কারিগরি শিক্ষা: সংখ্যা ও মানের ভারসাম্য চাই

নিউজ ডেস্ক।।

সরকার অনেক দিন ধরেই কারিগরি শিক্ষায় যেভাবে জোর দিয়ে আসছে, তার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার উপায় নেই। বস্তুত বিশ্বে কর্মমুখী শিক্ষার যে জোয়ার আমরা দেখছি, সেদিক থেকে বাংলাদেশে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা যে পিছিয়ে রয়েছে, তাও উল্লেখযোগ্য। সে জন্য একদিকে যেমন এ শিক্ষায় শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ বাড়াতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে, একই সঙ্গে গুণগত মান রক্ষার বিষয়টিও উপেক্ষা করা চলবে না। আমরা জানি, কারিগরি শিক্ষার সঙ্গে বিজ্ঞানের নিবিড় যোগসূত্র রয়েছে। সেদিক থেকে এসএসসির পর ডিপ্লোমা প্রকৌশলে ভর্তির ক্ষেত্রে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের সরাসরি সুযোগ দেওয়ার যে নিয়ম কারিগরি শিক্ষা বোর্ড করছে, তা নেতিবাচক হিসেবে দেখার সুযোগ সামান্যই। বলা বাহুল্য, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা শাখার ছাত্রছাত্রীদেরও ডিপ্লোমা প্রকৌশলে ভর্তির সুযোগ রয়েছে, সে ক্ষেত্রে তাদের আবেদনের যোগ্যতা অর্জনে ‘রিমিডিয়াল কোর্স’ সম্পন্ন করতে হবে।

এটা ঠিক, আগে যে কোনো বিভাগ থেকে আসা শিক্ষার্থী সরাসরি ডিপ্লোমা প্রকৌশলে ভর্তির আবেদন করতে পারতেন। এখন বিজ্ঞান বিভাগের বাইরের শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত কোর্সের শর্ত আরোপ করার মাধ্যমে একদিকে যেমন কারিগরি শিক্ষার প্রতি সত্যিকার আগ্রহী শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করা সম্ভব হবে, একই সঙ্গে এ শিক্ষায় প্রবেশের ক্ষেত্রে যোগ্যদেরও বাছাই করা সম্ভব হবে। আমরা জানি, বর্তমানে কারিগরিতে ২০ শতাংশের কম শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে; সরকার এ সংখ্যা বাড়িয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যে ডিপ্লোমা প্রকৌশলে ভর্তির ক্ষেত্রে বয়সের বাধাও তুলে দিয়েছে। আমরা দেখেছি, অনেক শিক্ষার্থী সাধারণ শিক্ষার পছন্দের কলেজে ভর্তির সুযোগ না পেয়ে যেমন কারিগরিতে ভর্তি হয়, তেমনি অনেকে সাধারণ শিক্ষায় কলেজ পর্যায়ে পড়াশোনা শেষ করেও কারিগরি শিক্ষার নানা ক্ষেত্রে ডিপ্লোমা পর্যায়ে ভর্তি হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ঝোঁক বাড়ার প্রবণতা নানা কারণে স্পষ্ট।

বলার অপেক্ষা রাখে না, চাকরির বাজারে এখন দক্ষতার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলেই দক্ষতাভিত্তিক এই কর্মমুখী শিক্ষার চাহিদা বড়ছে। দেশে বেসরকারি খাতের যেভাবে সম্প্রসারণ ঘটছে, তাতে দক্ষ কর্মীর চাহিদা বাড়বে- এটাই স্বাভাবিক। এমনকি বিদেশেও দক্ষ কর্মীর চাহিদা বেশি এবং তারা বাস্তবে ভালো করছে। কেবল চাকরির বাজারের চাহিদা পূরণই নয়, বরং চাকরি না পেলে নিজেই যাতে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারে- কারিগরি শিক্ষা শিক্ষার্থীদের সেই দিশাও দিয়ে থাকে। তার পরও হাতে-কলমের এ ব্যবস্থায় যেভাবে শিক্ষার্থীদের শেখানো প্রয়োজন, সেদিক থেকে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এখনও নানা ধরনের সমস্যা বিরাজ করছে। স্বাভাবিকভাবেই এ শিক্ষার প্রতি ঝোঁক বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও বাড়ছে। আমরা দেখছি, বিশেষ করে বেসরকারি কারিগরি প্রতিষ্ঠানগুলোতে সমস্যা বেশি এবং এসব প্রতিষ্ঠানের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। কারিগরি শিক্ষায় নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে হাতে-কলমে শেখানোর পরিবর্তে নামমাত্র উপস্থিতি ও অর্থের বিনিময়ে পরীক্ষা দেওয়া, একজনের রেজিস্ট্রেশনে অন্যজনকে পরীক্ষা দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে। সেদিক থেকে কারিগরি শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নেও পরিপূরক কোর্সটি ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে ‘রিমিডিয়াল কোর্সের’ পাঠ্যক্রম নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এমন কঠিন কোনো অধ্যায় এখানে রাখা উচিত হবে না, যা সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভীতির কারণ হয়। মৌলিক বিষয়াবলির সমন্বয় ঘটিয়ে সবার জন্য বোধগম্য একটি কোর্সের ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। এ কোর্সের পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষার সার্বিক গুণগত মান উন্নয়নে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিতে হবে। সেখানে শিক্ষক সংকট দূর করাসহ তাদের মানসম্মত বেতন-ভাতার ব্যবস্থা যেমন প্রয়োজন; একই সঙ্গে ল্যাব বাড়ানো, মানসম্মত ও যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম প্রণয়নেও নজর দিতে হবে। একই সঙ্গে কারিগরি শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন বাজার সৃষ্টি ও তাদের যথাযথ কর্মসংস্থানের বিষয়টিও উপেক্ষা করা চলবে না। সর্বোপরি, কারিগরি শিক্ষার সংখ্যা ও মানের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি। সে বিবেচনায় এ শিক্ষার উন্নয়নে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে।সুত্র সমকাল