উৎসব ভাতা শতভাগ করুন, শিক্ষার কলংক মুছে ফেলুন

প্রকাশিত: ৩:২৮ অপরাহ্ণ, শুক্র, ৭ মে ২১

।। ফিরোজ আলম ।।

ঈদ আসলেই মুখে মলিনতা,প্রাণে ভয়।বিবেকে অপমান,গভীর রাতে চোখে ক্রন্দন।অসহায়ত্বের হাতছানি সব খানে ওদের (এমপিওভুক্ত শিক্ষক)।ওরা কাঁদতে পারেনা লোক লজ্জায়,হাসতে পারেনা বিবেকের ঘৃনায়।ওরা প্রিয়জনদের যেমনি উৎসবে হাসাতে পারেনা ,প্রিয়জনদের নিয়ে উৎসবে মেতে উঠতে ও পারেনা।

কারন ওদের উৎসব বন্দি করে রেখেছে শোষকের দল।উৎসবকে বন্দি দশা থেকে মুক্ত করতে সারা দেশের এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা আজ এক সুরে গাইছে শত ভাগ উৎসব ভাতা পাওয়ার গান।

গত ২৮ মার্চ ‘বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (স্কুল ও কলেজ) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০২১ প্রকাশিত হয়। ঠিক তখনি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের শতভাগ বোনাস পাওয়ার বিষয়টি সামনে আসে।এ পরিস্থিতিতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. মাহবুব হোসেন বলেন, শতভাগ বোনাস দিতে হলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন লাগবে।

এখন প্রশ্ন হলো অর্থ মন্ত্রনালয় কি আটলান্টিক মহাসাগরের তলদেশে কিংবা মঙ্গল গ্রহে লুকিয়ে আছে যে এক মাসের ও বেশি সময় পেরিয়ে গেলে ও অর্থ মন্ত্রনালয়ের অনুমোদন আসেনা? নাকি কেউ ইচ্ছাকৃত ভাবেই অনুমোদন নিতে দেয় না কিংবা কেউ শিক্ষকদের যৌক্তিক অধিকার নিয়ে ছিনিমিনি খেলে? কে ঐ ঘৃনিত নরপিশাচ? কারা ঐ রাক্ষুষে?

সারাদেশের ২৮ হাজারের বেশি এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে ৪ লাখ ৬ হাজার ৪৬৯ জন শিক্ষক এবং ১ লাখ ৬২ হাজার ৮৬১ জন কর্মচারী রয়েছেন।আর মাদ্রাসার কথা ভাবলে বলা যায়,ডয়চে ভেলের তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশে বর্তমানে ইবতেদায়ি মাদরাসার সংখ্যা ৬,৮৮২টি, দাখিল মাদরাসা ৯,২২১টি, আলিম মাদরাসা ২,৬৮৮টি, ফাজিল মাদরাসা ১,৩০০টি ও কামিল মাদরাসা ১৯৪টি।

উপরে উল্লেখিত স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা সমুহ এমপিওভুক্ত এবং পরিচালিত হয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে।এগুলির বেতন-ভাতা রাষ্ট্র বহন করে। রাষ্ট্র এদের শত ভাগ বেতন বহন করলেও উৎসব ভাতায় শোষকের ভূমিকায় অবতীর্ন হয়।গত আঠারো বছর ধরে একই নির্দিষ্ট অংশ মাত্র ২৫% অনুদান হিসেবে পরিশোধ করে।এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের উৎসব ভাতা সম্পর্কে জানা যায় , ২০০৩ সাল তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় সারাদেশের এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের কে প্রতি ঈদে মূল বেতনের ২৫ শতাংশ হারে কর্মচারীদেরকে ৫০ শতাংশ হারে উৎসব ভাতা দেওয়ার যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেয়।

২০০৩ সালের অক্টোবর থেকে তা কার্যকর হয়। যখন এই সিদ্ধান্ত হয়েছিল তখন সরকার থেকে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ৯৫ শতাংশ বেতন দেওয়া হতো। ২০০৫ সালে একই সরকার এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন ৫ শতাংশ বাড়িয়ে মূল বেতনের শতভাগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহন করে। ২০০৩ থেকে থেকে গত ১৮ বছর ধরে মানুষের জীবন-জীবিকার চাহিদা বেড়ে কয়েক গুন হলে ও কিছু অদৃশ্য অশুভ শক্তি এবং কোন এক অজানা কারনে এই লজ্জাজনক খন্ডিত উৎসব ভাতা ২৫ শতাংশই রয়ে যায়।অথচ এটি ১০০% হওয়া শিক্ষকদের যেমনি প্রানের দাবি,তেমনি সন্মানের প্রশ্নে ও এটি অতীব জরুরি।

এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের উৎসব মাটি করে দেওয়া দায়িত্বশীল কর্তা ব্যক্তিরা ১০০% বোনাস পেয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে খুশিতে যখন আত্মহারা, সেখানে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা ২৫% লজ্জাজনক বোনাস পেয়ে কিভাবে উৎসবে মাতবেন? একই দেশে উৎসবের ধরন কি ভিন্ন হতে পারে?সরকারি নিয়ম অনুযায়ী পিতামাতাসহ ছয় সদস্যের পরিবারের ঈদ উৎসব ভাতা ১০০% হলে এমপিওভুক্তদের বেলায় অবিচার কেন?

সরকারি শিক্ষক – কর্মকর্তাদের পরিবারের ছয় সদস্যের জন্য যদি শতভাগ উৎসব ভাতা প্রয়োজন হয় তাহলে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেলায় তা ২৫ শতাংশ কোন যুক্তিতে? এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের উৎসব কি সরকারি শিক্ষক কর্মকর্তাদের উৎসব থেকে আলাদা?আমরা কি এখনো অসভ্য সমাজে বাস করছি? ২৫% উৎসব ভাতায় কী কী কেনা যায় বিবেকহীন কর্তারা তা এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অবগত করালে যুগ যুগ ধরে কান্না ও আর্তনাতরত এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা হয়ত শান্তনা টুকু ও পাবেন।

এক শ্রেণীর সুবিধাভোগী জ্ঞানপাপীরা বলবে এ দেশ তো গরিব। এত এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের সরকার কী করে শত ভাগ বোনাস দেবে? ঠিক আছে যুক্তির খাতিরে মানলাম।যেদেশে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর নির্মান হয় ,হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন মূলক কাজ হচ্ছে।প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৮ শতাংশ হয়েছে,করোনায় প্রনোদনা প্যাকেজ লক্ষ কোটির টাকার কাছাকাছি ঘোষনা হয়,বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ তিন লাখ ৭৪ হাজার ২৩৮ কোটি টাকা হয়,মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর প্রতি দিনের অফিস খরচ ১০ কোটি টাকার কাছাকাছি হয়, সেদেশে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের শতভাগ উৎসব ভাতা প্রদান কি অসম্ভব কিছু?

এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের শতভাগ উৎসব ভাতা প্রদান করলে কি দেশ দেউলিয়া হয়ে যাবে?এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা মা-বাবা, ভাই-বোন,পরিবার পরিজন নিয়ে একটু উৎসবে ঈদ কাটাবেন সে জন্য যদি বিবেকহীন কেউ মনে করেন এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের শতভাগ উৎসব ভাতা দিলে অর্থের অপচয় হবে তাদের জন্য বলবো বাংলাদেশ ব্যাংক কেলেংকারি,শেয়ার বাজার কেলেংকারি, ডেসটিনি কেলেংকারি, হলমার্ক কেলেংকারি,রেল কেলেংকারি,বিমানের হাজার কোটি টাকা লোকসান,পদ্মা সেতুর বিলম্ব লোকসান ইত্যাদি সব কেলেংকারিতে কি দেশের হাজার কোটি টাকা অপচয় হয়নি?

যখন উৎসব ভাতা শত ভাগ করার জন্য বাংলাদেশ মাদ্রাসা জেনারেল টিচার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি হারুন অর রশিদ স্যার এবং স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদের সাধারন সম্পাদক অধ্যক্ষ শাহজাহান আলম সাজু স্যার,বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির সভাপতি নজরুল ইসলাম রনি স্যার সহ কিছু শিক্ষক নেতা আপ্রান চেষ্টা করে যাচ্ছেন,ঠিক তখনি একটি অনলাইন পত্রিকার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কু প্ররোচনায় একটি স্বার্থান্বেষী মহল ঐ শিক্ষক নেতাদের তীব্র সমালোচনা করছেন।

অথচ এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের মূল বেতনের ৮০% বৃদ্ধি,৫% ইনক্রিমেন্ট,২০% বৈশাখি ভাতাসহ আজকের সেরা অর্জন গুলি উপরিউক্ত শিক্ষক নেতাদের চেষ্টার ফসল।মনে রাখতে হবে শিক্ষকদের শত ভাগ উৎসব ভাতা কিংবা জাতীয়করনের স্বপ্ন পূরন করতে হলে উপরে উল্লেখিত শিক্ষক নেতাদের গুরুত্ব অনিবার্য। কারন তারা ছাড়া প্রধানমন্ত্রী কিংবা শিক্ষা মন্ত্রীর সাথে অন্য কোন শিক্ষক নেতা গত পাঁচ বছরে সভা করতে পেরেছেন এমন দৃশ্য চোখে পড়েনা।

গত ১৩ ই মার্চ ২০২১ বাংলাদেশ মাদ্রাসা জেনারেল টিচার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি হারুন অর রশিদ স্যারের নেতৃত্বে জাতীয় প্রেসক্লাবে এবং ৬ ই মার্চ ২০২১ স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদের সাধারন সম্পাদক অধ্যক্ষ শাহজাহান আলম সাজু স্যারের নেতৃত্বে শিক্ষা মন্ত্রীর প্রোগ্রাম সেটিই প্রমান করে।এছাড়া নজরুল ইসলাম রনি স্যারের নেতৃত্বে প্রধান মন্ত্রী বরাবর ইমেইল বার্তা ও নতুন মাত্রা যোগ করে।

তাই শিক্ষা সংশ্লিষ্ট কর্তা ব্যক্তিদের এবং শিক্ষা বান্ধব জননেত্রী শেখ হাসিনা সরকারের প্রতি উদাত্ত আহ্বান ১৮ বছরে বাংলাদেশ বদলে গিয়েছে,বদলে দিয়েছেন।পৃথিবীর বুকে এদেশের মানচিত্র উচ্চাসীন হয়েছে, উচ্চাসীন করেছেন।বিশ্ব নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রথম সারিতে অংশ নিয়েছে,কত অর্জনই তো হয়েছে।কত অর্জনই তো করেছেন।শুধু এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের উৎসব ভাতা ঐ ২৫ শতাংশেই রয়ে গেছে। রেখে দিয়েছেন।তাই উৎসব ভাতা অবিলম্বে শতভাগ করুন, শিক্ষার এই কলংক মুছে ফেলুন।শিক্ষকদের সন্মানের সাথে বাঁচতে দিন।

লেখক- ফিরোজ আলম,বিভাগীয় প্রধান,আয়েশা (রা:) মহিলা কামিল (অনার্স,এম.এ) মাদ্রাসা।সদর,লক্ষীপুর।

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.