ক্ষুব্ধ ৫ লাখ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারী

প্রকাশিত: ৮:৫৪ পূর্বাহ্ণ, বৃহঃ, ২২ জুলাই ২১

অনলাইন ডেস্ক।।

দীর্ঘদিন আন্দোলন করেও নামে মাত্র উৎসব ভাতা, বাড়িভাড়া এবং চিকিৎসা ভাতার কাঠামোয় বিন্দুমাত্র পরিবর্তন আসেনি দেশের এমপিওভুক্ত প্রায় পাঁচ লাখ শিক্ষক-কর্মচারীর। বিদ্যমান বিভিন্ন ভাতায় সরকারি-বেসরকারি বৈষম্য নিরসনের দাবিতে শিক্ষক আন্দোলন জাতীয় প্রেসক্লাব, সচিবালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়-এমনকি জাতীয় সংসদ পর্যন্ত গড়ালেও এর কোনো যৌক্তিক সমাধান দিতে পারেনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিক্ষকদের বড় এই তিনটি দাবি পূরণে দেড় যুগের বেশি সময় ধরে শুধু আশ্বাসের বাণী শুনিয়েছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্তা ব্যক্তিরা। ভাতা বাড়ানোর পক্ষে সংসদ অধিবেশনে সাংসদরা আলোচনা তুললেও সাবেক ও বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী এর কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি এবং দাবি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতেও ব্যর্থ হয়েছেন। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শিক্ষকদের বিচ্ছিন্নভাবে সুযোগ-সুবিধা দিলেও দেশের সবচেয়ে বড় এই পেশাজীবী গোষ্ঠীকে খুশি করাতে পারেননি।
শিক্ষাবিদরা আরও বলছেন, খুশি না হওয়ার একমাত্র কারণ হচ্ছে- কোনো নিয়মনীতি ছাড়াই যখন, যেটা সামনে এসেছে, তখনই তা বিবেচনা করায় শিক্ষাখাতে সরকারি-বেসরকারি শিক্ষকদের মধ্যে এক ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। ফলে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা তাদের যৌক্তিক তিনটি দাবি নিয়েই ১৭ বছর ধরেই আন্দোলনের মাঠে রয়েছেন। বিপরীতে দাবি পূরণে শিক্ষা প্রশাসন কোনো উদ্যোগ না নেয়ায় শিক্ষক সমাজে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
জানা যায়, দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ২৫ শতাংশ এবং কর্মচারীদের ৫০ শতাংশ হারে উৎসব ভাতা দেয়া শুরু হয় ২০০৪ সালে। ওই বছরের ২২ জানুয়ারি তৎকালীন সরকার একটি প্রজ্ঞানের মাধ্যমে এ ভাতার প্রচলন করে। এ স্তরের শিক্ষক-কর্মচারীরা জাতীয় বেতন স্কেলের আওতায় শতভাগ বেতন, ইনক্রিমেন্ট ও বৈশাখী ভাতা পেয়ে আসছেন।
বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ লিয়াজোঁ ফোরামের মুখপাত্র মো. নজরুল ইসলাম রনি জানান, বিদ্যমান ব্যবস্থায় কর্মচারীরা ৫০ শতাংশ আর শিক্ষকরা ২৫ শতাংশ উৎসব ভাতা পেয়ে আসছেন। দীর্ঘ ১৭ বছর আন্দোলন করলেও শিক্ষা মন্ত্রণালয় আমাদের সে দাবি বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ নেয়নি। দাবি পূরণে শিক্ষা প্রশাসন ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। একই সঙ্গে বর্তমান ব্যয়বহুল জীবনযাত্রায় নামেমাত্র ১ হাজার টাকা বাড়িভাড়া ও ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা দিয়ে শিক্ষকদের অপমান করা হচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীর কাছে ঈদ বোনাস পরিবর্তনে একাধিকবার স্মারকলিপি দিয়েছি। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট এলাকার সংসদ সদস্যদের উৎসবভাতা ও শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণের দাবি সংসদে উত্থাপন করতে স্মারকলিপি দিয়েছিলাম। মহান সংসদে এমপিরা দাবি তুললেও শিক্ষামন্ত্রী এ বিষয়ে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। এবারও উৎসব ভাতা পূর্বের নিয়মে বিতরণ করা হয়েছে। আমরা হতাশ।
বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষক-কর্মচারী ফোরামের (বামাশিকফো) সভাপতি দেলাওয়ার হোসেন আজিজী বলেন, দীর্ঘদিনের বড় এই তিনটি দাবি নিয়ে শিক্ষক সমাজে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। করোনার এ দুঃসময়ে শিক্ষকরা চরম আর্থিক কষ্টে দিন যাপন করছেন। আমরা শিক্ষক সমাজ আজ হতাশ। শিক্ষকদের অভিভাবক শিক্ষামন্ত্রী যখন দাবি বাস্তবায়নে আন্তরিক নন তখন আমরা প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চাইছি।
এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির মোবাইল ফোনে একাধিকবার চেষ্টা করেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে শিক্ষকদের সব ধরনের ভাতা শতভাগ করার কোনো উদ্যোগ রয়েছে কি না জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. মাহবুব হোসেন এ ব্যাপারে মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন।
জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য এবং প্রবীণ শিক্ষক নেতা অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ ভোরের ডাককে বলেন, শিক্ষকদের এই তিনটি দাবি যৌক্তিক, ন্যয়সঙ্গত এবং মানবিক। এগুলো বহুদিনের, অনেক আগেই পূরণ হওয়া দরকার ছিলো। কিন্তু শিক্ষা প্রশাসন বা সংশ্লিষ্টরা এর মর্ম হয়তো বুঝতে পারেননি। তিনি আরও বলেন, শিক্ষকরা সন্তুষ্ট থাকলে শিক্ষার মান বাড়ে, তাদের আত্ম-সম্মান বাড়ে। দাবি পূরণে সংশ্লিষ্টরা ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি আরও বলেন, তবে দাবি বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে গেলেই সব সমস্যার সমাধান হবে। শিক্ষাবন্ধব সরকারপ্রধান শেখ হাসিনাই একমাত্র শিক্ষকদের এ দাবি বুঝতে পারবেন। এক কথায় বলবো- এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের শতভাগ উৎসবভাতা, বাড়িভাড়া ও চিকিৎসাভাতা সরকারি নিয়মে দেয়া হলে এটি গোটা শিক্ষাখাতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
জানা যায়, চলতি বছরের ২৮ মার্চ ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (স্কুল ও কলেজ) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০২১’ জারি করেছে সরকার। নীতিমালার ১১.৭ ধারার ‘ঙ’ তে বলা হয়েছে, ‘বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের মূল বেতন/বোনাসের নির্ধারিত অংশ/উৎসব ভাতার নির্ধারিত অংশ সরকারের ২০১৫ সালে জাতীয় বেতন স্কেল/সরকার নির্ধারিত সর্বশেষ জাতীয় বেতন স্কেলের সঙ্গে অথবা সরকারের নির্দেশনার সঙ্গে মিল রেখে করতে হবে। মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংশোধিত নতুন নীতিমালায় বোনাসের প্রসঙ্গটি আনা হলেও শতভাগ বোনাসের ক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমতি প্রয়োজন রয়েছে। এখন শতভাগ বোনাস দিতে হলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে নতুন নির্দেশনা জারি করতে হবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে। তবে এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি বলে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) পরিচালক (বিদ্যালয়) অধ্যাপক বেলাল হোসাইন বলেন, এটি সরকারের উচ্চমহলের সিদ্ধান্ত। আমাদের কাছে শতভাগ বোনাস বাস্তবায়নের কোনো নির্দেশনা আসেনি। এলে অবশ্যই পদ্ধতিগতভাবে এটি পুরোপুরি কাার্যকর হবেে।
দীর্ঘ ১০ বছর বন্ধ থাকার পর সর্বশেষ ২০১৯ সালে একযোগে দুই হাজার ৭৩০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করে সরকার। পরে সংশোধন করে ওই বছরের ১২ নভেম্বর ৬টি এবং ১৪ নভেম্বর আরও ১টি প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করা হয়। এর আগে ২০১০ সালে ১ হাজার ৬২৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হয়েছিল। তবে বর্তমানে এমপিও উপযুক্ত এখন পর্যন্ত অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যেগুলো সরকারের সকল শর্ত পূরণ করেছে। সরকারি দলের সাংসদরা প্রতি অর্থ বছরেই নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি চান। সংসদ সদস্যদের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির প্রশাসন। মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিদের বক্তব্য হচ্ছে- শিক্ষকদের অনান্য ভাতা বৃদ্ধি ও সুবিধা নিশ্চিত করার চেয়ে তারা নন-এমপিও স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসাগুলোকে এমপিওভুক্ত করার ব্যাপারে খুবই আন্তরিক। দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এখনো বড় একটি অংশ নন-এমপিও রয়ে গেছে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এগুলো এমপিওভুক্তির বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ইতিবাচক।
জানা গেছে, সারাদেশের ২৮ হাজারের বেশি এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে ৪ লাখ ৬ হাজার ৪৬৯ জন শিক্ষক এবং ১ লাখ ৬২ হাজার ৮৬১ জন কর্মচারী রয়েছেন। বর্তমানে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা ২৫ শতাংশ এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরা পান ৫০ শতাংশ ঈদ বোনাস। তবে সরকারি চাকরিজীবীদের মত ২০ শতাংশ হারে বৈশাখী ভাতা পান। দীর্ঘদিন ধরে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা শতভাগ ঈদ বোনাসের দাবি জানিয়ে এলেও সরকারের পক্ষ থেকে এ দাবি মেনে নেয়া হয়নি।
দীর্ঘ ১৭ বছরেও শিক্ষকদের উৎসব ভাতার পরিমান বাড়েনি।
আর ১১ বছর আগে দেয়া বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ১ হাজার টাকা বাড়িভাড়া ও ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতার সিদ্ধান্ত পাল্টায়নি। শিক্ষক নেতারা বলছেন, গত দশ বছরে দেশে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে কয়েকগুণ। সেখানে এই অল্প টাকায় বাড়িভাড়া ও চিকিৎসার খরচ মেটানো খুবই কঠিন। এটি হাস্যকরও বটে। শিক্ষক সমাজকে সরকার সম্মান না করে বরং অপমানিত করেছে।
শিক্ষকরা আরও জানিয়েছেন, এই মুহূর্তে তারা জাতীয় বেতন স্কেল-২০১৫ অনুযায়ী, সব সুযোগ-সুবিধা চান। শিক্ষকদের দাবি, স্কেলভিত্তিক পূর্ণ বাড়িভাড়া, দেড় হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতা, স্কেলভিত্তিক উৎসব বোনাস ও বেতন নির্ধারণ, ধারাবাহিক পদোন্নতি ও বদলির ব্যবস্থা, প্রধান শিক্ষকদের ষষ্ঠ গ্রেডে বেতন নির্ধারণ, বিভাগীয় ভাতা ব্যবস্থা, পূর্ণ অবসর ভাতাসহ মাসিক পেনশন, শিক্ষার্থীদের স্বল্প খরচে পড়াশোনার সুযোগ এবং শিক্ষকদের সন্তানদের জন্য শিক্ষা ভাতা চালুকরণ।

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.