এনসিটিবি: অনিয়ম ও অদক্ষতার সেরা উদাহরণ

আবু তাহের খানঃ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিশু-কিশোরেরা তাদের পাঠ্যপুস্তক খুলে প্রথমেই যে প্রতিষ্ঠানের নামটি দেখতে পায় তা হলো, জাতীয় পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। ফলে এ বয়সে তারা আর কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম না জানলেও এনসিটিবির নাম বেশ ভালো করেই জানে। সেই সাথে তারা এটাও জানে যে, উক্ত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রণীত ও প্রকাশিত প্রতিবছরের পাঠ্যপুস্তকেই অসংখ্য ভুল থাকে এবং এরমধ্যে এমন কিছু ভুল থাকে যা সাধারণ মানুষকেতো বটেই– ওই কমবয়সী শিশু-কিশোদের মনেও তাদের নিজেদের অজান্তেই এক ধরনের দুঃখ ও কষ্ট নীরবে রেখাপাত করে থাকে। আর ওই বয়সে তাদের মনের উপর এ ধরনের রেখাপাত ঘটলে এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া-যে অশুভ হতে বাধ্য, তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।

এ শিশু-কিশোরেরা রাষ্ট্র ও সমাজকে একটু একটু করে বুঝতে শেখার প্রাথমিক পর্যায়েই জানতে শুরু করে যে, তাদেরকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করার জন্য উপযুক্ত পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করে যথাসময়ে তা তাদের হাতে তুলে দেয়ার দায়িত্ব যাদের উপর ন্যস্ত, তারা নিজেরাই যথেষ্ট মানবিক গুণাবলী ও দায়িত্বশীল আচরণের অধিকারী নন। আর এরূপ দেখে দেখে খুব স্বাভাবিকভাবেই সচেতন ও অবচেতনভাবে তাদের মনের উপর এসবের একটি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে এবং এর ভেতর দিয়ে তার মধ্যে এমন এক হীন মূল্যবোধ তৈরি হচ্ছে যে, দীর্ঘ ভবিষ্যতের পুরো সময়জুড়েই তার উপর কোনো না কোনোভাবে এর নেতিবাচক প্রভাব সক্রিয় থাকছে। ফলে বর্তমান প্রজন্মের মানুষদের মধ্যে মূল্যবোধের ঘাটতি দিনে দিনে আরো বেড়ে যাচ্ছে বলে যে অভিযোগ ওঠছে, তার পেছনে এনসিটিবির নানা দুর্নীতি, অদক্ষতা ও অযোগ্যতাও বহুলাংশে দায়ী বৈকি! কিন্তু বিষয়টিকে কেউ কি কখনো এ দৃষ্টিকোণ থেকে ভেবে দেখেছেন?

পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন, মুদ্রণ ও বিতরণই এনসিটিবির মূল কাজ এবং এর বাইরে তার কাজের পরিসর খুবই সামান্য। অর্থাৎ সারাবছর মূলত এই একটি কাজই তাদেরকে করতে হয়। ফলে এ কাজে তাদের দক্ষতা ও বিশেষজ্ঞতায় কোনোভাবেই কোনো ঘাটতি থাকার কথা নয়। কিন্তু বাস্তবে প্রায় প্রতিছরই এ ঘাটতি এত প্রকটভাবে ও অসহনীয় মাত্রায় দেখা যায় যে, এ নিয়ে কথা বলাটাও চরম বিরক্তিকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মনে রাখা দরকার যে, আর দশটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি, অনিয়ম ও অদক্ষতার সাথে এনসিটিবির এ জাতীয় কাণ্ডের মৌলিক পার্থক্য হচ্ছে এই যে, অন্য অনেক প্রতিষ্ঠানের এ জাতীয় কর্মকাণ্ডের ফলে অনেক ক্ষেত্রেই হয়তো বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হয়ে থাকে। কিন্তু এনসিটিবির ক্ষেত্রে এটি শুধু আর্থিক ক্ষতির কারণ নয়– তারচেয়েও অনেক বড় কিছু। তাদের এ জাতীয় আচরণের কারণে শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীদের পুরো মনোকাঠামোটিই এমন নানা হীনতা দিয়ে ঘিরে থাকছে যে, এর নেতিবাচক প্রভাব সারাজীবন ধরেই তাদেরকে ছায়ার মতো তাড়িয়ে বেড়াবে।

এনসিটিবি এ বছর জানুয়ারির এ পর্যন্ত সময়ে শিক্ষার্থীদের হাতে সব বই তুলে দিতে পারেনি। কিন্তু এটি আবার স্বীকারও করছে না যে তারা তা পারছে না। বইগুলোর মুদ্রণকারী ছাপাখানাগুলো জানাচ্ছে, এখনও ৪০ শতাংশ বই ছাপার কাজ বাকি। আছে। অথচ এনসিটিবি নিরন্তর বলে যাচ্ছে যে, ‘সব শিক্ষার্থীর কাছে সময়মতো পৌঁছে দেয়া হবে’। তাহলে এটি এক ধরনের অসত্যাচার হয়ে গেল না কি? আর শিক্ষার মতো বিষয়ের তত্ত্বাবধান ও পরিধারণের দায়িত্ব যাদের উপর ন্যস্ত তারা যদি অসত্য কথা বলেন, তাহলে শিক্ষার্থীরা সত্যকে ধারণ করে এগুবার পথে আশ্রয় চাইবে কার কাছে?

প্রায়ই এ অভিযোগের কথা শোনা যায় যে, পুস্তক মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যাদেশের ব্যত্যয় ঘটিয়ে নিম্নমানের কাগজ-কালিতে বই ছেপে আরো অধিক নিম্নমানের বাধাই শেষে সেগুলো এনসিটিবির কছে সরবরাহ করছে এবং তারা তা আনন্দের সাথেই গ্রহণ করে নির্দ্বিধায় সব বিল পরিশোধ করে যাচ্ছে। এ নিয়ে গণমাধ্যমে ছোটবড় কিছু খবর প্রকাশিত হলে দিন কয়েক তারা খানিকটা অস্বস্তিতে ভোগেন বটে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এসবে তাদের তেমন কিছুই যায়-আসে না। বরং যথারীতি মুুদ্রণপ্রতিষ্ঠানের সব বিল পরিশোধ করে পরের বছরের জন্যও তারা একই ধারায় এগুবার প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকেন। তবে মাঝখানে বিশ্রামের নিদ্রাটা এতোখানিই আয়েশি হয়ে পড়ে যে, নিদ্রাভঙ্গের পর নতুন বছরের পুস্তকসমূহের মুদ্রণাদেশ দিতে যেয়ে আবারো সেই একই বিলম্ব এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শিক্ষার্থীদের হাতে বই না পৌঁছার ঘটনার পুনরাবৃত্তি।

এ প্রসঙ্গে হলফ করে বলতে পারি, কার্যাদেশ অনুযায়ী যথাযথ মান রক্ষা করে সময়মতো বই সরবরাহে ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানসমূহের বিরুদ্ধে যদি যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা (বিল থেকে বড় অংকের অর্থ কেটে রাখা, স্থায়ীভাবে কালো তালিকাভুক্ত করা ইত্যাদি) গ্রহণ করা হতো, তাহলে ভবিষ্যতে কখনোই তারা আর একইরূপ অসদাচরণ করতে সাহসী হতো না। কিন্তু এনসিটিবির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে ওইসব মুদ্রণপ্রতিষ্ঠানের এতোটাই নিবিড় সম্পর্ক যে, সে সম্পর্কের সাথে এ ধরনের শাস্তি একেবারেই যায় না। ফলে ঘটনা যা হবার তাই হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও এ ধারায় সহসা যতি পড়বে বলে মনে হয় না। আর সেটা হলে সামনের বছরগুলোতেও-যে শিক্ষার্থীরা সময়মতো বই পাবে না–তা প্রায় নিশ্চিত করেই বলা যায়।

পাঠ্যপুস্তক এদেশে একসময় নির্ভুল ও ত্রুটিমুক্তভাবেই প্রকাশিত হতো এবং সে কাজটি এনসিটিবি দ্বারাই সম্পন্ন হতো। তো সেই একই  এনসিটিবির দশা আজ এমন হলো কেন? কেন আজ এর পরতে পরতে দুর্নীতি, অনিয়ম ও অদক্ষতা? কেন এর কোনো স্তরেই কোনো জবাবদিহিতা নেই? এসব প্রশ্নের জবাব অনেক দীর্ঘ। তবে সংক্ষেপে শুধু এটুকু বলা যায় যে, এনসিটিবিকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা যাদের দায়িত্ব তাদের নিজেদের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত জবাবদিহিতার অভাবের কারণেই এমনটি ঘটেছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা যেতে পারে। কিন্তু সেটি কি সহসা হবে? যদি না হয় তাহলে পাঠ্যপুস্তকের বিষয়বস্তু, বিন্যাস, তথ্য, বানান, মুদ্রণ, বিতরণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে বর্তমানে অতিগর্হিত ধারার যেসব অনিয়ম, অদক্ষতা, ভুলভ্রান্তি ও ত্রুটিবিচ্যুতি চলমান রয়েছে, আরো কিছুকাল হয়তো সেটাই আমাদেরকে সয়ে যেতে হবে। কিন্তু তা সইতে যেয়ে নতুন প্রজন্মের শিশু-কিশোরদের সম্ভাবনাময় জীবনে যে ক্ষতি আমরা ডেকে আনছি, তার দায় কে নেবে?

লেখক, পরিচালক, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি 

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/০১/১৩/২৩