বা ছাত্রের হাতে শিক্ষক নিহত হয়েছে, এমন কোনো নজির খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।

আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়, আরবি বিশ্ববিদ্যালয়সহ কোনো মাদরাসা বা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রের হাতে ছাত্র খুন হইছে কি?

তবে এটাও ঠিক, মাদরাসার সব ছাত্র-শিক্ষক ফেরেস্তা নয়। মানুষ হিসেবে ভুল ত্রুটির উর্ধ্বে কেউ নন। মূল সংকটটা আসলে আদর্শিক। যেদিন থেকে শিক্ষাগুরুর মর্যাদা পাঠ্যবই থেকে উবে গেছে, যেদিন থেকে অভিভাবকগণ তাদের সন্তান তথা ছাত্রের পক্ষে সাফাই গাওয়া শুরু করেছে, সর্বপরি- শিক্ষকের হাত থেকে যেদিন বেত কেড়ে নেয়া হয়েছে ; মূলত : সেদিন থেকে শিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতা বাড়তে শুরু করেছে বলে মনে করেন সচেতন নাগরিকগণ। অভিভাবক ও ছাত্রদের মনে রাখতে হবে, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-ব্যাংকার-আমলা বা উচ্চ পদস্থ চাকুরে হওয়ার আগে শিক্ষার্থীকে মানুষ হতে হবে, হতে হবে মানবিক।

লেখক : পরীক্ষক, ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা