ঘটনাচক্রে শিক্ষক বলেই কি এত অবমাননা?

প্রকাশিত: ১০:৩৭ পূর্বাহ্ণ, সোম, ২০ সেপ্টেম্বর ২১
ফিরোজ আলম।।
শিক্ষক মানে জাতির আলোকবর্তিকাবাহী , সভ্য মানব  গড়ার স্বীকৃত কারিগর, বন্ধু, দার্শনিক , পথপ্রদর্শক,দর্শন তত্ত্বের একজন মস্ত বড় পন্ডিত।
গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল তাই বলেছেন, “যাঁরা শিশুদের শিক্ষাদানে ব্রতী তাঁরা অবিভাবকদের থেকেও অধিক সম্মানীয়।সেকারনে জীবনে বিশ্বাস করতাম,করেছি   পিতামাতা আমাদের জীবনদান করেন ঠিকই। শিক্ষকরা সেই জীবনকে সুন্দর ভাবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে নিরলসভাবে।তাই মনে প্রাণে ধারন করতাম,আজ ও করি A great teacher is like a candle it consumes itself to light the way for others.The teacher is a maker of man.
 গত ১৭ ই সেপ্টেম্বর ২০২১ রোজ শুক্রবার মহান শিক্ষা দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের শিক্ষা ও মানবসম্পদ বিষয়ক উপকমিটি আয়োজিত ‘শিক্ষা: ২০৪১ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের বাস্তবিক কৌশল’ শীর্ষক এক সেমিনারে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেছেন ‘আমাদের শিক্ষকদের মধ্যে একটা বড় অংশ ঘটনাচক্রে শিক্ষক। অন্য কোনো পেশায় অনেকেই যেতে পারেননি, শিক্ষকতা কোনোদিন তারা চাননি। আমাদের প্রশিক্ষিত শিক্ষক প্রয়োজন’। ‘যিনি শিক্ষকতা পেশায় আসবেন তিনি তার জীবনের লক্ষ্যই হবে শিক্ষকতা পেশা।  তিনি সেই লক্ষ্য নির্ধারণ করে আসবেন।’
মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য বিশ্লেষনে বলতে চাই।
ঘটনাচক্রে কথাটিকে ইংরেজীতে সোজাসুজি ভাষায় বলে  accidentally।মানে হল শিক্ষক না হতে চেয়ে ও অনিচ্ছা সত্বেও শিক্ষক হয়ে যাওয়া।ফলে শিক্ষক হওয়ার বাসনা না থাকায় তারা প্রশিক্ষিত  শিক্ষক নন।তাই আমাদের প্রশিক্ষিত শিক্ষক দরকার।মানে এমন শিক্ষক দরকার  যিনি নির্দিষ্ট বিষয়ে প্রশিক্ষনের মাধ্যমে দক্ষ হয়ে শিক্ষা দান করবেন।
মন্ত্রীর কথার সাথে কিছুটা একমত এবং কিছুটা দ্বিমত পোষন করি।একমত পোষনের কারন হল একথা সত্যি এদেশের শিক্ষিত যুবকদের দুই তৃতীয়াংশ শিক্ষক হওয়ার আগে  লেখাপড়া শেষে বেশি বেতনের আশায় ,বেশি ক্ষমতার নেশায় ,পেশি শক্তি টানে এবং সমাজে সবার নিকট দামী বলে বিবেচিত পেশার প্রতি আগ্রহ দেখান এবং প্রচুর সময় ব্যয় করেন।সফল না হলে শিক্ষকতা করেন।এখন প্রশ্ন হল  কেন শিক্ষিতদের একটি বড় অংশ  ঘটনাচক্রে শিক্ষকতায় আসেন।কারন হল ক•বাজেটে শিক্ষাখাতে বাজেট কম থাকা।যেমন 2021-2022 সালে মোট বাজেট   ৬ লাখ তিন হাজার ছয় শত একাশি (৬০৩৬৮১) কোটি টাকা, তার মধ্যে শিক্ষা ক্ষেত্রে একাত্তর হাজার নয় শত পঞ্চান্ন কোটি টাকা (৭১৯৫৫) টাকা যা মোট বাজেটের ১১.৯১  শতাংশ।
খ•এশিয়ার দেশ গুলোর তুলনায় এদেশে শিক্ষা বরাদ্দ নগন্য হওয়া।যেমন ইউনেস্কো গঠিত ‘একবিংশ শতাব্দীর জন্য আন্তর্জাতিক শিক্ষা কমিশন ’দেলরস’ এর  প্রতিবেদনে বলা হয় উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রাপ্ত বৈদেশিক সহায়তার ২৫ শতাংশ শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ করা উচিৎ। অথচ সার্কভুক্ত অঞ্চলে  বর্তমানে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে মাথাপিছু বার্ষিক বিনিয়োগের পরিমাণ বাংলাদেশে ৫ ডলার, শ্রীলংকায় ১০ ডলার, ভারতে ১৪ ডলার, মালয়েশিয়ায় ১৫০ ডলার এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় ১৬০ ডলার।
গ•শিক্ষিত বেকারত্ব নিরসনে সরকারের যথাযথ উদ্যোগ না থাকা।যেমন বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৪ লাখ।কয়েক বছর আগে ইকোনমিক ইনটেলিজেন্স ইউনিটের জরিপে বলা হয়েছিল বিশ্বে বাংলাদেশেই শিক্ষিত বেকারের হার সর্বোচ্চ।
প্রতিবেদন বলছে, দেশে প্রাথমিক পাস করা বেকার যুবকের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৪ লাখ, মাধ্যমিক পাস করা যুবকের সংখ্যা ৯ লাখের বেশি, উচ্চমাধ্যমিক পাস করা বেকার যুবকের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৬ লাখ আর স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাস করা বেকার যুবকের সংখ্যা ৪ লাখ ১০ হাজারের বেশি।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা ৩ কোটি।  যা মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশ ।
সরকারি উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএসের গবেষণায় দেশে মাধ্যমিক থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী তরুণদের এক-তৃতীয়াংশ পুরোপুরি বেকার বলে জানা যায়। এটি  আমাদের নি:সন্দেহে  উদ্বিগ্ন করে।এই গবেষণায় দেখা যায়, শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে সম্পূর্ণ বেকার ৩৩ দশমিক ৩২ শতাংশ। বাকিদের মধ্যে ৪৭ দশমিক ৭ শতাংশ।
ঘ•শিক্ষকতা পেশা মূল্যায়নে সরকারের ব্যর্থতা। যেমন পৃথিবীর সকল দেশে  যখন  শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ছাত্র–শিক্ষক সবাইকেই নানা সূচকে র‍্যাঙ্ক করছে।সেখানে সার্কভুক্ত দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম বরাদ্দ পাওয়া আমাদের এবারের  শিক্ষা বাজেট জাতীয় বাজেটে সামগ্রিক শিক্ষা খাতে বরাদ্দ মাত্র ০.৯২ শতাংশ এবং উচ্চশিক্ষা উপখাতে বরাদ্দ মাত্র ০.১২ শতাংশ।তদুপরি   শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য কোনো র‍্যাঙ্কিং তো নাই ই।উচ্চ শিক্ষাক্ষেত্রে বর্তমান জাতীয় বরাদ্দ ক্রমান্বয়ে ২০২২ সালের মধ্যে ২ শতাংশে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ৬ শতাংশে উন্নীত করা না গেলে   টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) ২০৩০ যে ব্যর্থ  হয়ে যাবে তা সরকার মনেই রাখছে না।
ফলে  শিক্ষায়ও পুরস্কার, প্রণোদনা গুরুত্বপূর্ণ এবং শিক্ষা  বাজেটে অধিক বরাদ্দ দেওয়া যে সময়ের দাবি তাও শাসক মহল বুঝেনা।ফলে শিক্ষকদের  এবং শিক্ষায় মেধাবীদের প্রতি অবহেলায় শিক্ষার মান নিয়ে উচ্চকণ্ঠে আজ গর্ব করে আমাদের বলার মত কিছুই হচ্ছেনা।আমেরিকায় সারা পৃথিবীর ৫ শতাংশ মানুষের বাস অথচ শ্রেষ্ঠ ১০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০টিই তাদের। রাশিয়ার  সারা পৃথিবীর প্রায় ২ শতাংশ মানুষের বাস অথচ শ্রেষ্ঠ ৩০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৭টিই তাদের।অথচ বাংলাদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয় সেরা ৮০০ বিশ্ববিদ্যালয় তালিকায় জায়গাই পায়নি।এর পরে গিয়ে ৪ টি স্থান পেয়েছে। তার মানে কি বোঝা গেল আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা পরিচালনাকারীরা ব্যর্থ।
ঙ•আমলাদের শিক্ষকতা বিরোধী দাম্ভিকতা।
সরকারি বেসরকারি শিক্ষকরা নানা দিক থেকে বঞ্চিত।এমপিওভুক্ত শিক্ষকেরা একটু বেশি বঞ্চিত। যেমন বিবেকহীন কেউ কেউ  মনে করেন এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের শতভাগ উৎসব ভাতা দিলে  অর্থের অপচয় হবে । কিন্তু তারা দেখে না  বাংলাদেশ ব্যাংক কেলেংকারি,শেয়ার বাজার কেলেংকারি, ডেসটিনি কেলেংকারি,  হলমার্ক কেলেংকারি,রেল কেলেংকারি সহ নানা কেলেংকারির লোকসান।তারা বুঝেনা দেশের মঙ্গলের জন্য  বিমানের হাজার কোটি টাকা লোকসান প্রকৃত পক্ষে লোকসান না। পদ্মা সেতুর বিলম্ব লোকসান প্রকৃত পক্ষে দেশের জন্য আত্ম মর্যাদার।
কে বোঝাবে তাদের শিক্ষায় প্রনোদনা,পুরস্কার,জাতীয়করনের জন্য ভুর্তকি  দেখতে লোকসান মনে হলে ও প্রকৃত পক্ষে দীর্ঘ মেয়াদি ফলাফল অর্জনে এটির দেশের জন্য কল্যানকর।
মাননীয় শিক্ষা মন্ত্রী বলেছেন আমরা প্রশিক্ষিত শিক্ষক চাই।আমি ও তাই মনে করি।কারন প্রশিক্ষিত শিক্ষক ছাড়া চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।একই সাথে আমাদের প্রশিক্ষিত মন্ত্রী চাই।যারা দক্ষতা দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করবে।স্বাধীনতার পর থেকেই এদেশের মন্ত্রীদের একটি বড় অংশই প্রশিক্ষিত ছিলনা।ফলে খন্দকার মোশতাকের মত মন্ত্রী আমরা দেখেছি।লুৎফুজ্জামান বাবরের মত উই আর লুকিং ফর শত্রুজ মন্ত্রী আমরা দেখেছি।
আমরা আর ও দেখেছি আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছে মন্ত্রী।আমরা দেখেছি হাত দিয়ে ধাক্কা দিয়ে বিল্ডিং ফেলে দেওয়া হয়েছে এমন বক্তব্যের  মন্ত্রী।বস্তাবর্তি টাকা নিয়ে ধরা পড়া  রেল মন্ত্রনালয়।দেখেছি  জাতীয়  পতাকা গাড়িতে লাগিয়ে দম্ভ করা রাজাকার মন্ত্রী।প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ করতে ব্যর্থ শিক্ষামন্ত্রী।
এরকম আরো অসংখ্য উদাহরন দেয়া যাবে।শিক্ষা মন্ত্রী বলেছেন এদেশের শিক্ষকদের একটি বড় অংশ ঘটনাচক্রে শিক্ষক। আমি ও একমত পোষন করি।সাথে সাথে মনে করিয়ে দিতে চাই এদেশের সকল পেশাতে একটি অংশ ঘটনাক্রমে সেই পেশায় জড়িত।একজন মন্ত্রীর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় স্বাধীনতার পর থেকেই অনেকেই জোর করে,কেউ আবার ক্ষমতা দখল করে এমনকি বিনাভোটে নির্বাচিত হয়েই অনেকেই  ঘটনা চক্রে মন্ত্রী।

একজন বিচারপতি,একজন সচিব,একজন প্রশাসন ক্যাডারের উচ্চ পদস্থ কর্মকরতার ক্ষেত্রে ও এমন হাজার উদাহরন দেওয়া সম্ভব যে তারা ঘটনাক্রমে উক্ত পেশা গ্রহন করেছেন।

খোদ মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী নিজেই  একজন শিক্ষক ছিলেন।পরবর্তীতে তিনি এদেশের একজন সফল  শিক্ষামন্ত্রী হয়েছেন।এরকম হাজারো উদাহরন দেয়া সম্ভব যে প্রত্যেক পেশাতে ঘটনা চক্রে একটি বড় অংশ চাকুরিতে প্রবেশ করে।শিক্ষকদের ক্ষেত্রে ও তাই।কাজেই ঘটনাচক্রে শিক্ষক এই অজুহাতে শিক্ষকদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবেনা।শিক্ষামন্ত্রী জাতীয় সংসদে বলেছেন যারা শুরুর দিকে শিক্ষকতা পেশায় জড়িয়েছেন সেই  শিক্ষকদের অনেকেরই কাগজপত্রে সমস্যা।হয়ত হতে পারে।

কিন্তু মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর জ্ঞাতার্থে জানাতে চাই বাংলাদেশে প্রায় ৩৯ হাজার স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কমপক্ষে দশ হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পাওয়া যাবে যাদের কাগজ পত্র আপটুডেট।কাজেই অজুহাত দেখিয়ে শিক্ষকদের লালিত স্বপ্ন জাতীয়করন থেকে শিক্ষকদের বঞ্চিত করা ঠিক হবেনা।যাদের কাগজপত্র ঠিক আছে তাদের জাতীয়করনের আওতাধীন আনা সুবিবেচক সিদ্ধান্ত হবে বলে মনে করছি।তাই বলব জননেত্রী শেখ হাসিনার সোনার বাংলাদেশ গড়তে,শিক্ষার মান উন্নয়ন নিশ্চিত করতে,যোগ্যদের শিক্ষকতার পেশায় আকৃষ্ট করতে জাতীয়করনসহ শিক্ষক অধিকার নিশ্চিতের জন্য সরকারের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানাই।

লেখক ও কলামিস্ট-
ফিরোজ আলম,বিভাগীয় প্রধান,আয়েশা (রা:) মহিলা কামিল (অনার্স,এম.এ) মাদ্রাসা।সদর,লক্ষীপুর।

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.