কেমন হওয়া উচিত ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক

লুৎফর রহমান নাঈম।।

১৯৬৯-এর ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে যখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে পড়ে, তখন ক্ষিপ্ত হয়ে পুলিশ সদস্যরা ছাত্রদের ওপর গুলি করার প্রস্তুতি গ্রহণ করে। তখন এগিয়ে যান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহা স্যার। তিনি ছাত্রদের গুলি না করার জন্য অনুরোধ করেন। ‘আজ আমি ছাত্রদের রক্তে রঞ্জিত, এর পর কোনো গুলি ছাত্রের গায়ে না লেগে যেন আমার গায়ে লাগে’-

এক পর্যায়ে ড. শামসুজ্জোহা স্যারকেই গুলি করে পুলিশ। আর এভাবেই নিজের জীবন দিয়ে ছাত্রদের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার নজির স্হাপন করে গেছেন তিনি। শিক্ষার্থীদের প্রতি ড. শামসুজ্জোহা স্যারের এই অকৃত্রিম ভালোবাসা শুধু ছাত্র সমাজ নয়, আপামর জনতার হূদয়ে চিরঅম্লান হয়ে আছে। প্রতি বছর ১৮ ফেব্র‚য়ারি শামসুজ্জোহা দিবস হিসেবে এই দিনটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পালন করা হয়।

পৃথিবীতে যত সম্পর্ক আছে এর মধ্যে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক একটু ভিন্ন। এর মধ্যে নিহিত থাকে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, স্নেহ ও শাসন। এক জন ছাত্রের ভালো লেখাপড়ার পেছনে তার অভিভাবকের ও শিক্ষকের গুরুত্ব সমান। তাদের সঙ্গে সম্পর্কটাও গভীর হওয়া প্রয়োজন। এক জন আদর্শ শিক্ষক শিক্ষার্থীর অভিভাবকের ভূমিকায় কাজ করেন। সঠিক পরামর্শ দিয়ে জীবন গঠনে ভূমিকা রাখেন; কিন্তু এই মধুর সম্পর্কে কোথায় যেন বড় ফাটল ধরেছে। কবি কাজী কাদের নেওয়াজের লেখা ‘শিক্ষা গুরুর মর্যাদা’ কবিতা আবৃত্তি করলে যে দৃশ্যপট তৈরি হয়, সে দৃশ্য সমাজ থেকে উধাও হয়ে গেছে। ছাত্র শিক্ষকদের সম্পর্ক এই কবিতার মতো আর নেই। কিন্তু ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে নিবিড় ও সুষ্ঠু সম্পর্ক ছাড়া আমাদের শিক্ষাব্যবস্হায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা আদৌও কি সম্ভব?

এখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষা বা গবেষণার চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থ রক্ষার রাজনীতি বেশি চর্চা হয়। অধিকাংশ শিক্ষক ব্যক্তি স্বার্থে শিক্ষার্থীকে ব্যবহার করতে চান আর প্রয়োজন শেষে শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধেই অবস্হান নেন। শিক্ষার্থীর চাহিদা বা প্রয়োজন তারা বুঝেও না বোঝার ভান করেন। শিক্ষার্থীর ন্যাঘ্য বা যৌক্তিক আন্দোলনেও তারা হুল ফুটাতে চান। আজকের শিক্ষকের এ কেমন দায়িত্বহীনতা?

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় যেন শিক্ষক রাজনীতির আখরায় পরিণত হয়েছে। শিক্ষকরা এখন শিক্ষকতার চেয়ে বেশি ব্যস্ত নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারে। ক্ষমতা আর দলীয় প্রভাব খাটিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় বড় পদপদবি দখল করে টাকার বিনিময়ে অদক্ষ শিক্ষক নিয়োগ, স্বজনপ্রীতি—এসব এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযোগ। দুর্নীতির মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত অদক্ষ শিক্ষকই একদিন দলীয় প্রভাব খাটিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হচ্ছেন। এতে যেমন সঠিক মানের শিক্ষক পাচ্ছে না শিক্ষার্থীরা, তেমনি সব দিক দিয়ে পিছিয়ে পড়ছে দেশের শিক্ষাব্যবস্হার মান।

শিক্ষার মানোন্নয়নে এবং বর্তমান বিশ্বে সমাজ, অর্থনৈতিক, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ছাত্রদের তৈরি করতে যাদের সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করার কথা, সেই শিক্ষকদের বড় একটা অংশ নিজেদের পদ-পদবি ধরে রাখতে কিছু শিক্ষার্থীকে কৌশলে তাদের অপকর্মের সমর্থক বানাচ্ছেন, ব্যক্তিস্বার্থে তাদের ব্যবহার করছেন। অধিকাংশ শিক্ষকের কাছে শিক্ষকতার চেয়ে দলীয় রাজনীতিই প্রধান পরিচয় হয়ে উঠেছে। কে কত বড় শিক্ষক বা গবেষক, সেটা বিষয় নয়, বরং যে যত বড় দলীয় রাজনীতির পদ বহন করেন তিনি তত বেশি মর্যাদা ও ক্ষমতাশালী হিসেবে পরিচিত হতে থাকেন। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের এই লেজুড়বৃত্তিক অপরাজনীতি তাদেরকে ভুলিয়ে দেয় যে, বিশ্ববিদ্যালয় একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

এক জন শিক্ষক হবেন তার শিক্ষার্থীর অভিভাবক, তিনি শিক্ষার্থীর সঙ্গে অভিভাবকসুলভ আচরণ করবেন। এক জন শিক্ষক হবেন ধৈর্যশীল, বিনয়ী ও ইতিবাচক জীবনবোধের অধিকারী। তিনি শিক্ষার্থীর প্রতি বিরক্ত না হয়ে ধৈর্য ও সহনশীলতার সঙ্গে শিক্ষার্থীর দাবি শুনবেন, সাধ্যমতো তাদের দাবি বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করবেন। শিক্ষার্থীর ন্যাঘ্য দাবি উপেক্ষা করে পুলিশ ডেকে এনে শিক্ষার্থী পিটানো বা শিক্ষার্থীর ওপর সাউন্ড গ্রেনেড, গরম পানি বা গুলিবর্ষণ করা, এমন দৃশ্য একেবারেই কাম্য নয়। ক্যাম্পাসে শাবিপ্রবির ভিসির উপস্হিতিতে শিক্ষার্থীর ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণ কোনোভাবেই অভিভাবকসুলভ আচারণ নয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কর্মকর্তার পদে বসে শিক্ষার্থীর সঙ্গে এই নিষ্ঠুরতা ও হঠকারিতা কখনো গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। শিক্ষার্থী আছে বলেই কেউ ভিসি, কেউ প্রক্টর। শিক্ষার্থী বাদ দিয়ে একটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা এক জন শিক্ষক কখনো চলতে পারেন না। তাই শিক্ষার্থীর অধিকার আদায়ে শুধু শিক্ষার্থী কেন শিক্ষকেরও আন্দোলনে শরিক হওয়া উচিত, কিন্তু এর ব্যতিক্রম আমরা দেখতে পাচ্ছি। একজন শিক্ষক যদি তার ছাত্রছাত্রীর প্রয়োজন না বুঝেন, ব্যক্তিস্বার্থ বা দলীয় স্বার্থে শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে অবস্হান নেন, তাহলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কখনো সুদিন বা শৃঙ্খলা ফিরে আসবে না।

লেখক: শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়