কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে

প্রকাশিত: ১২:০৫ অপরাহ্ণ, রবি, ১১ এপ্রিল ২১

দেশে করোনা পরিস্থিতির চরম অবনতি হচ্ছে। শনিবার দেশে করোনায় একদিনে সর্বোচ্চ সংখ্যক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। ৭৭ জনের প্রাণহানির পাশাপাশি নতুন করে করোনা শনাক্ত হয়েছে আরও ৫ হাজার ৩৪৩ জনের। তবু আশ্চর্যজনকভাবে জনসাধারণের মাঝে ভয় বা সচেতনতা কোনোটাই পরিলক্ষিত হচ্ছে না। করোনা মোকাবিলায় বরং এক ধরনের উদাসীনতা দেখা দিয়েছে। করোনা মহামারী নতুন শক্তিতে ছড়িয়ে পড়ার মুহূর্তে এই উদাসীনতা মৃত্যুঝুঁকি বাড়াবে বলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন।

গত ৫ এপ্রিল থেকে দেশে করোনা নিয়ন্ত্রণে সরকার ঘোষিত এক সপ্তাহের বিধিনিষেধ চলছে। যেটি শেষ হবে ১১ এপ্রিল মধ্যরাতে। এদিকে টানা চার দিন বন্ধ থাকার পর বিধিনিষেধের পঞ্চম দিন খুলেছে বিপণি বিতান। এর আগে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বাড়ায় সরকার সারা দেশে এক সপ্তাহের কঠোর বিধিনিষেধ জারি করে ৪ এপ্রিল প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল। তাতে ১১ দফা বিধিনিষেধ ঘোষণার মাধ্যমে গণপরিবহন ও শপিং মল বন্ধ থাকার কথা বলা হয়। তবে রাজধানীর নিউ মার্কেটসহ সারা দেশের ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে শর্তসাপেক্ষে দোকান, শপিং মল, মার্কেট খোলার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতির মধ্যেও মার্কেট খোলার অনুমতির পরেই রাজধানী ঢাকার নিউ মার্কেট, গাউছিয়া, চাঁদনী চক, মালিবাগ, মৌচাক, শান্তিনগর এলাকার বিপণি বিতানগুলেতে ক্রেতা সমাগম ছিল ভরপুর। বিপণি বিতানে ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড় ছিল লক্ষণীয়। এখানে স্বাস্থ্যবিধি পালনে অনীহার বিষয়টিও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। এখানে লক্ষণীয় যে, বিধিনিষেধের সময়ে জরুরি সেবা ও পণ্যের প্রতিষ্ঠান ও দোকান খোলা ছিল, যাতে করে জনসাধারণ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সংগ্রহ করতে পারে। তারপরেও শপিংমল খোলার প্রথম দিনেই কেবল পোশাক কিনতে ক্রেতাদের উপস্থিতি করোনা সচেতনতায় জনসাধারণের ভূমিকা তলানিতে ঠেকেছে বলেই প্রতীয়মাণ হয়েছে। ইতিমধ্যে করোনা সংক্রমণ রোধে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের গঠিত করোনা সম্পর্কিত কারিগরি পরামর্শক কমিটি দুই সপ্তাহের সর্বাত্মক লকডাউনের প্রস্তাব দিয়েছে। এরপরেই সরকারের দুজন দায়িত্বশীল মন্ত্রী আগামী ১৪ তারিখ থেকে এক সপ্তাহের ‘কঠোর লকডাউন’ দেওয়ার চিন্তার কথা জানিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে চলমান বিধিনিষেধ ও সম্ভাব্য লকডাউন শুরুর মাঝের দুদিন, অর্থাৎ ১২ ও ১৩ এপ্রিল সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। নতুন লকডাউনের আগে এই দুদিনে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষের গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে সংক্রমণের ঝুঁকি ও ঊর্ধ্বগতি দেখা দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে সরকারের ১২ ও ১৩ এপ্রিল নিয়ে ভাবনা এখনো জানা যায়নি। সরকারের এই দোলাচলে কি গণপরিবহন বন্ধ থাকবে নাকি ১৪ জানুয়ারি থেকে প্রস্তাবিত ‘কঠোর লকডাউন’ কার্যকর করতে এবং প্রয়োজনে আরও বাড়াতে এসব মানুষকে বাড়ি যাওয়ার সুযোগ করে দেবে? এই বিষয়ে সরকারের দায়িত্বশীল দপ্তরকে দ্রুত ও কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। গত বছরের ২৫ মার্চ থেকে সারা দেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছিল সরকার। এ সময় আন্তঃজেলা ও দূরপাল্লাসহ সব ধরনের গণপরিবহন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। পরে করোনা সংক্রমণ বাড়তে থাকায় সে সময় সরকার ঈদের ছুটি অন্তর্ভুক্ত করে সাধারণ ছুটির মেয়াদ ৩০ মে পর্যন্ত বাড়িয়ে জনগণকে যে যেখানে আছে, সেখান থেকেই ঈদ উদযাপনের পরামর্শ দেয়। ঘরমুখো মানুষের স্রোত আটকাতে ঈদের আগে ও পরে সাত দিন জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মানুষের যাতায়াত আটকাতে ঘোষণা দিয়ে রাস্তায় প্রশাসন নেমেছিল। কিন্তু কোনোভাবেই মানুষকে আটকানো যায়নি। সামাজিক দূরত্ব না মেনেই ঘরমুখো মানুষকে ফেরাতে একপর্যায়ে ফেরি বন্ধ করেও পরে আবার চালু করতে হয়েছিল। তার ফলে গত বছরের জুন-আগস্ট পর্যন্ত সংক্রমণ ব্যাপকহারে বেড়েছিল। আবার এ বছর মার্চ থেকে করোনার এই ব্যাপক ও ভয়াল সংক্রমণের সময়ে ঈদ সামনে রেখে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলে তা সামাল দেওয়া দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়াবে।

করোনা মহামারীর এই সময়ে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ও দপ্তরের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি জনসাধারণেরও বেশ কিছু দায়িত্ব রয়েছে। নিজেদের মধ্যে যথেষ্ট সচেতনতা তৈরি করা না গেলে মৃত্যুর মিছিল কমিয়ে আনা সম্ভব হবে না। স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যাপারে ব্যক্তি পর্যায়ে একে অপরকে সজাগ করার পাশাপাশি ব্যক্তি, পরিবার ও পরিজনের সুরক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে। জনগণকে স্বাস্থ্যবিধি মানাতে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে প্রয়োজনে কঠোর থেকে কঠোর হতে হবে। চলমান করোনা দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকার ও জনসাধারণকে হাতে হাত ধরে এগিয়ে যেতে হবে।

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.