কূটনীতিকরা এতো তৎপর কেন?

নিউজ ডেস্ক।।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে। এখনও এক বছরের বেশি সময় বাকি থাকলেও এরই মধ্যে জমে উঠেছে মাঠের রাজনীতি। সম্প্রতি বিএনপির দেশজুড়ে বিভাগীয় সমাবেশ শুরুর পর বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে তৎপর হয়ে উঠেছেন। যা ভালো ভাবে দেখছে না সরকার।

শিষ্টাচার বর্হিভূত বক্তব্য ও আচরণের জন্যে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে সেসব কূটনীতিকদের সতর্কও করেছে সরকার। এরই মধ্যে নির্বাচন নিয়ে মন্তব্যের জন্য বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম তার ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে দেয়া পোস্টে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানিয়েছেন জাপানের রাষ্ট্রদূতকে ভিয়েনা কনভেনশনের কথা মনে করিয়ে দেয়া হয়েছে।

ভিয়েনা কনভেনশন মানলে বিদেশী কূটনীতিবিদরা যে কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে মন্তব্য করতে পারেন না। শাহরিয়ার আলম আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আসন্ন জাপান সফরের মধ্য দিয়ে দু’দেশের সম্পর্ক আরো গভীর হবে। সেই লক্ষ্য নিয়েই কাজ করছে সরকার। এদিকে চলতি মাসে ঢাকায় এসে যুক্তরাষ্ট্রের উপ-সহকারী মন্ত্রী আফরিন আক্তার বলেন, বাংলাদেশে অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে তার দেশ সহযোগিতা দেবে।

একইসঙ্গে সমুদ্র নিরাপত্তায় সহযোগিতা দেবে যুক্তরাষ্ট্র। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক বৈঠকের পর মার্কিন উপ-সহকারী মন্ত্রী আফরিন আক্তার বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন প্রত্যাশা করে। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ঢাকা মিশন ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা-ইউএসএইড সিভিল সমাজের সঙ্গে কাজ করে চলেছে।

নির্বাচনের এক বছর আগেই বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা এতো তৎপর হয়ে উঠেছে কেন তা নিয়ে ভাবতে শুরু করেছেন বিশ্লেষকরা। অন্যদিকে দেশে আগামী সাধারণ নির্বাচন কীভাবে হবে তা নিয়ে পরস্পরবিরোধী অবস্থানে থেকে নিজেদের পক্ষে জনমত তৈরির চেষ্টা করছে দুই প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। আওয়ামী লীগ বলছে, গত দুটি নির্বাচনের মতো সামনের নির্বাচনও হবে শেখ হাসিনার সরকারকে ক্ষমতায় রেখেই।

আর বিএনপি বলছে, নির্বাচনটি হতে হবে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে এবং আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রেখে কোন নির্বাচন তারা হতে দেবেনা। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই নির্বাচন ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিদেশি কয়েকজন কূটনীতিকের বক্তব্যে পাল্টাপাল্টি প্রতিক্রিয়া এসেছে দল দুটির দিক থেকে।

বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চোখ খুলে গেছে। গণতন্ত্রের জন্য তাদের চেষ্টা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন পাবে বলেই আশা করছেন তারা। বিএনপি মহাসচিব নিজেও সম্প্রতি কয়েকজন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠক করেছেন যেগুলোর বিষয়বস্তু প্রকাশ করা হয়নি। আবার সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে আসা জাপানের রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকির একটি বক্তব্য বিএনপির দিক থেকে স্বাগত জানালেও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে সরকার। ওই বক্তব্যে রাষ্ট্রদূত গত নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালট বাক্স ভর্তির প্রসঙ্গটি এনেছিলেন।

এছাড়া পশ্চিমা কূটনীতিকদের অনেকে কথা বলছেন নাগরিক সমাজের সাথেও। আবার উভয় দলের পক্ষ থেকে কূটনীতিকদের সাথে বৈঠক বা কূটনীতিকদের ব্রিফিং করার ঘটনাও নিয়মিতই দেখা যাচ্ছে। এমনকি সামনের নির্বাচন যেন অবাধ ও নিরপেক্ষ হয় সেজন্য কুটনীতিকরাও উদ্যোগী হয়ে রাজনৈতিক নেতাদের সাথে কথা বলছেন বলে খবর আসছে গণমাধ্যমে। যদিও কূটনীতিকদের পক্ষ থেকে এমন কোন উদ্যোগের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ বলেনি।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য শাজাহান খান বলছেন, কূটনীতিকদের কোন ভাবেই শিষ্টাচার লঙ্ঘন করা উচিত নয় বলেই মনে করেন তিনি। এর আগে গত জুলাইতে ঢাকায় বিদেশি মিশনগুলোতে নোট ভারবাল পাঠিয়ে কূটনৈতিক শিষ্টাচারের বিষয়টি মনে করিয়ে দিয়েছিলো বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এর কয়েকদিন আগেই প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সাথে সাক্ষাত করেছিলেন ইউরোপীয় একদল কূটনীতিক।

মূলত বাংলাদেশে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সংকটের পটভূমিতে কূটনীতিকদের তৎপরতা নতুন কিছু নয়। উনিশশো ছিয়ানব্বই সালের নির্বাচনের আগে ঢাকায় এসেছিলেন তখনকার কমনওয়েলথ মহাসচিবের বিশেষ দূত স্যার নিনিয়ান স্টেফান। পরে ২০১৩ সালে জাতিসংঘ মহাসচিবের দূত হয়ে ঢাকায় এসে দু পক্ষকে এক জায়গায় আনার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিলেন অস্কার ফার্নান্দেজ-তারানকো। পরে ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন করেছিলো বিএনপি। আবার ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগেও নানা ধরণের তৎপরতায় সম্পৃক্ত হয়েছিলেন বিদেশি কূটনীতিকদের অনেকে।

বিদেশি কূটনীতিকদের সাথে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে বিভিন্ন সময়ে সংলাপে অংশ নিয়েছেন বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের মতো বিষয়গুলোতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কথা বলার এখতিয়ার আছে এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর কারণেই কূটনীতিকরা কথা বলার সুযোগ পান। তার মতে, রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে কিংবা নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে সেটি প্রভাবশালী দেশগুলোর প্রতিনিধিদের আরও ভূমিকা রাখার সুযোগ তৈরি করে দিবে, সেটি কোন রাজনৈতিক দল প্রত্যাশা করুক আর নাই করুক।