একটি বই : একটি বদলে যাওয়া

।। ডক্টর মুহাম্মদ কামাল উদ্দিন।।

বহুদিন একটি বই আমার জন্য এনে রেখেছেন সময়-সুযোগ মিলছে না বলেই হাতে আসেনি। অবশেষে বইটি উপহার সূত্রে আমার হাতে। প্রথমত এমন একটি বই উপহার হিসাবে হাতে দেয়ার জন্য আমাদের বোন অধ্যাপক নাজমুনকে বিশষ কৃতজ্ঞতা। সত্যিই আমি সমৃদ্ধ হয়েছি। মুগ্ধ হয়েছি। হাতে পাওয়ার স্বল্প সময়ের মধ্যে ১১টি অধ্যায় পড়তে পেরেছি।

শিক্ষকতা পেশা ব্যতিক্রমী নেশা। মুহাম্মদ ইয়াহইয়া আখতার। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের সন্মানিত শিক্ষক। তিনি শুধু শিক্ষক নন-বহু শিক্ষককেরও শিক্ষক। বহু গুণী ছাত্রের শিক্ষক। বরেণ্য রাজনৈতিক বিশ্লেষক, বুদ্ধিজবি। উনাদের মত শিক্ষকদের কারণে আমরা অনেকেই শিক্ষকতাকে পেশা হিসাবে নির্বাচন করেছিলাম। অনেকের কাছে উনাদের দেখানো পথ ছিল সঠিক পথ।

বিশ্বের আদি শিক্ষক আল্লাহ তা-আলা। তাই ফেরেশতারা বলেছিলেন, ‘হে আল্লাহ, আপনি পবিত্র! আপনি যা শিখিয়েছেন তা ছাড়া আমাদের কোনোই জ্ঞান নেই; নিশ্চয় আপনি মহাজ্ঞানী ও কৌশলী।’ (সুরা-২ বাকারা)। আমাদের প্রিয় নবী (সা.)–এর প্রতি ওহির প্রথম নির্দেশ ছিল, ‘পড়ো তোমার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন, সৃষ্টি করেছেন মানব “আলাক” থেকে। পড়ো, তোমার রব মহা সম্মানিত, যিনি শিক্ষাদান করেছেন লেখনীর মাধ্যমে, শিখিয়েছেন মানুষকে, যা তারা জানত না।’ (সুরা-৯৬ আলাক)। ‘দয়াময় রহমান! কোরআন শেখাবেন বলে মানব সৃষ্টি করলেন; তাকে বর্ণনা শেখালেন।’ (সুরা-৫৫ রহমান)। শিক্ষার আসল বৈশিষ্ট্য এই একটি জায়গা থেকেই শুরু। সেই শুরু এখনও প্রতিনিধিত্ব করছেন মানুষ। অর্থাৎ যারা শিক্ষকতার মত মহান পেশায় নিজেকে জড়িয়ে রেখেছেন।

একজন ছাত্রকে কেবল শিক্ষিতই নয় বরং নৈতিক মানুষ করে গড়ে তোলার গুরুদায়িত্বটাও থাকে শিক্ষকের ওপরই। তাই একজন শিক্ষককে হতে হয় অনেক বেশি সচেতন, ধৈর্যশীল ও ন্যায় নিষ্ট। একজন আদর্শ শিক্ষক হতে হলে আপনাকে বিশেষ কিছু গুণের অধিকারী হতে হবে। শিক্ষাদানের প্রধান উদ্দেশ্যই হলো শিক্ষার্থীর পরিপূর্ণ জীবন বিকাশে সহায়তা প্রদান করা। এ লক্ষ্য অর্জনের পূর্বশর্ত হলো উপযুক্ত শিক্ষক। পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি, জ্ঞানের সমন্বয় সাধন, উন্নতি ও সঠিক পন্থায় বিতরণের জন্য প্রশিক্ষণ অপরিহার্য। দরকার মেধা মনন আর জ্ঞানের গভীরতায় পরিপূণ একজন মানুষ।

যে ব্যক্তি শিক্ষক ছাড়া শুধু বই পুস্তক পড়ে বিদ্যা অর্জন করে, সে কোনো দিন শিক্ষার পুর্ণতায় পৌঁছতে পারে না। বিজ্ঞ জনেরা বলেছেন, যার কোনো শিক্ষক নেই তার শিক্ষক শয়তান। মনীষীগণ আরো বলেছেন, শিক্ষকের দৃষ্টান্ত একজন মালীর মতো। একটা বাগানের সমৃদ্ধি যেমন মালীর পুর্ণ দৃষ্টির ওপর নির্ভর করে তেমনিভাবে একজন শিক্ষার্থীর জীবনের উন্নতি-অবনতি শিক্ষকদের দৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল। সেই অর্থে শিক্ষক হলেন একজন অভিভাবক যার হাত ধরে গড়ে উঠবে শিক্ষার্থীর আসল জীবন। সে হাঁটতে শিখবে কথা বলতে শিখবে আর আচরণে আসবে একজন মানুষের জায়গায়।

সব পেশা হতে শ্রেষ্ঠ ও সম্মান জনক পেশা হচ্ছে শিক্ষকতা। পৃথিবীতে মানুষ যত কর্মে নিয়োজিত আছে, তার মধ্যে শিক্ষকতার শ্রেষ্ঠত্বের সঙ্গে কেউ প্রতিদ্বন্ধিতা করতে পারবে না। তাই সাহাবাদের (রা.) একটা বৃহৎ সংখ্যা শিক্ষক হিসেবে সমাজে গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। বড় বড় রাজনীতিবিদ, সমাজ সংস্কারক এবং ধর্মীয় দিক নির্দেশকের ভূমিকায় শিক্ষকরাই ছিলেন অন্যতম। এ জন্যেই ইসলাম শিক্ষককে রূহানী পিতা সাব্যস্ত করেছে। যুগে যুগে আমরাও তাই দেখে আসছি।
শিক্ষাথীর জীবনের আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন ও উন্নয়ন সাধনই শিক্ষার উদ্দেশ্য। নৈতিক শিক্ষার সঙ্গে যেসব বিষয় সরাসরি সম্পর্কিত: সুশাসন, ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, দুর্নীতি দমন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, প্রবৃদ্ধি, সন্ত্রাস দমন, শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা। আচরণে (কর্মে) অভীষ্ট ইতিবাচক পরিবর্তন ও উন্নয়ন সাধনের জন্য নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে তথ্য প্রদান বা জ্ঞান দান করাকে শিক্ষা বলে। খলিফা হজরত উমর (রা.)-এর এক প্রশ্নের জবাবে হজরত উবায় ইবনে কাআব (রা.) বলেন, ‘ইলম হলো তিনটি বিষয়—আয়াতে মুহকামাহ (কোরআন), প্রতিষ্ঠিত সুন্নত (হাদিস) ও ন্যায় বিধান- (তিরমিজি)। হজরত ইব্রাহিম (আ.) দোয়া করলেন, ‘হে আমাদের প্রভু! আপনি তাদের মধ্যে পাঠান এমন রাসুল, যিনি তাদের সমীপে আপনার আয়াত উপস্থাপন করবেন, কিতাব ও হেকমত শিক্ষা দেবেন এবং তাদের পবিত্র করবেন। নিশ্চয় আপনি পরাক্রমশালী স্নেহশীল ও কৌশলী।’ (সুরা-২ বাকারা)
শিক্ষকতা পেশা ব্যতিক্রমী নেশা বইটি ৪৮০ পৃষ্ঠার। ছাত্র থেকে ক্ষিক হয়ে উঠার গল্পটি দিয়েই শুরু। জীবন ঘনিষ্ঠ লেখনি হলেও অভিজ্ঞতা, নানা প্রতিকূলতা, বাধা, শিক্ষকতা জীবন। ছাত্রজীবন, অধ্যাপনা, বিদেশে পড়ালেখা থেকে শুরু করে নানা দেশের মানুষের জীবনবোধ ইত্যাদি নিয়েই একটি গবেষণা গ্রন্থও বটে। অষ্ট্রেলিযায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ সিডনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রসঙ্গটি আমাকে দারুণ অনুপ্রাণিত করেছেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে আমারও নানা স্মৃতি জড়িয়ে আছে। কয়েকটি সেমিনারে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ আমার হয়েছে।

শিক্ষক হিসাবে দায়িত্ব পালন এই অধ্রায়টি আমাকে আবেগতাড়িত করেছে। পিএইচডি ডিগ্রীর জন্য আবেদন অন্য শিক্ষককে পাঠানো বিষয় গুলো ছিল ভিন্নরকম। যার যেখানে যেমনটি থাকার কথা নয় তারাই যোগ্যতার বিচারে বা রাজনৈতিক বিচারে আমাদের দেশে যে পদ পদবি পায় সেটি যর্থেষ্ট রকমভাবে উঠে এসেছে।

৪৮০ পৃষ্ঠার ১১টি অধ্যায়ের এই বইটি প্রকাশ করেছে জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ। বইটির মূল্য ৮০০/-টাকা। একজন গুণী শিক্ষাবিদের বইটি যেকোন সাধারণ পাঠককে ছুঁয়ে যাবে নি.সন্দেহে। বইটির বহুমাত্রিক সফলতা কামনা করি। আমি সাধারণ একজন পাঠক হিসাবে বইটি পড়ার পর মুগ্ধ হয়েছি। আবারও স্যারের প্রতি সন্মান, শ্রদ্ধা।