খোলাবাজারে ডলারের দাম রেকর্ড ১১৫ টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক।।
ডলারের মূল্য কোনো ক্রমেই বাগে আনা যাচ্ছে না। ব্যাংকে নগদ ডলারের দাম বাড়ছে, বাড়ছে খোলাবাজারেও। গতকাল আগের সব রেকর্ড ভেঙে খোলাবাজারে প্রতি ডলার বিক্রি হয়েছে ১১৫ টাকা। এর পরও চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত ডলার পাওয়া যাচ্ছে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল রাখার স্বার্থে রিজার্ভ থেকে প্রতিনিয়তই ডলার বিক্রি করছে।

যদিও বর্তমানে শুধু জ্বালানি তেল, সার ও সরকারি কেনাকাটার মধ্যে সীমিত রাখা হচ্ছে। গতকাল কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার রিজার্ভ থেকে জ্বালানি তেল ও সার কিনতে ১৩ কোটি ৯০ লাখ ডলার বিক্রি করেছে। এর ফলে চলতি অর্থবছরে গতকাল পর্যন্ত (জুলাই-৮ আগস্ট) কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার রিজার্ভ থেকে ১৪৯ কোটি ডলার বিক্রি করল। একইসাথে গতকাল আন্তঃব্যাংকে বিনিময়মূল্য ৩০ পয়সা বাড়িয়ে ৯৫ পয়সায় উন্নীত করা হয়েছে। গত এক বছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্য কমিয়েছে সাড়ে ১০ টাকা বা ১২ দশমিক ৪৩ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মো: সিরাজুল ইসলাম গতকাল জানিয়েছেন, খোলাবাজারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করে না। মানিচেঞ্জারগুলো চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে ডলার কেনাবেচা করে। সুতরাং খোলাবাজারে ডলারের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করার বড় কোনো উপকরণ নেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে। কিন্তু ব্যাংকগুলোর তদারকি করা হচ্ছে। একই সাথে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার রিজার্ভ থেকে ব্যাংকগুলোকে সহযোগিতা করতে ডলার বিক্রি করছে। গতকালও ১৩ কোটি ৯০ লাখ ডলার বিক্রি করা হয়েছে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৯.৬ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে।

এক পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, খোলাবাজারে ডলারের সবচেয়ে বেশি দাম এর আগে উঠেছিল গত ২৭ জুলাই ১১২ টাকা। এরপর কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঠে তদারকিতে নামায় দাম কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে। কিন্তু গতকাল থেকে আবারো বাড়তে থাকে ডলারের দাম। গতকাল সোমবার সকালে ১০৮ টাকা থেকে ১১০ টাকা দরে ডলার লেনদেন শুরু হয়। দুপুরে কার্ব মার্কেটে প্রতি ডলার রেকর্ড ১১৫ টাকা ৬০ পয়সা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। তারপরও চাহিদা অনুযায়ী ডলার মিলছে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

তারা জানিয়েছেন, ব্যাংকের মতো খোলাবাজারেও ডলারের সঙ্কট দেখা দিয়েছে। প্রবাসীদের দেশে আসা কমেছে, বিদেশী পর্যটকও কম আসছেন। এ কারণে বাজারে ডলারের সরবরাহ কমে গেছে। চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত ডলার নেই। তবে বাজারে চাহিদা অনেক বেড়ে গেছে। সব মিলেই খোলাবাজারে ডলারের দর বেড়ে গেছে। তারা জানিয়েছেন, পর্যাপ্ত জোগান না থাকলে খোলাবাজারে ডলারের দাম বাড়তেই থাকবে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।

এ দিকে ব্যাংকেও দীর্ঘ দিন ধরে ডলারের সঙ্কট চলছে। আগে আন্তঃব্যাংক থেকে ডলার সংস্থান করতে না পারলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে কেনা হতো। কিন্তু রিজার্ভ কমে যাওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন শুধু জ্বালানি তেল, সার ও সরকারি কেনাকাটার জন্যই ব্যাংকগুলোকে ডলার সরবরাহ করছে। এ কারণে ব্যাংকগুলো পড়েছে বিপাকে। ব্যাংকগুলো ডলার সংস্থান করতে না পেরে এখন গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য আমদানির জন্য এলসি খুলতে পারছে না। অনেকেই গ্রাহকের চাহিদা মেটাতে এখন বেশি দামে রেমিট্যান্স সংগ্রহ করছে।

গতকালও কিছু কিছু ব্যাংক রেমিট্যান্স হাউজ থেকে ১১৩ টাকা থেকে ১১৫ টাকা পর্যন্ত ডলার কিনে পণ্য আমদানির দায় মিটিয়েছে। একটি ব্যাংকের তহবিল ব্যবস্থাপক গতকাল জানিয়েছেন, গত কয়েক দিন ধরে তিনি এলসি খুলছেনও না, এলসি নিষ্পত্তিও করছেন না। কারণ, নিজস্ব ডলার সংস্থান করা যাচ্ছে না। অপর দিকে কিছু কিছু ব্যাংক উচ্চদরে রেমিট্যান্স হাউজ থেকে ডলার কিনছে। এ কারণে উচ্চমূল্যে তিনি ডলার কিনে লেনদেন করছেন না।

খোলাবাজার ও ব্যাংকের নগদ ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকও আন্তঃব্যাংকে ডলার দাম বাড়িয়েছে। গতকাল প্রতি ডলারে আরো ৩০ পয়সা বাড়িয়ে ৯৫ টাকা নির্ধারণ করেছে। এই দরেই গতকাল ১৩ কোটি ৯০ লাখ ডলার বিক্রি করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বাজার আস্তে আস্তে নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। কারণ, রেমিট্যান্সপ্রবাহ বেড়ে যাচ্ছে। ১ আগস্ট থেকে ৭ আগস্ট পর্যন্ত দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৫৫ কোটি মার্কিন ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৪৮ শতাংশের ওপরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এ ছাড়া পণ্য আমদানিতে এলসি খোলার হার কমে গেছে। এর সুফল আগামী দুই মাসের মধ্যেই পাওয়া যাবে বলে আশা প্রকাশ করেছে ওই সূত্র।