ইডেন কলেজ কতটা নিরাপদ

নিজস্ব প্রতিবেদক।।

ক্যাম্পাসে চাঁদাবাজি, হলগুলোতে সিট বাণিজ্য, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও কলেজ প্রশাসনের নীরবতার বলি এখন ইডেনের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে যেসব খবর চাউর হয়েছে তাতে ঘুম উড়ে গেছে অভিভাবকদের। এতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইডেন শিক্ষার্থীদের নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। সর্বশেষ এ ঘটনায় শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন করেছে ও মামলা গড়িয়েছে আদালতে। চাঁদাবাজি ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগ এনে কলেজ ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে বুধবার।
দেশব্যপী ইডেন কলেজ আলোচনার তুঙ্গে থাকলেও এখন পর্যন্ত কোন বিবৃতি দেননি কলেজ প্রধান অধ্যক্ষ সুপ্রিয়া ভট্টাচার্য। এ ঘটনায় সামাজিকভাবে হয়রানির শিকার শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরাও ইডেন কলেজ প্রশাসনের গাফিলতিকেই দায়ী করছেন। তাদের মনে একটি প্রশ্নই ঘুরে ফিরে আসছে আবাসিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ইডেন কলেজ আসলে কতটা নিরাপদ।

সম্প্রতি ছাত্রলীগের আধিপত্যের জেরে ইডেনে কয়েক দফায় সংঘর্ষ ঘটেছে। এর মূল কারণ ছিল ছাত্রলীগের দু’গ্রুপের স্বার্থের দ্বন্দ্ব। অনুসন্ধানে জানা যায়, থাকা ও খাওয়ার খরচ কম থাকায় গ্রাম থেকে আসা অধিকাংশ শিক্ষার্থী হলে উঠতে চান। কিন্তু ইডেনের মোট ৬ হলে সিট সংখ্যা কম থাকায় নিয়মতান্ত্রিকভাবে কম শিক্ষার্থী আবাসনের সুযোগ পায়। যেসব শিক্ষার্থী হলে থাকার সুযোগ পায় না তারা ক্ষমতাসীন নেত্রীদের ম্যানেজ করে হলে উঠেন। অভিযোগ রয়েছে, এর জন্য প্রথম পর্যায়ে ১৫-২০ হাজার টাকা ও প্রতি মাসে ২-৩ হাজার টাকা শিক্ষার্থীরা নেতাদের হাতে তুলে দেন।

বৈধ শিক্ষার্থীদের হলে কোন সমস্যা নেই। কলেজে আবেদনের প্রেক্ষিতে ভাইভা পরীক্ষা দিয়ে ব্যাংক ড্রাফটের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আবাসন বৈধ হয়। কিন্তু যারা টাকা দিয়ে অবৈধভাবে হলে উঠেন তাদেরকে কেন্দ্র করেই বাধে বিপত্তি। এসব শিক্ষার্থী প্রতি মাসে টাকা না দিলেই নেতারা তাদেরকে মারধর করে। এসব ঘটনা কলেজ প্রশাসনের নাকের ডগায় ঘটে থাকে তাই এই বিষয়ে কলেজ প্রশাসন কোন বক্তব্য দেয়নি। এসব বিষয়ে জানার জন্য ইডেন কলেজ অধ্যক্ষ সুপ্রিয়া ভট্টাচার্যকে একাধিক ফোন-মেসেজ দিয়েও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। সূত্র জানায়, এসব ঘটনায় ৪ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ইডেন কলেজ প্রশাসন।
থমথমে ক্যাম্পাস ॥ কলেজ ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি জান্নাতুল ফেরদৌসীকে রুম থেকে টেনে হিঁচড়ে বের ও নির্যাতন করে ইডেন কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি তামান্না জেসমিন রিভা ও সাধারণ সম্পাদক মোছাঃ রাজিয়া সুলতানা। পরে সহ-সভাপতি জান্নাতুল ফেরদৌসী ও তার কর্মীরা তামান্না জেসমিন রিভা ও রাজিয়া সুলতানাকে মারধর করে ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেয়। তাদেরকে অবাঞ্চিত ঘোষণা করে তারা। কিন্তু ঢাকা মেডিক্যালে চিকিৎসা শেষে তারা হলে আবারও ফিরে এসেছেন।

অন্যদিকে জান্নাতুল ফেরদৌসীর কিছু কর্মী এখনও হলে অবস্থান করছে। সব মিলিয়ে হলে থমথমে পরিবেশ। সূত্র জানায়, বহিষ্কৃত সহ-সভাপতি জান্নাতুল ফেরদৌসী এখন হলে অবস্থান করছেন না। তার কিছু অনুসারীর মালপত্র হল থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ছাত্রলীগ থেকে ১৬ জনকে বহিষ্কার করায় সংঘাতের সম্ভাবনা কম। তবে সংঘাতের সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না।
সাধারণ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা উদ্বিগ্ন ॥ ইডেনের ছাত্রলীগের দু’গ্রুপের মারামারি ও হলের অস্বস্তিকর খবরে অভিভাবকরা উদ্বিগ্ন। তারা বলেন, এমন একটি পরিবেশের মধ্যে নিজের সন্তানকে রেখে কতটা স্বস্তিতে থাকা যায়। মেয়েদের হলেও যদি এমন নৃশংস ঘটনা ঘটতে থাকে তবে তা উদ্বেগের। এ বিষয়ে কলেজ প্রশাসনের সরাসরি হস্তক্ষেপ চান তারা। সামিউল মালেক নামের এক অভিভাবক বলেন, নোংরা রাজনীতির শিকার কেন আমার মেয়ে হবে। আমার মেয়ে ওখানে পড়ালেখা করতে গিয়েছে। বদনাম কুড়ানোর জন্য যায়নি।
ইডেনের ক্যাম্পাস ও হলগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে। সম্প্রতি যে অভিযোগগুলো সামনে এসেছে এ বিষয়ে প্রশাসনের সুরাহা করে জাতির সামনে তুলে ধরা উচিত বলে মনে করে শিক্ষার্থীরা। তারা বলেন, সিট বাণিজ্য, শিক্ষার্থীদের মারধরের মতো ঘটনার আলামত সিসিটিভি ফুটেজে থাকবে। এসব এক একটি প্রমাণ। কিন্তু প্রশাসনের দুর্বল ক্ষমতার কারণে প্রকৃত অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকবে বলে মনে করছেন তারা।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হয়রানির শিকার ॥ ইডেন কলেজে ছাত্রীর সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার। সম্প্রতি ইডেনের নানা বিষয় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইডেন কলেজ ও ইডেন শিক্ষার্থীদের নিয়ে ট্রল করা হচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থী নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। ইডেনের সদ্য বহিষ্কৃত এক সহ-সভাপতি বিষয়টিকে ষড়যন্ত্র বলে মনে করছেন। তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে ইডেন কলেজে কেউ তার সন্তান বা বোনকে ভর্তি করতে দ্বিতীয়বার ভাববেন।

এসব গুজব জামায়াত-বিএনপির লোক ছড়াচ্ছে। এই ঘটনাকে বিরোধীরা একটি সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছে। অনেক অভিভাবক মোবাইলে এমন ঘটনার সত্যতা আমাদের কাছে জানতে চাচ্ছেন। আমরা তাদেরকে বুঝিয়ে বলছি। তবে ক্রমাগত এমন চলতে থাকলে আইনী ব্যবস্থা নেয়া হবে।
সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে মামলা ॥ চাঁদাবাজি ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে ইডেন কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি তামান্না জেসমিন রিভা ও সাধারণ সম্পাদক মোছাঃ রাজিয়া সুলতানাসহ আটজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। মামলাটি লালবাগ থানাকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। এ মামলার অন্য আসামিরা হলেন ইডেন কলেজের নুজহাত ফারিয়া রোকসানা, আয়েশা ইসলাম মিম, নূরজাহান, ঋতু আক্তার, আনিকা তাবাসুম স্বর্ণা ও কামরুন নাহার জ্যোতি। এছাড়া মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও ২৫-৩০ জনকে আসামি করা হয়েছে। বুধবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মোস্তফা রেজা নূরের আদালতে এ মামলা করেন জান্নাতুল ফেরদৌসী।
আদালত বাদীর জবানবন্দী গ্রহণ করে রাজধানীর লালবাগ থানাকে তদন্ত করে আগামী ২৩ অক্টোবর প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন।
বক্তব্য প্রত্যাহার চেয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মানবন্ধন ॥ ছাত্রলীগের বহিষ্কৃত সাংগঠনিক সম্পাদক সামিয়া আক্তার বৈশাখী দাবি করে বলেছিলেন, সুন্দরী মেয়েদের ছবি তুলে তাদেরকে দেহ ব্যবসা করতে বাধ্য করানো হয়। বিতর্কিত এই বক্তব্য প্রত্যাহার চেয়ে বৈশাখীকে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানিয়েছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তারা বলেছেন, ইডেনে পড়াশোনা করতে এসেছি। আমরা সুনামের সঙ্গে শিক্ষাজীবন শেষ করতে চাই। এখানে সুষ্ঠু ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।

ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে যদি বারবার সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভুক্তভোগী হতে হয়, তাহলে এই ছাত্র রাজনীতি আমরা চাই না। মঙ্গলবার আয়োজিত মানববন্ধনে সাধারণ শিক্ষার্থীরা বলেন, ছাত্রলীগ নেত্রীদের নিজেদের মধ্যে আধিপত্য ও স্বার্থের দ্বন্দ্বের কারণে কেন ইডেন কলেজ কলুষিত হবে ? তারা তো সাধারণ শিক্ষার্থীদের সমস্যা বা সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে কথা বলে না। সব শিক্ষার্থী রাজনীতি করে না। তাহলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের চারিত্রিক অপবাদ দেয়া হবে কেন ? এটা অন্যায়। তাকে (বৈশাখী) এ জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে। কলেজের সম্মানহানির জন্য ছাত্রলীগ নেত্রী বৈশাখীকে বহিষ্কারের দাবি জানানো হয়।
প্রসঙ্গত, গত রবিবার মধ্যরাতে ইডেন মহিলা কলেজ ছাত্রলীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম স্থগিত করেছে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। সেই সঙ্গে ‘শৃঙ্খলা পরিপন্থী কার্যকলাপে’ জড়িত থাকার অপরাধে, প্রাথমিকভাবে প্রমাণের ভিত্তিতে ইডেন মহিলা কলেজ ছাত্রলীগের ১৬ জনকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করার কথা জানানো হয়।