উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে শৈত্যপ্রবাহ ঘন কুয়াশা আজো থাকবে

নিজস্ব প্রতিবেদক।।

দেশের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে শুরু হয়েছে শৈত্যপ্রবাহ। আজো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে থাকবে ঘন কুয়াশা। বিশেষ করে নদী তীববর্তী ও এর আশপাশ অঞ্চলে অপেক্ষাকৃত ঘন কুয়াশা বিরাজ করছে। গতকাল সকালে সারা দেশ ছিল ঘন কুয়াশায় ঢাকা। এমনটিই দেখা গেছে স্যাটেলাইট ছবি থেকে। ফলে দুপুরের আগে সূর্য দেখা যায়নি বিভিন্ন স্থানে। তবে দুপুরের পর দেশের কোথাও কোথাও সূর্যের কিরণ ভূপৃষ্ঠে পৌঁছাতে পেরেছে। এ কারণেই উচ্চ ও নিম্ন তাপমাত্রার মধ্যে কিছুটা পার্থক্য তৈরি হয় এবং দুপুরের দিকে উষ্ণতা কিছুটা বেড়ে সহনীয় পর্যায়ে ছিল আবহাওয়া। তবে বিকেল থেকে আবারো ম্রিয়মাণ হয়ে যায় সূর্য এবং তাপমাত্রা কমে গেলে সন্ধ্যার পর থেকেই সারা দেশে তীব্র শীত অনুভূত হতে থাকে। গতকাল বৃহস্পতিবার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল যশোরে ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

ঘন কুয়াশার ফলে গত কয়েক দিনে বিমানের বেশ কিছু ফ্লাইটের শিডিউলে পরিবর্তন হয়েছে। দেরিতে আসতে বাধ্য হচ্ছে বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের বিমান। এ ছাড়া দূর গন্তব্যের রাতে চলাচলকারী বাসগুলোর যেমন যাত্রা বিলম্বিত হচ্ছে তেমনি গন্তব্যে পৌঁছাচ্ছে দেরি করে।

দেশের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল থেকে কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া আসা অব্যাহত থাকায় রাজশাহী, পাবনা, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, নীলফামারী, যশোর, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়া অঞ্চলের ওপর দিয়ে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং তা আজ শুক্রবারও অব্যাহত থাকতে পারে।

কানাডার সাসকাচুয়ান ইউনিভার্সিটির আবহাওয়া গবেষক মোস্তফা কামাল বিভিন্ন স্যাটেলাইটের পূর্বাভাস ও চিত্র বিশ্লেষণ করে জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর থেকে আজ শুক্রবার সকাল পর্যন্ত বরিশাল, চট্টগ্রাম, ঢাকা, ময়মনসংিহ ও সিলেট বিভাগের জেলাগুলোতে হালকা থেকে মাঝারি ধরনের কুয়াশা থাকবে। একই সময় খুলনা, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের জেলাগুলোতে রাতে হালকা কুয়াশা থাকলেও পরদিন সকালে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা পড়বে। অন্য দিকে ঢাকা শহরে শীতের প্রকোপ অব্যাহত থাকতে পারে।

তবে সূর্য দেখা যেতে পারে সকাল ১০টা থেকে।
তীব্র শীতের কারণে সারা দেশেই শুরু হয়েছে বিপর্যস্ত অবস্থা। ঠাণ্ডার কারণে মানুষের চলাফেরা কমে গেছে। সকালে রাজধানী শহরের রাস্তাগুলো খাঁখাঁ করে। বাধ্য না হলে কেউ ভোরে বের হয় না। কোনো কোনো স্কুলে ক্লাস শুরু হলেও স্বল্প সময়ের জন্য করা হচ্ছে। শুধুমাত্র অফিসগামী মানুষ বাধ্য হয়ে বেরুচ্ছেন সকালে।

আবহাওয়্ াঅফিস জানিয়েছে, উপমহাদেশের উচ্চচাপ বলয়ের বর্ধিতাংশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও এর আশপাশ এলাকায় অবস্থান করছে। এ কারণেই ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তে বাংলাদেশের জেলাগুলোতে শুরু হয়েছে শৈত্যপ্রবাহ। আগামী দুই দিন আবহাওয়ার বর্তমান অবস্থার খুব বেশি পরিবর্তন হবে না বলে আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে।

গতকাল রাজধানী ঢাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১২.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ তাপমাত্রা গত বুধবারের চেয়ে কিছুটা কম। তা সত্ত্বেও দুপুরের দিকে রোদ ওঠায় কিছুটা সহনীয় পর্যায়ে ছিল তাপমাত্রা। শুধুমাত্র চট্টগ্রাম বিভাগ ছাড়া দেশের সর্বত্রই নিম্ন তাপমাত্রা ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস ও এর কাছাকাছি ছিল।

পঞ্চগড় প্রতিনিধি জানান, মাঝখানে দুই দিন বিরতি দিয়ে আবারো মৃদু শৈত্যপ্রবাহ শুরু হয়েছে পঞ্চগড়ে। কুয়াশা না থাকলেও মেঘলা আকাশের সাথে উত্তরের কনকনে শীতল বাতাসে কাহিল হয়ে পড়ছে পঞ্চগড়ের মানুষ। গতকাল তেঁতুলিয়া আবহাওয়া অফিস সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করেছে। আগের দুই দিনের ধারাবাহিকতায় গতকাল বৃহস্পতিবারও দুপুর পর্যন্ত সূর্য মেঘে ঢাকা ছিল।

কুয়াশা না থাকলেও মেঘাচ্ছন্ন আকাশে উত্তরের কনকনে শীতল বাতাস কাঁপিয়েছে পঞ্চগড়ের মানুষকে। দুপুরের পর রোদের দেখা মিললেও শীতল বাতাসের কারণে দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বাড়ছে না। আগের দিনের চেয়ে দশমিক ২ সেলসিয়াস বেড়ে গত বুধবার দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করে তেঁতুলিয়া আবহাওয়া অফিস। দিন ও রাতের তাপমাত্রার ব্যবধান কাছাকাছি আসায় তীব্র শীত অনুভূত হচ্ছে।

তেঁতুলিয়া আবহাওয়ায় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রাসেল শাহ জানান, গতকাল তেঁতুলিয়ায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। দুই দিন পর তাপমাত্রা আবারো ১০ ডিগ্রিতে নেমে আসায় জেলায় আবারো মৃদু শৈত্যপ্রবাহ শুরু হয়েছে।
রংপুর অফিস জানায়, শীতের তীব্রতা বাড়ায় রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলে আগুন পোহানোর সময় দগ্ধ মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। গত ৭ দিনে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি এক গৃহবধূ মারা গেছেন।

রংপুর আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ ও ইনচার্জ মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা জানান, নতুন বছরের শুরুর দিন থেকেই বাড়ছে শীতের তীব্রতা। সাথে কুয়াশার চাদর। এই অবস্থায় চলতি সপ্তাহের শেষের দিকে হাঁড়কাপানো শীত অনভূত হওয়া শুরু করেছে। আগামী ৩ থেকে চার দিনের মধ্যে উত্তরাঞ্চলের অনেক জেলার তাপমাত্রা ৬ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে নামবে।

ইতোমধ্যে রংপুর, নীলফামারী, দিনাজপুর এবং পঞ্চগড়ে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার রংপুরে ১১, সৈয়দপুরে ৯ দশমিক ৬, কুড়িগ্রামের রাজারহাটে ১১ দশমিক ০, নীলফামারীর ডিমলায় ১০ দশমিক ৬ এবং পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় ১০ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে। শুক্রবার তাপমাত্রা আরো নামার কথা জানিয়েছেন এই আবহাওয়াবিদ।

শীতের তীব্রতা থেকে বাঁচতে গরম কাপড় কিনতে ভিড় বেড়েছে দোকান ও ফুটপাথে। গত বছরের তুলনায় দুই থেকে তিনগুণ দাম বেশির কথা বলছেন গ্রাহকরা। দামের বিষয়ে গ্রাহকদের সাথে একমত ব্যবসায়ীরাও। গত বছরের চেয়ে অধিক দাম হওয়ায় বিক্রি না বাড়ার কথা জানিয়েছে তারা।

নোয়াখালী অফিস জানায়, নোয়াখালীতে অব্যাহত শৈত্যপ্রবাহে মানুষের স্বাভাবিক জীবন অচল হয়ে পড়েছে। দিনরাত কনকনে হিমেল হাওয়া বইছে। পাশাপাশি সূর্যের মুখ দেখা যাচ্ছে না।

জেলা সদর, বেগমগঞ্জ, সোনাইমুড়ী, চাটখিল, সেনবাগ, কোম্পানীগঞ্জ, কবিরহাট, সুবর্ণচর ও হাতিয়া উপজেলায় ঘন কুয়াশায় দিনেও হেড লাইট জালিয়ে ধীরগতিতে যানবাহন চলাচল করছে। শীতবস্ত্রের অভাবে অসহায় মানুষের দুর্ভোগ বেড়ে গেছে। বৃদ্ধ ও ছোট শিশুরা ঠাণ্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। কনকনে শীতে খেটে খাওয়া মানুষরা মাঠে নামতে না পেরে অভাব অনটনে মানবেতর জীবনযাপন করছে।

নীলফামারী প্রতিনিধি জানান, দুই দিন ধরে নীলফামারী জেলায় মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বিরাজ করছে। সেই সাথে হিমেল বাতাসে কাবু হয়ে পড়েছে মানুষজন। বিশেষ করে তিস্তা নদী ঘেঁষা চরাঞ্চলের মানুষজন এই ঠাণ্ডায় কাহিল হয়ে পড়েছেন। ঘন কুয়াশার কারণে দৃষ্টিসীমা কম থাকায় দুপুর পর্যন্ত যানবাহনগুলো হেডলাইট জ্বালিয়ে চলাচল করছে। খেটে খাওয়া নিম্ন আয়ের মানুষজন কাজে যেতে না পারায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। সদর উপজেলার টুপামারী ইউনিয়নের দিনমজুর বাচ্চু মামুদ জানান, ঠাণ্ডার কারণে হাত-পা মুড়িয়ে যাচ্ছে, তাই দুই দিন কাজে বের হতেপারেননি তিনি।

সৈয়দপুর বিমানবন্দর আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ লোকমান হোসেন জানান গতকাল সকাল ৯টায় জেলার তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৯ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যা এই মৌসুমে এটাই সর্বনিম্ন তাপমাত্রা। তিনি জানান এ জেলায় উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে ঘণ্টায় ১২ কিলোমিটার বেগে ঠাণ্ডা বাতাস বইছে।

সৈয়দপুর (নীলফামারী) সংবাদদাতা জানান, নীলফামারী জেলার সৈয়দপুরের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ। ঘন কুয়াশার সাথে ঠাণ্ডা বাতাসে চরম বিপাকে পড়েছে মানুষ।

সৈয়দপুর আবহাওয়া অফিসের দেয়া তথ্য মতে, গতকাল বুধবার সকাল ৬টায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ১২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। একই দিনে সকাল ৯টায় তা কমে গিয়ে দাঁড়ায় ১২ দশমিক ২ ডিগ্রিতে। তাপমাত্রা নেমে গিয়ে আজ সকাল ৬টা ও ৯টায় ৯ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়। এ ছাড়া সৈয়দপুরসহ এই অঞ্চলে উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে ঘণ্টায় ১২ কিলোমিটার বেগে ঠাণ্ডা বাতাস বইছে। ঘন কুয়াশায় সকাল ১০টায় সৈয়দপুর বিমানবন্দরের রানওয়েতে দৃষ্টিসীমা ছিল মাত্র ৪০০ মিটার।

এ দিকে শৈত্যপ্রবাহে দুর্ভোগ বেড়েছে এই অঞ্চলের খেটে খাওয়া মানুষের। শীতের তীব্রতার হাত থেকে বাঁচতে খড়কুটো জ্বালিয়ে উত্তাপ নিচ্ছেন তারা। গবাদিপশু শীত থেকে বাঁচাতে চট বা বস্তা দিয়ে শরীর ঢেকে রাখছেন মালিকেরা।

সৈয়দপুর বিমানবন্দরের ম্যানেজার সুপ্লব কুমার ঘোষ বলেন, শীতকালে ঘন কুয়াশার কারণে প্রায়ই সৈয়দপুর বিমানবন্দরে উড়োজাহাজ চলাচলে বিঘœ ঘটছে। তবে দুপুরের মধ্যে কুয়াশা কেটে গিয়ে তা স্বাভাবিক হওয়ায় কোনো ফ্লাইট বাতিল করা হয়নি।

সাটুরিয়া (মানিকগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, শীত জেঁকে বসেছে মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায়। ঘন কুয়াশা ও শৈত্যপ্রবাহে এখানকার জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। শীতের তীব্রতায় উপজেলার দুস্থ ও শ্রমজীবী মানুষের জবুথবু অবস্থা। এ ছাড়া শীতজনিত কারণে সর্দি-কাশিসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।

উপজেলার সাভার গ্রামের বিধবা কালিজিরা বেগম বলেন, আমাদের পাড়ার সবাই গরিব। চাহিদামতো শীতের কাপড় কেনা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। তাই সরকারিভাবে যদি আমাদেরকে কম্বল দিয়ে সহায়তা করা হয় তাহলে ভালো হতো। সিএনজি চালক জসীম উদ্দিন বলেন, অন্যবারের চেয়ে এ বছরে বেশি শীত পড়েছে। শীত থেকে রক্ষা পেতে গরম কাপড় পড়ছি।

তাঁত শ্রমিক সম্রাট হোসেন বলেন, এ বছর বেশি শীত পড়েছে। আমাদের গরম কাপড় যা আছে, তা দিয়ে শীত ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না। তীব্র শীতের কারণে দৈনন্দিন কাজকর্ম ব্যাহত হওয়ায় পরিবার-পরিজনের খাদ্য জোগান দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে দুস্থ ও শ্রমজীবী মানুষদের। রাজমিস্ত্রি শহিদুল ইসলাম বলেন, এ বছর অতিরিক্ত শীতের কারণে আমরা কোনো কাজ ঠিকমতো করতে পারছি না। কাজ করতে না পারায় সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

শীতজনিত কারণে উপজেলায় ডায়রিয়া, সর্দি-কাশি, নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে শিশু ও বৃদ্ধরা।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: মো: মামুন উর রশিদ বলেন, শীতজনিত বিভিন্ন রোগে প্রতিদিনই আক্রান্তরা চিকিৎসা নিচ্ছেন।