এলসি জটিলতা, কমছে বিক্রি, কর্মী ছাঁটাই

 মো. আল আমিন।।

মূল্যস্ফীতির কারণে দেশে সব ধরনের পণ্যের দাম বেড়েছে। এতে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। পরিস্থিতি সামলাতে তালিকা কাটছাঁট করছেন তারা। এর প্রভাবে দোকানগুলোতে বিক্রির পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা। আর ক্ষতি এড়াতে বিকল্প হিসেবে কর্মী ছাঁটাইয়ের পথ বেছে নিয়েছেন এসব ব্যবসায়ী। জিনিসের দাম বেড়ে যাওয়ার পর থেকে দোকানে বিক্রির পরিমাণ অনেক কমেছে। প্রতিদিন যা আয় হচ্ছে তা দিয়ে দোকান ভাড়া ও অন্যান্য খরচ মেটাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে কর্মী ছাঁটাই ছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

এছাড়া ডলার সংকটের কারণে আমদানির জন্য লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) খোলা যাচ্ছে না। এতে ছোট ব্যবসায়ীরা জিনিস আমদানি করতে পারছেন না।

আমদানিনির্ভর পণ্যের দোকানগুলো অনেক ক্ষতির মুখে পড়েছে।
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন মানবজমিনকে বলেন, দোকানগুলোতে বিক্রির পরিমাণ অনেক কমেছে। বিভিন্ন দোকান থেকে আমাদের কাছে এমন অভিযোগ আসছে। বিক্রি কমে যাওয়ায় লাভের পরিমাণও অনেক কমেছে। এজন্য ক্ষতি এড়াতে ব্যাপক হারে কর্মী ছাঁটাই করা হচ্ছে। সামনে আরও কর্মী ছাঁটাই হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

তিনি জানান, রাত ৮টার মধ্যে দোকান বন্ধ করা হয়। এর মধ্যেই আবার লোডশেডিং হচ্ছে। ফলে ব্যবসায়ীরা সময় কম পাচ্ছেন। এতে তারা অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ বিষয়ে সকল ব্যবসায়ীর দাবি-অন্তত রাত ৯টা পর্যন্ত দোকান খোলার অনুমতি দেয়া হোক। এতে কিছুটা হলেও ক্ষতি কমবে। সময় বাড়ানোর জন্য প্রতিদিনই আমার কাছে বিভিন্ন জায়গা থেকে ব্যবসায়ীরা ফোন করেন। তিনি বলেন, সকল পণ্যের দামই বেড়েছে। কিন্তু মানুষের আয় বাড়েনি। নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের কাছে জমানো টাকা নাই। মানুষ আগে ভোগ্যপণ্য কিনবে-তারপর তো অন্যকিছু।

মিরপুরের শাহ্‌? আলী প্লাজার চন্দ্রবিন্দু’র প্রোপ্রাইটর সোহান আহমেদ ইকবাল বলেন, মানুষ মার্কেটে আসা কমিয়ে দিয়েছেন। বিক্রির পরিমাণও অনেক কমেছে। আগে যেখানে দৈনিক প্রায় ২৫ হাজার টাকার পণ্য বিক্রি করতাম এখন সেটা কমে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা হয়েছে। তিনি বলেন, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। কিন্তু পোশাকের দাম বেড়েছে। দাম বাড়লে বিক্রি কমে যায়। আর বিক্রি কমলে আমাদের লাভও কমে যায়। চলতি মাসে প্রায় ৫০ হাজার টাকা লস হবে বলে জানান এই ব্যবসায়ী।

আঁখি বিতানের প্রোপ্রাইটর মো. মাহাবুব আলম সবুজ বলেন, সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়েছে। এখন পর্যন্ত একটি পণ্যও বিক্রি হয়নি। মার্কেটে ক্রেতা কম। আগে দৈনিক যেখানে ৬০ হাজার টাকারও বেশি বিক্রি হতো, এখন সেটি ২০ হাজারে নেমেছে। ব্যবসার পরিস্থিতি ভালো যাচ্ছে না। তিনি বলেন, দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় হয়তো এমনটা হয়েছে। এ ছাড়া ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে জিনিসের দামও বেড়েছে। এটির কারণেও হয়তো বিক্রি কমেছে। তিনি বলেন, দোকানে দৈনিক ৭ হাজার টাকা খরচ আছে। এ টাকা এখন ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। সেই টাকাটা উঠাতে পারছি না। তিনি বলেন, রাত ৮টার আগে দোকান বন্ধ করে দিতে হচ্ছে। সময় যদি আরও বাড়ানো হতো তাহলে আমাদের জন্য সুবিধা হতো। কসমেটিকস্‌? ব্যবসায়ী এফএস গ্যালারির স্বত্বাধিকারী শফিকুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে ব্যবসার অবস্থা খুবই শোচনীয়। আগে লাভ কম হলেও খরচটা পোষানো যেত। এখন আর তা হচ্ছে না। কাস্টমার নাই। সেভাবে বিক্রিও হচ্ছে না। দোকান ভাড়া ২৫ হাজার টাকা। সার্ভিস চার্জসহ সব মিলিয়ে দোকানের ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা খরচ রয়েছে। দোকানে কর্মচারী আছে। তাদের ঠিকমতো বেতন দিতে পারছি না। ইতিমধ্যে দু’জন কর্মী ছাঁটাই করতে হয়েছে।

এলসি খুলতে পারছেন না ছোট ব্যবসায়ীরা: চীন থেকে স্টেশনারিজ পণ্য এনে রাজধানীর বিপণিবিতানগুলোয় সরবরাহ করতেন ব্যবসায়ী আশরাফ। এজন্য প্রতিমাসেই কয়েক কোটি টাকার ঋণপত্র (এলসি) খুলতে হয় তাকে। এতদিন ব্যাংকাররাই তার কাছে আসতেন এলসি খোলার তদবিরে। এখন ব্যাংকারদের কাছে ধরনা দিয়েও তিনি এলসি খুলতে পারছেন না। আশরাফ বলেন, আমরা অধিকাংশ পণ্যই চীন থেকে আমদানি করি। কিন্তু এলসি খুলতে না পারার কারণে গত কয়েক মাস ধরে আমদানি করতে পারছি না। এতে ব্যবসায় অনেক ক্ষতি হচ্ছে। আগের থেকে পণ্যের যেসব অর্ডার ছিল সেগুলো বাতিল করতে হয়েছে। তিনি জানান, আগে যেখানে খুব সহজেই এলসি খোলা যেত, এখন বার বার যোগাযোগ করেও খুলতে পারছি না।
আরেক ব্যবসায়ী জাবেদ আহমেদ বলেন, কয়েক মাস ধরে এলসি খুলতে পারছি না। কবে নাগাদ খুলতে পারবো সেটাও বুঝতে পারছি না। এলসি খুলতে না পারায় আমরা যে ক্ষতির সম্মুখিন হয়েছি সেটা বলে শেষ করা যাবে না। আমাদের কাছে যে সাপ্লাই অর্ডার ছিল সেগুলো বাতিল করতে হয়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, ডলার সংকটের কারণে ছোট ও মাঝারি মানের আমদানিকারকরা এলসি খুলতে পারছেন না। কিন্তু বড় কোম্পানিগুলো ঠিকই এলসি খুলতে পারছেন। এখানে সরকারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পর্যায়ক্রমে হলেও ছোট ও মাঝারি মানের ব্যবসায়ীদের এলসি খোলার সুযোগ করে দিতে হবে। যাতে বাজার প্রক্রিয়াটা চলমান থাকে। এতে ছোট ব্যবসায়ীরা টিকে থাকতে পারবেন।