এসএসসি পাসের ডাক্তার বাবু

চিকিৎসা করেন চরের মানুষের

শিক্ষাবার্তা ডেস্কঃ চর। ধু-ধু মরু এলাকা। মাঝে মধ্যে মানুষের বসবাস। ছোট ছোট ঘর। ছোট ছোট পাড়া। শুষ্ক মৌসুমে বালির পথে। আর বর্ষাতে নৌকায় পাড়ায় পাড়ায় সহজেই যাতায়াত করা যায়। বালির সেই পথে হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা ক্লান্ত শরীর। পেশাগত কাজ শেষে ডাকাতমারী চরের ঘাটের উদ্দেশ্যে যাত্রা। বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার যমুনা নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা অসংখ্য চরের একটি ডাকাতমারী।

সঙ্গে আরও দুই গণমাধ্যমকর্মী। পথে দেখা মেলে শার্ট-প্যান্ট পরা এক ভদ্রলোকের। হাতে ডাক্তারদের ব্যবহারের ব্যাগ। গলায় আইডি কার্ড ঝুলানো। কাছাকাছি আসতেই কথা বলার চেষ্টা করি। ভদ্রলোক সায় দেন। পরিচয় পর্বে তার নাম জানালেন আব্দুল মান্নান ওরফে বাবু ডাক্তার। গাবতলী উপজেলার কলাকোপা গ্রামে তার বাড়ি। সারিয়াকান্দির চরের মানুষদের কিচিৎসা করেন তিনি। এক সময় নান্দিনীর চরে চেম্বার ছিল। এখন গ্রামের বাজারে চেম্বার। ফোন কলে বিভিন্ন চরে ছুটে যান। কোথায় ডাক্তারি পড়েছেন জানতে চাইলে বাবু ডাক্তার উত্তর দেন উপজেলা পর্যায়ে থেকে ডাক্তারি পড়েছেন। গলায় ঝোলানো আইডি কার্ডটি হাতে নিয়ে দেখা যায় ‘বাংলাদেশ ভিলেজ ডক্টরস ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন’ কর্তৃক আইডি কার্ডটি দেয়া হয়েছে। সেখানে সংগঠনের বগুড়া জেলা সভাপতি রফিকুল ইসলামের স্বাক্ষর রয়েছে। ইংরেজিতে সভাপতির নামের আগে লেখা গ্রাম ডাক্তার।

কীভাবে রোগীদের ওষুধ দেন বাবু ডাক্তারের উত্তর আমার ডাক্তারি পেশার বয়স ৪০ বছর চলছে। রোগী দেখতে দেখতে একটা অভিজ্ঞতা হয়েছে। পাতলা পায়খানা হলে স্যালাইনের সঙ্গে মেট্টো, টেট্টাসাইক্লিন বড়ি দেই। তাতেও কাজ না হলে অ্যান্টিবায়েটিক মেরে দেই। কাজ হয়ে যায়। আবার অনেক রোগী আছে টেবলেট বড়িতে কাজ না হলে স্যালাইন পুশ করে দেই। চরের মানুষদের এভাবেই সেবা দিয়ে আসছি দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে।

থানা লেবেল থেকে ডাক্তারি শেখা বাবু ডাক্তার কথার ফাঁকে বললেন, তিনি ১৯৭৭ সালে চন্দনবাইশা থেকে এসএসসি পাস করেছেন। রোগী দেখে ফি নেন না। ওষুধের দাম নেন। এতেই তার ভালো চলে যায়। পাইকারিতে ওষুধ কিনে রোগীদের কাছে খুচরা মূল্যে বিক্রি করেন। আন্দাজ করে অ্যান্টিবায়েটিক ব্যবহার কতোটা ভঙ্কর সেটা জানানে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, কিছু হবে না। হয়ও না। বরং তাড়াতাড়ি রোগী ভালো হয়ে যায়। চরের মানুষদের আসলে বাবু ডাক্তার ছাড়া করার কিছুই নেই। ডাক্তারা তো আর কষ্টের পথ বেয়ে পায়ে হেঁটে এভাবে রোগী দেখতে আসবেন না কখনো। আমাদের দেশের মহান ডাক্তারদের কাছে এমন প্রত্যাশা আহাম্মোকি ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। নিরুপায় চরের মানুষ। বিপদে যেই পাশে দাঁড়ায় সেই তাদের কাছে বিশ্বাসী হয়ে ওঠে। নেই স্কুল, নেই হাসপাতাল, নেই মসৃণ পথও। ভোটাধিকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ এসব প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের নাগরিকত্ব। রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধার ছিঁটে ফোটাও দেখা পান না হতভাগারা। ঝাড় ফুঁ, কবিরাজি চিকিৎসার উপরেই ভরসা এসব মানুষের। তড়িৎ চিকিৎসার অভাবে প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য মানুষ মারা যায় চরাঞ্চলে। বিশেষ করে প্রসূতি মায়েরা সন্তান প্রসবকালে অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর মুখে পতিত হয় বেশি। এসব মৃত্যুর দায় নেয়ার মতো কেউ নেই। কোনো দপ্তর নেই। মৃত্যুর পরিসংখ্যানও হয়তো কোনো দপ্তরের তালিকাতে পাওয়া যাবে না।

কিছু নামিদামি এনজিও চরের অসহায় মানুষদের ভাগ্য পরিবর্তনের নামে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রকল্প নিয়ে হাজির হয়। লোক দেখানো দায়সারা কিছু কাজ করে মিডিয়া কাভারেজ করেই তাদের প্রকল্প শেষ হয়। কোটি কোটি ডলার, টাকা এসব মানুষদের নামে এনজিওগুলো দেশ বিদেশ থেকে এনে নিজেদের ব্যক্তিগত ভাগ্যের পরিবর্তন করেন। যাদের দেখিয়ে এসব বরাদ্দ আনা হয় তারা হয়তো জানেই না তাদের মাথা অন্য কেউ বিক্রি করছে অবলীলায়।

এদিকে অ্যান্টিবায়োটিকের অবাধ ব্যবহার নিয়ে কথা হয় বগুড়ার একজন বিজ্ঞ চিকিৎসক ও ফোর আর আধুনিক হাসপাতালের ব্যবস্থাপক রেজাউল করিম (ডক্টর’স অব মেডিসিন)  জানান, অ্যান্টিবায়োটিক শরীরের খারাপ ব্যাকটোরিয়াগুলো ধ্বংসে কাজ করে থাকে। আর শরীরে যত রোগ হয় তার মাত্র ২৫ শতাংশ হয় ব্যাকটোরিয়াজনিত। বাকি ৭৫ ভাগ রোগ হয় মনোদৈহিক কারণে। সে ক্ষেত্রে কোনোভাবেই অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হয় না। সুতরাং সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার করা খুবই ভয়ঙ্কর।

তিনি বলেন, অ্যান্টিবায়োটিকের ডোজ মেইনটেইন করতে হয় রোগের ধরন অনুযায়ী। যদি কেউ সঠিকভাবে ডোজ শেষ না করে তাহলে ভবিষ্যতে তার শরীরে ওষুধ কাজ করবে না। শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাবে।

এই চিকিৎসক আরও বলেন, এখন গ্রাম ডাক্তার, কবিরাজ, ফার্মেসির ওষুধ ব্যবসায়ী এমনকি সাধারণ মানুষও অ্যান্টিবায়োটিক আন্দাজ করে কিনে খাচ্ছেন। বিষয়টি খুবই ভাবনার। অ্যান্টিবায়োটিকের সঠিক ব্যাবহার এখনই নিশ্চিত করতে না পারলে অদূরভবিষ্যতে বাংলাদেশের মানুষ হয়তো আরও বেশি রোগাক্রান্ত হয়ে পড়বে।

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/০১/২৩/২৩