এমপি সোহেল হাজারীর শিক্ষায় জালিয়াতি

শিক্ষাবার্তা ডেস্কঃ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য নির্বাচন কমিশনে দেওয়া হলফনামায় শিক্ষাগত যোগ্যতা দেখিয়েছেন এইচএসসি পাস। কিন্তু অন্য সব ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা দেখান এমএ। অবাক করার মতো তথ্য—একই বছরে এসএসসি ও দাখিল দুটি পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নেন তিনি। শুধু তাই নয়, এইচএসসি পাসের আগেই হয়েছেন দু-দুটি কলেজ ছাত্র সংসদের সহসভাপতি (ভিপি)। উভয় ক্ষেত্রেই শিক্ষা সনদ জমা না দিয়ে ক্ষমতার দাপটে ভুয়া ভর্তি দেখিয়ে নির্বাচনে অংশ নেন তিনি।

শিক্ষা জালিয়াতির এমন দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী ব্যক্তিটি দেশের আইনসভা জাতীয় সংসদের সদস্য। টাঙ্গাইল-৪ (কালিহাতী) থেকে নির্বাচিত সেই সংসদ সদস্যের নাম হাসান ইমাম খান; সোহেল হাজারী নামেই তিনি বেশি পরিচিত।

সোহেল হাজারীর দেওয়া তথ্যমতে, তিনি এসএসসি পাস করেছেন ১৯৮৭ সালে। এর ৯ বছর পর পাস করেছেন এইচএসসি। তবে একই বছরে তিনি এসএসসি ও দাখিল পরীক্ষায় অংশ নেন। এসএসসিতে দুটি বিষয়ে ফেল করলেও দাখিলে পাস করেন। দুটি পরীক্ষা একই সময়ে অনুষ্ঠিত হলেও আলাদা রেজিস্ট্রেশনে তিনি এমন অসাধ্য সাধন করেছেন।

জানতে চাইলে সোহেল হাজারী বলেন, এ-সংক্রান্ত বিষয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই। আদালতে রিট পিটিশন হয়েছে, বিষয়টি আদালতই দেখবেন।

প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, সোহেল হাজারী পড়াশোনা করেছেন গোপালদীঘি কে পি ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়ে। তিনি নবম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগে ১৯৮৫ সালে রেজিস্ট্রেশন করেন। জন্মতারিখ ১৯৭২ সালের ২২ জুলাই। ১৯৮৭ সালে অনুষ্ঠিত এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হন। স্কুল থেকে প্রাপ্ত তথ্য এমনটিই বলছে। সোহেল হাজারীর ব্যবহৃত বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমেও তথ্য দেওয়া রয়েছে তিনি ওই স্কুলের ছাত্রলীগের সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তবে একই বছর ছাতিহাটী গ.র.ম দাখিল মাদ্রাসা থেকে দাখিল পরীক্ষায় অংশ নিয়ে দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন। একই বছরে দুটি ভিন্ন বোর্ডে রেজিস্ট্রেশন করে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ না থাকলেও সোহেল হাজারী সেই অসাধ্য সাধন করেছেন। তবে সেখানে তার জন্মতারিখ ভিন্ন; ১৯৭৩ সালের ১ জানুয়ারি।

নির্বাচনে মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দেওয়া হলফনামার তথ্যমতে, সংসদ সদস্য সোহেল হাজারী ১৯৯৬ সালে এইচএসসি পাস করেন শমসের ফকির কলেজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান থেকে। তবে এইচএসসি পাসের চার বছর আগেই ১৯৯১-৯২ শিক্ষাবর্ষে কাগমারী সরকারি এম এম আলী কলেজের ছাত্র সংসদের সহসভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন। ছাত্র সংসদের অনার বোর্ডে এমন তথ্য রয়েছে।

নির্বাচন করার যোগ্যতা হিসেবে কলেজের ছাত্র সংসদের গঠনতন্ত্রের ৬(ক) ধারায় বলা রয়েছে, উচ্চ মাধ্যমিক ছাড়া সব শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য এ নির্বাচন উন্মুক্ত। সেক্ষেত্রে ভিপি নির্বাচিত হওয়ার চার বছর পর তিনি এইচএসসি পাস করেন। শুধু তাই নয়, সোহেল হাজারীর এসএসসি পাসের সাল ১৯৮৭ সাল, এর প্রায় ৯ বছর পর তিনি এইচএসসি পাস করেন। কলেজ ছাত্র সংসদের গঠনতন্ত্রে সুযোগ না থাকলেও এইচএসসি পরীক্ষা দেওয়ার আগেই কীভাবে তিনি ভিপি নির্বাচনে অংশ নিলেন, সেই প্রশ্ন তুলেছেন টাঙ্গাইলের অনেক আওয়ামী লীগ নেতা।

তবে ওই সময়ে কলেজের রাজনীতিতে সক্রিয় বেশ কয়েকজন জানিয়েছেন, মূলত ছাত্রত্ব দেখানোর জন্য কলেজে জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছিলেন সোহেল হাজারী। সেই সময় ভর্তিসহ কোনো প্রক্রিয়ায় ডিজিটাল ব্যবস্থা না থাকায় ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে তিনি কলেজের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে অংশ নেন। যদিও তার শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল না।

জালিয়াতির এখানেই শেষ নয়, ১৯৯৪ সালে সোহেল হাজারী ভর্তি হন করটিয়ার সরকারি সা’দত কলেজে। এরপর ১৯৯৬-৯৭ সালে অনুষ্ঠিত ছাত্র সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে জয়ী হন ভিপি পদে। যদিও সোহেল হাজারীর বক্তব্য অনুসারে তিনি এইচএসসি পাস করেছেন ১৯৯৬ সালে। তবে সা’দত কলেজের রেকর্ডরুম ঘেঁটে সোহেল হাজারীর ভর্তি সংক্রান্ত কোনো কাগজপত্র পাওয়া যায়নি।

১৯৯৬-৯৭ সালে ছাত্র সংসদের নির্বাচিত একজন ছাত্র প্রতিনিধি সোহেল হাজারীর শিক্ষাগত যোগ্যতার আদ্যোপান্ত বলেন। তবে তিনি নাম প্রকাশ করতে চাননি। যদিও বক্তব্যের রেকর্ডিং সংরক্ষিত রয়েছে কালবেলার কাছে। তিনি বলেন, মূলত প্রভাব খাটিয়ে তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন। যদিও তার কোনো কাগজপত্র নেই। শিক্ষাগত যোগ্যতা নেই। এটি কলেজের সবাই জানেন।

ওই সময়ে কলেজের একজন শিক্ষক বলেন, ১৯৯৪ সালের দিকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ছিলেন মুজিবুর রহমান। তার মাধ্যমে কলেজে ভর্তি হন সোহেল হাজারী। এরপর নির্বাচন করেন। তার কোনো কাগজপত্র নেই। তিনি আদৌ এইচএসসি পাস করেছেন কিনা, এটিও কেউ জানেন না।

ভর্তির সময় পাশে ছিলেন—এমন একজনও একই কথা বলেন। নাম প্রকাশ করতে চাননি ওই ব্যক্তিও। যদিও বক্তব্যের রেকর্ডিং সংরক্ষিত রয়েছে কালবেলার কাছে। তিনি বলেন, হঠাৎ এসে বললেন ভর্তি হবেন। আমরা মুজিবুর স্যারকে ধরলাম। ভর্তি নিলেন। তখন ভর্তি করতে এত ঝামেলা ছিল না। ভর্তি নিয়েছেন। তবে কোনো কাগজপত্র নেই। কলেজে এখনো কিছু নেই।

কাগমারী সরকারি এম এম আলী কলেজ এবং করটিয়া সরকারি সা’দত কলেজের বেশ কয়েকজন শিক্ষক এবং কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তারা সোহেল হাজারীর শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনো কাগজপত্রের সন্ধান দিতে পারেননি।

অনুসন্ধান বলছে, সোহেল হাজারী হলফনামায় তথ্য দিয়েছেন তিনি এইচএসসি পাস। তবে বিভিন্ন স্থানে দিচ্ছেন তার শিক্ষাগত যোগ্যতা এমএ পাস। বছর তিনেক আগে সোহেল হাজারী কালিহাতী কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি ছিলেন। ওই সময় গভর্নিং বডির মনোনয়ন প্রাপ্তির জন্য কলেজের অধ্যক্ষ কর্তৃক জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদনপত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা এমএ উল্লেখ করেন। এ ছাড়া টাঙ্গাইল সমিতির সদস্য পরিচয়ের ডিরেক্টরিতেও তার শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে এমএ উল্লেখ রয়েছে। এর বাইরে বিভিন্ন সভা-সমাবেশেও তিনি নিজেকে এমএ পাস বলে উল্লেখ করেছেন।

সোহেল হাজারী যখন করটিয়া সরকারি সা’দত কলেজের ভিপি, তখন ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) ছিলেন কামরুজ্জামান রিপন। তিনিও আদ্যোপান্ত বলেন। রিপন বলেন, তৎকালীন ভিপি সোহেল হাজারী সাদ’ত কলেজে ১৯৯৩-৯৪ সালে ভর্তি হয়েছিলেন। এরপর আমরা একই প্যানেলে ১৯৯৬-৯৭ সালে ছাত্রসংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করি।

তিনি বলেন, অনেকেই সোহেল হাজারীর ভর্তি নিয়ে সন্দেহ পোষণ করেন। কাগজপত্র নেই এমন কথা বলেন। তবে আমার কাগজপত্র আছে। অফিসে খোঁজ নিলেই সব কাগজ পাওয়া যাবে। ভর্তি হলে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট অফিসে কাগজপত্র থাকবে।

তবে দুটি কলেজেই কাগজপত্রের খোঁজ করা হয়। কোনো কলেজেই ভর্তি সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায়নি। কর্মচারীরা জানান, ভর্তি সংক্রান্ত সব কাগজপত্র কলেজে সংরক্ষিত থাকে। বেশি পুরোনো হলে রেকর্ডরুমে রাখা হয়। ওই সময়ে যারা কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন, তাদের সবার কাগজপত্র পেলেও হাসান ইমাম খানের কোনো কাগজপত্র নেই।

শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে একজন সংসদ সদস্যের এমন জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়ার বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ জানিয়ে জাতীয় সংসদের স্পিকার বরাবর চিঠি দিয়েছেন একজন আওয়ামী লীগ নেতা। কালিহাতীর বাংরা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. মোখলেসুর রহমান স্পিকার বরাবর এ চিঠি দেন। ডাকযোগে পাঠানো চিঠিটি স্পিকার অফিস গ্রহণ করলেও এখনো এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সেখানে মোখলেসুর রহমান দাবি করেন, সংসদ সদস্য হাসান ইমাম খানের (সোহেল হাজারী) শিক্ষাগত যোগ্যতা ভুয়া। আর ভুয়া তথ্যের মাধ্যমে একজন নাগরিক জাতীয় সংসদের সদস্য হতে পারেন না।

মোখলেসুর রহমান বলেন, সোহেল হাজারী জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে শিক্ষাগত যোগ্যতা দেখিয়েছেন। একই বছরে ভিন্ন দুটি রেজিস্ট্রেশন নম্বরে এসএসসি ও দাখিল পরীক্ষা দিয়েছেন। এসএসসি পরীক্ষায় ফেল করেছেন। এরপর জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে দাখিল পাস দেখিয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, আমি আদালতে এ বিষয়ে রিট পিটিশন করেছি। আদালত বিষয়টি আমলে নিয়ে সোহেল হাজারীর কাছে জানতে চেয়েছেন সংসদ সদস্য পদ কেন অবৈধ হবে না। কিন্তু সোহেল হাজারী এখনো আদালতে তার শিক্ষাগত যোগ্যতার স্বপক্ষে কোনো তথ্যপ্রমাণ দাখিল করতে পারেননি। মূলত প্রতিটি পদে জালিয়াতি করেছেন সোহেল হাজারী।

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/০১/১৩/২৩