এইচএসসির বাংলা প্রশ্নে সাম্প্রদায়িকতার ঘটনায় দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড়

নিজস্ব প্রতিবেদক।।

এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় বাংলা (আবশ্যিক) প্রথমপত্রে কাসালং সেটের ১১ নম্বর ক্রমিকে নাটক সিরাজউদ্দৌলার সৃজনশীল প্রশ্নে সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগ আনা হয়েছে। হিন্দু ও মুসলমানদের জীবনাচরণের কিছু চিত্র তুলে ধরে এই প্রশ্নের উদ্দীপকে কিছু বিষয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করা হয়েছে। তবে প্রশ্নপত্র তৈরিতে কেন এবং কিভাবে এই প্রশ্নে সাম্প্রদায়িকতার ইঙ্গিতপূর্ণ উদ্দীপক তুলে দেয়া হলো তা নিয়েও রীতিমতো অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। গতকাল শিক্ষামন্ত্রী ডা: দীপু মনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ইচ্ছাকৃতভাবে এমন ভুল হলে কেউ ছাড় পাবে না। যে যারা এই প্রশ্নপত্র তৈরিতে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ারও কথা জানিয়েছেন মন্ত্রী।

গতকাল ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের বাংলা প্রথমপত্রের প্রশ্ন নিয়ে দেশজুড়ে রীতিমতো সমালোচনার ঝড় ওঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু ভুল প্রশ্ন ও ভুয়া প্রশ্ন নিয়েও বিব্রতকর অবস্থা তৈরি হয়। ঢাকা বোর্ডের বাংলা প্রথমপত্রের প্রশ্ন অনুসারে দেখা যায়, ১১ নং প্রশ্নের উদ্দীপকে বলা হয়েছে, ‘নেপাল ও গোপাল দুই ভাই। জমি নিয়ে বিরোধ তাদের দীর্ঘ দিন।

অনেক শালিস বিচার করেও কেউ তাদের বিরোধ মেটাতে পারেনি। কেউ কাউকে ছাড় দিতে নারাজ। এখন জমির ভাগ বণ্টন নিয়ে মামলা চলছে আদালতে। ছোট ভাই নেপাল বড় ভাইকে শায়েস্তা করতে আবদুল নামে এক মুসলমানের কাছে ভিটের জমির এক অংশ বিক্রি করে। আবদুল সেখানে বাড়ি বানিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করে। কুরবানির ঈদে সে নেপালের বাড়ির সামনে গরু কুরবানি দেয়। এই ঘটনায় নেপালের মন ভেঙ্গে যায়। কিছু দিন পর কাউকে কিছু না বলে জায়গা জমি ফেলে সপরিবারে ভারতে চলে যায় সে।’

উল্লেখিত উদ্দীপকের ভিত্তিতে পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর দিতে বলা হয়েছে। মোট নম্বর ১০। প্রশ্নগুলো হচ্ছে ক. মীর জাফর কোন দেশ হতে ভারতে আসেন? খ. ‘ঘরের লোক অবিশ্বাসী হলে বাইরের লোকের পক্ষে সবই’ সম্ভব ব্যাখ্যা কর? গ. উদ্দীপকের নেপাল চরিত্রের সঙ্গে সিরাজউদ্দৌলা নাটকের মীর জাফর চরিত্রের তুলনা কর? ঘ. খাল কেটে কুমির আনা প্রবাদটি উদ্দীপক ও সিরাজউদ্দৌলা নাটক উভয়ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য- উক্তিটির সার্থকতা নিরূপণ কর। নাটকের অংশের এই প্রশ্নের ও উদ্দীপক নিয়ে দেশজুড়ে সাম্প্রদায়িকতার প্রতিবাদ ওঠে। শিক্ষামন্ত্রীও গতকাল এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এইচএসসির প্রশ্নে সাম্প্রদায়িক উসকানি গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ অসাম্প্রদায়িক দেশ। এ দেশে কোনো পরীক্ষার প্রশ্নে সাম্প্রদায়িক কিছু থাকবে সেটি অত্যন্ত দুঃখজনক। এটি একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা চিহ্নিত করছি, এ প্রশ্নটি কোন সেটার করেছেন, কোন মডারেটর করেছেন। আমরা সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবো।

এইচএসসির বাংলা প্রথমপত্র পরীক্ষার প্রশ্নে সাম্প্রদায়িক উসকানির বিষয়ে গতকাল সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন তিনি। মন্ত্রী আরো বলেন, প্রশ্ন সেটিং প্রশ্ন মডারেটিং কাজগুলো এমনভাবে হয়, যিনি প্রশ্ন সেট করে যান তিনি আর ওই প্রশ্ন দেখতে পারেন না। যিনি মডারেট করে যান তিনিও ওই প্রশ্ন দেখতে পারেন না। সেটার ও মডারেটর ছাড়া প্রশ্নের একটি অক্ষরও কারো আর দেখবার সুযোগ থাকে না। আমাদের একটা সুস্পষ্ট নির্দেশিকা আছে, কী কী বিষয় মাথায় রেখে প্রশ্নগুলো তারা করবেন। প্রশ্নে সাম্প্রদায়িকতার কিছু যাতে না থাকে সেটিও সে নির্দেশিকায় থাকে।

প্রশ্নে সাম্প্রদায়িক উসকানির বিষয়টি খুবই দুঃখজনক উল্লেখ করে ডা: দীপু মনি আরো বলেন, কোনো একজন প্রশ্নকর্তা প্রশ্নটি করেছেন। যিনি মডারেট করেছেন তার দৃষ্টিও হয়তো কোনো কারণে এটি এড়িয়ে গেছে, বা তিনিও হয়তো এটি স্বাভাবিকভাবে নিয়েছেন। আমরা চিহ্নিত করছি এ প্রশ্নটি কোন সেটার করেছেন, কোন মডারেটর করেছন। আমরা সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবো। যারা চিহ্নিত হবেন তাদের আর প্রশ্ন প্রণয়নের কার্যক্রমের সাথে কোনোভাবেই সম্পৃক্ত রাখা হবে না।

শিক্ষাবিদ ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ বলেন, পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে ধর্মকে সামনাসামনি করা ঠিক হয়নি। মুসলমানের কাছে জমি বিক্রি করে দেশ ত্যাগ করছে- এ সমস্ত তথ্য সমাজে অস্থিতিশীলতা তৈরি করে। এ ধরনের ঘটনা অনাকাক্সিক্ষত। এটা কখনো কাম্য নয়। তিনি বলেন, ‘আরো ভালো প্রশ্ন করা যেত। শিক্ষার উদ্দেশ্য হচ্ছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানবতাবোধ বাড়ানো। ধর্মে-ধর্মে সহিষ্ণুতা বাড়াতে কাজ করা।’ অনেক চিন্তা করে পরীক্ষার প্রশ্ন করা প্রয়োজন বলে অধ্যাপক কায়কোবাদ মনে করেন।

আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির আহ্বায়ক ও ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক তপন কুমার সরকার বলেন, ‘সাম্প্রদায়িক ও বিদ্বেষপূর্ণ কোনো বক্তব্য যেন না থাকে সে জন্য প্রশ্নপত্র প্রণয়নে লিখিত নির্দেশনা দেয়া হয়। প্রশ্নপত্র প্রণয়নে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা নিয়ে ওরিয়েন্টশন করানো হয়। প্রশ্নপত্র দেখার কোনো সুযোগ নেই।’ কিভাবে এ ধরনের প্রশ্ন করা হলো তা পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে তিনি জানান।