এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কার্যকর করা কেন প্রয়োজন

প্রকাশিত: ৭:১৫ পূর্বাহ্ণ, মঙ্গল, ২৪ নভেম্বর ২০

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী।। 

সদ্য সমাপ্ত সংসদ অধিবেশনে সংসদ নেত্রী এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সম্পর্কে কিছু কথা বলেছেন যা যৌক্তিক এবং সঠিক। আমাদের দেশে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এখন প্রায় ৩০ হাজারের কাছাকাছি। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, অনেক এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত সংখ্যক শিক্ষার্থী নেই। তেমন এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোই সরকারিকরণের দাবি করছে। তিনি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার মান বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।

প্রধানমন্ত্রীর এই আহ্বানটি খুবই গুরুত্ব বহন করছে। কেননা বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর দেশের মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক এবং কলেজ শিক্ষার সিংহভাগ শিক্ষক-শিক্ষার্থীর নির্ভরশীলতা এখন নিশ্চিত হয়ে আছে। সেই তুলনায় সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এই পর্যায়গুলোতে সংখ্যায় খুব বেশি নয়, মোট শিক্ষার্থীর ৫ থেকে ৭ শতাংশ সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রয়েছে। এমপিওভুক্ত স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় এখন সরকারি শিক্ষা বাজেটের বড় অংশই শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন ও উন্নয়ন খাতে ব্যয় করা হয়।

সরকারি এবং বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন স্কেলে সমতা বিরাজ করছে, তবে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা বেতন স্কেলের মূল বেতন শতভাগ, বোনাস, চিকিৎসা ভাতা এবং পেনশন গ্র্যাচুয়িটি লাভ করে থাকেন। শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতনের বাকি অংশ প্রতিষ্ঠান বহন করার কথা। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান সেটি দেয়ার সক্ষমতা রাখে, আবার অনেক প্রতিষ্ঠানই শিক্ষার্থী স্বল্পতার কারণে তা প্রদান করতে পারে না। এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান ও পরিবেশ নিয়ে শিক্ষার্থীদের নির্ভর করা ও সন্তুষ্টি খুব বেশি আছে বলে মনে হয় না।

এর কারণ হচ্ছে এমপিওভুক্তকরণ প্রক্রিয়াটি শুরু থেকেই সুষ্ঠু, দুর্নীতিমুক্ত ও প্রভাবমুক্তভাবে হয়ে উঠতে পারেনি। সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা অধিদপ্তর শুরু থেকে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা অবস্থান সম্পর্কে সুস্পষ্ট কোনো লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারেনি। সে কারণে শুরু থেকেই এমপিওভুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে বেশিরভাগ স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ এবং শিক্ষা বোর্ড ও শিক্ষা অধিদপ্তরের দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সহযোগিতা নিয়েই শুরু করেছিল। এই ধারাটি এতদিন পর্যন্ত শুধু অব্যাহতই থাকেনি, অত্যন্ত বিস্মৃতও হয়েছিল।

অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিষ্ঠিত, মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বাদ দিয়ে ভুঁইফোঁড় রাতারাতি গজিয়ে ওঠা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকায় যুক্ত হয়েছে, সুযোগ-সুবিধা লাভের সুযোগ পেয়েছে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আগে শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ বিধিও ততটা স্বচ্ছ ছিল না, প্রয়োগের ক্ষেত্রেও প্রভাবশালীদের ইচ্ছা-অনিচ্ছা, অর্থের লেনদেন প্রায় শতভাগ কার্যকর ছিল।

সে কারণে বেশিরভাগ এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অপেক্ষাকৃত মেধাবী, যোগ্য, অভিজ্ঞ, দক্ষ প্রার্থীরা শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ লাভে বঞ্চিত হয়। এতে বেশিরভাগ এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান চরমভাবে উপেক্ষিত হয়েছে। এর ফলে মেধাবী অবস্থাপন্ন শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা সরকারি স্কুল, কলেজ অথবা ব্যক্তিমালিকানাধীন নামি-দামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানমুখী হতে বাধ্য হয়েছে। ফলে শিক্ষা ব্যবস্থায় মুষ্টিমেয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর বেশিরভাগ মেধাবী শিক্ষার্থী ভর্তির চাপ বেড়ে যায়, যা ওইসব প্রতিষ্ঠানকেও দুর্নীতিগ্রস্ত করতে ভূমিকা রাখে।

অন্যদিকে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা মোটেও আশানুরূপ নয়। এমনকি গ্রামাঞ্চলেও এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর চেয়ে ব্যক্তি উদ্যোগে পরিচালিত কোনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের ভিড় পরিলক্ষিত হচ্ছে। বর্তমানে মফস্বল এলাকাতেও অনেক অভিভাবক মানসম্মত শিক্ষার জন্য নিকটবর্তী উপজেলা বা জেলা শহরে বাসা ভাড়া করে থাকেন, ছেলেমেয়েদের অপেক্ষাকৃত নামি-দামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ানোর চেষ্টা করেন। বেশিরভাগ এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মানসম্মত শিক্ষাদানে খুব একটা কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারছে না।

এক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে দুটি। এক. মানসম্মত শিক্ষকের অভাব, দুই. দুর্নীতিগ্রস্ত ও প্রভাবশালী পরিচালনা পরিষদÑ যারা শিক্ষা অধিদপ্তরের বিধিবিধান সম্পর্কেই ন্যূনতম জ্ঞান রাখে না। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল, পরিচালনা পরিষদের অনিয়ম, অদক্ষতা ইত্যাদি এলাকায় বেশ প্রচারিত বিষয় হয়ে আছে। তাই এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পেছনে সরকারি অর্থ ব্যয় খুব বেশি কাজে আসছে না। দীর্ঘদিন থেকেই এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভেতরে মানসম্মত শিক্ষাদানের সুযোগ নষ্ট হয়ে যাওয়ার পরও শিক্ষা মন্ত্রণালয় হাজার হাজার এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে মানসম্মত শিক্ষাদানের পরিবেশ প্রতিষ্ঠায় গুণগত পরিবর্তন সাধনে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারেনি।

এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক নিয়োগের বিধান পরিচালনা পরিষদের হাত থেকে সরিয়ে এনে এনটিআরসি নামক একটি প্রতিষ্ঠানকে দেয়ার পর শিক্ষক নিয়োগের কিছুটা সুদিন ফিরে এসেছে। তবে এমপিওভুক্ত বিশাল এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কার্যকর, অর্থবহ, গতিশীল এবং মানসম্মত শিক্ষাদানে কার্যকর করতে হলে মৌলিক আরো কিছু পরিবর্তন সাধন করতেই হবে। এক্ষেত্রে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের বদলির নিয়ম চালু করা জরুরি হয়ে পড়েছে। একটি সুষ্ঠু কার্যকর বদলি নিয়ম এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রণয়ন ও কার্যকর করার ফলে বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এতদিন যেভাবে চলেছে তাতে একটা মৌলিক পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিশেষত শিক্ষকদের বদলি যথাযথ নিয়মে কার্যকর করা গেলে অনেকগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই হয় বাদ পড়ে যাবে নতুবা নতুনভাবে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসতে পারে। যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় শিক্ষার্থী ছাড়া নানারকম প্রভাব কাটিয়ে এমপিওভুক্ত হয়েছে সেখানে এখন সরকারের যে অর্থ খরচ হয় তা অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়। এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের চাহিদা মোতাবেক অন্যত্র বদলি করা হলে শিক্ষকরা নতুন প্রতিষ্ঠানে নিজেকে তৈরি করার জন্য সুযোগ পেতে পারেন।

অনেক এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক স্বল্পতায় ভোগে। এসব প্রতিষ্ঠানের চাহিদা পূরণের জন্য যেসব প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থী স্বল্পতায় রয়েছে সেগুলোর শিক্ষক-কর্মচারীদের দিয়ে পূরণ করা যেতে পারে। আমার ধারণা একটি কার্যকর এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের বদলি নিয়ম ক্রিয়াশীল হলে বিপুলসংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আপনাআপনি বাদ পড়ে যেতে পারে। এছাড়া নতুন ম্যাপিং পদ্ধতি চালু করে শিক্ষাব্যবস্থায় ভারসাম্য সৃষ্টি করা প্রয়োজন। দেশে এখন প্রয়োজনের চেয়েও অনেক বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিভিন্ন অঞ্চলে রয়েছে আবার কোনো কোনো অঞ্চলে চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকায় সেখানকার শিক্ষার্থীদের শিক্ষার সুযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বাংলাদেশে শুরু থেকেই যত্রতত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার একটি নিয়ম চালু হয়ে আছে। প্রয়োজন হচ্ছে যেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি করা দরকার কেবল সেখানেই উপজেলা ও জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের পূর্বানুমতি নিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। তবে কোনো অবস্থাতেই শিক্ষক নিয়োগ এনটিআরসির বিধানের বাইরে দেয়া উচিত হবে না। সরকারি শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে এখন থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ার প্রবণতায় রাশ টেনে ধরতে হবে। যত্রতত্র অপ্রয়োজনীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার নামে যা চলছে তা হতে দেয়া উচিত নয়। বর্তমানে দেশে বেশকিছু অঞ্চলে যার যার ইচ্ছামতো যেখানে-সেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামে ঘর ভাড়া করে প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকদের প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে আসা হয়।

কয়েক বছরের মধ্যেই এসব সাইনবোর্ডসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান নানা ধরনের দুর্নীতি, কোচিং ব্যবসা, পরীক্ষা পাসের প্রলোভন ইত্যাদি দেখিয়ে যে অবস্থাটি তৈরি করে তাতে লেখাপড়ার সার্বিক পরিবেশ বিঘ্নিত হয়। করোনার এই সময়েও গ্রামেগঞ্জে অনেক জায়গায় তথাকথিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নানাভাবে স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার নামে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এমনিতে গ্রামেগঞ্জে বিপুলসংখ্যক মূলধারার বাইরের মাদ্রাসা নামধারি প্রতিষ্ঠান এখন বেশ সক্রিয়। অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের নিকটবর্তী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে এসব প্রতিষ্ঠানে নিয়ে আসছেন।

সর্বত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে যা চলছে তা এক কথায় অরাজকতা হিসেবে অভিহিত করা যায়। এমনটি চলতে দেয়া উচিত নয়। এর জন্য সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে তৃণমূলের শিক্ষা কার্যক্রম সম্পর্কে সঠিক তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করতে হবে এবং বর্তমানে বিরাজমান অবস্থার ওপর ভিত্তি করে আগামীদিনের চাহিদা অনুযায়ী একটি মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার নীতি ও কৌশল প্রণয়ন করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী : অধ্যাপক (অবসরপ্রাপ্ত), ইতিহাসবিদ ও কলাম লেখক।

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.