ক্ষমতা বড়াই- মমতার লড়াই !

প্রকাশিত: ২:০৮ অপরাহ্ণ, সোম, ২৬ জুলাই ২১

মুহাম্মদ হযরত আলী।। 

করোনা মহামারীর প্রথম ঢেউ পেরিয়ে তীব্র দ্বিতীয় ঢেউ চলছে।এই বৈশ্বিক দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ সর্বোচ্চ সতর্কতা সাথে নিরন্তর বহুমুখী প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। জনপ্রতিনিধি,সরকারি আমলা ও সরকারি বেসরকারি সংস্থা একযোগে দিবানিশি কাজ করছে।দেশে করোনা ভাইরাস বিস্তার রোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি,স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালন,আঈনের শাসন বাস্তবায়ন ও খাদ্য নিরাপত্তা সহ সামাজিক নিরাপত্তা বিধানের ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারগনের গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকার বিষয়ে সকলেই অবগত আছেন।

কেননা বাংলাদেশের প্রশাসনিক ব্যাবস্থায় দুটো গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো জেলা ও উপজেলা প্রশাসন।
দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় গুরুত্বপূর্ণএ দুটো প্রশাসনিক ইউনিটের কর্ণধার হিসেবে পুরুষদের পাশাপাশি১০জন জেলা প্রশাসক এবং ১৪৯ জন উপজেলা নির্বাহী অফিসারের পদে দায়িত্ব পালন করছেন নারীকর্মকর্তারা।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সংবাদপত্রের মাধ্যমে প্রাপ্ত চারজন নারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার করোনা দুর্যোগ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সাম্প্রতিক সময়ে সংগঠিত চারটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নিয়ে”ক্ষমতার বড়াই-মমতার লড়াই” শিরোনামের প্রতিবেদন।

১।আরিফা জহুরা

নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলাধীন দেওভোগ নগর বাড়ি এলাকার ফরিদ উদ্দিন নামের একজজ বৃদ্ধ মানুষ করোনা দুর্যোগে অভাব গ্রস্থ হয়ে গত ১৮ মে ৩৩৩ নাম্বারে ফোন করে খাদ্য সহায়তা চেয়েছিলেন।সে প্রেক্ষিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফা জহুরা তদন্তে গিয়ে,আবেদনের যথার্থতা যাচাই না করেই ফরিদ সাহেবের চারতলা বাড়িআছেএবং তিনি হুশিয়ারী কারখানার মালিক এরুপ আনুমানিক তথ্যের ভিত্তিতে খাদ্য সহায়তার স্থলে উল্টো তাকে ১০০ জন মানুষের খাদ্য সহায়তার জরিমানা প্রদান করতে বাধ্য করেন।
পরবর্তী তে জানা যায় ফরিদ উদ্দিন সাহেব মাসিক ১০ হাজার টাকা বেতনে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন,একটি প্রতিবন্ধীছেলে, একজন কলেজপড়ুয়া মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে কষ্টে চলে তার সংসার।সংকটে পড়েই তিনি ৩৩৩ নাম্বারে ফোন করে খাদ্য সহায়তা চেয়েছিলেন কিন্তু পালটা তাকে স্ত্রীর গয়না বন্ধক রেখে ও সুদে ধার-কর্জ করে ১০০ জনকে খাদ্য সহায়তা প্রদান করতে হয়েছে।

২।সীমা শারমিন

বগুড়ার আদমদীগি উপজেলা নির্বাহী অফিসার সীমা শারমিন গত ২২মে উপজেলাপ্রশাসন কমপ্লেক্সের ফুলগাছ খাওয়ার অপরাধে হতদরিদ্র ছাগলের মালিক সাহারা বেগমের অনুপস্থিতিতেই ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে দুই হাজার টাকা অর্থ দন্ড প্রদান করেন, কিন্তু জরিমানার অর্থ
পরিশোধে ব্যার্থহওয়ায় কথিত ছাগলটিই ইউএনও সাহেব পাঁচ হাজার টাকা মুল্যে বিক্রি করে জরিমানার টাকা আদায় করে নেন।
আলোচিত ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশের মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়। এতে ইউএনও সাহেবের ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে অবশেষে গুনিজনদের মধ্যস্থতায় ছাগলটিকে মালিকের নিকট ফেরত প্রদান এবং জরিমানার আদেশ ও বাতিল করেন ইউ এন ও সীমা শারমিন।

৩।সানজিদা শাহনাজ

করোনায় মৃত নারীর লাশ দাফন
ও করোনা আক্রান্ত তাঁর মুমূর্ষু স্বামীকে চাঁদপুর জেনারেল হাসপাতালের করোনা ইউনিটে ভর্তি করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন
চাঁদপুর সদরের উপজেলা নির্বাহী অফিসার সানজিদা শাহনাজ।
পত্রিকার খবরে জানা যায় চাঁদপুর শহরের ট্রাকরোডে অবস্থিত খানবাড়ীতে শাহ আলম(৬৫)ও শাহনাজ বেগম (৫৬) দম্পতির দুজনই একযোগেকরোনায় আক্রান্ত হয়ে নিজ বাড়ীতে আইসোলেশনে থাকা অবস্থায় গুরুতর আক্রান্ত হয়ে শাহনাজ বেগম গত ১১জুলাই নিজ ঘরেই মারা যান। মৃত লাশটি ঘরের মেঝেই পড়ে থাকলেও খোঁজ নেয়ার কেউ ছিলনা।
অপর দিকে করোনায় আক্রান্ত স্বামী শাহআলমও মুমূর্ষু অবস্থায় বিছানায় পড়ে কাতরাচ্ছিলেন, তাদের তিন সন্তানই থাকেন প্রবাসে।আর নিকটে কোন আত্মীয় স্বজন না থাকায় এবং প্রতিবেশীরা করোনা রোগীর বাড়ীটি এড়িয়ে চলায় মৃত লাশটির সৎকার ও শাহআলমের চিকিৎসা ব্যাবস্থারও কোন উপায় ছিলনা।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার সানজিদা শাহনাজ টেলিফোনে বিষয়টির জানতে পেরে তাৎক্ষণিক ঐ বাড়িতে পৌছান এবং নিজ দায়ীত্বে লাশের কাফন-দাফন ও শাহআলমকে চিকিৎসার জন্য চাঁদপুর জেনারেল হাসপাতালের করোনা ইউনিটে ভর্তির ব্যাবস্থার মাধ্যমে একটি বিপর্যস্ত পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

৪।সাদিয়া আফরিন

গত ১৩ জুলাই রাত ২টায় বগুড়া জেলার সোনাতলা উপজেলাধীন জোড়গাছা ইউনিয়নের কুশাহাটা গ্রামের রিনা বেগম(৫৫) করোনা আক্রান্ত হয়ে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মারা যান। লাশটি বাড়িতে নিয়ে আসলে গোসল ও দাফন-কাফনের জন্য কেউ এগিয়ে আসেনি। স্বামী অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য মোতালেব হোসেন ও করোনায় আক্রান্ত, তাদের কোন সন্তানাদিও কাছে নেই, প্রতিবেশীরাও করোনার ভয়ে ঐ বাড়ীটি পাশ কাটিয়ে চলছিলেন।

সোনাতলা উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাদিয়া আফরিন এ ঘটনাটি জানতে পেরে মৃত রিনা বেগমের বাড়িতে হাজির হয়ে শরীয়ত সম্মত উপায়ে নিজ হাতে রিনা বেগমের লাশের গোসল সম্পন্ন করিয়ে জানাজা ও দাফনের ব্যাবস্থা করেন।

এ সময় স্থানীয় প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান উপস্থিত ছিলেন। উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাদিয়া আফরিন সাংবাদিকদের কাছে জানান,

আমি একজন মুসলমান হিসেবে ধর্মীয় এবং মানবিক দৃষ্টিকোন ও আমার দায়ীত্ব বোধ থেকে লাশটিকে নিজ হাতে গোসল করিয়ে দাফন- কাফনের ব্যাবস্থা করি।এ সময় স্থানীয় একজন বৃদ্ধা মহিলা আমাকে সহযোগিতা করেছেন।

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.