ইউরিন ইনফেকশনের কারন ও প্রতিকার

অনলাইন ডেস্ক।।
অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস ও দূষণের কারণে ইউরিন ইনফেকশন এখন সাধারণ একটি সমস্যা। এর কারণ ও প্রতিকার জানতে আগে জেনে নেওয়া যাক কিডনির কাজ ও মূত্রতন্ত্র সম্পর্কে।
মানবদেহে প্রতিনিয়ত যে বর্জ্য তৈরি হয় তা মল-মূত্রের মাধ্যমে বেরিয়ে যায়। ইউরিন তথা প্রস্রাব মূলত কিডনি দিয়ে রক্তকে ছেঁকে তৈরি হয়। মানুষের দুটো কিডনি প্রতি মিনিটে ১ লিটারেরও বেশি রক্ত ছেঁকে নিচ্ছে। এই ছাঁকনের মাধ্যমে রক্তের ক্ষতিকর বর্জ্য যথা ক্রিয়েটিনিন, ইউরিক এসিড, অ্যামোনিয়া ইত্যাদি শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। কোনও কারণে কিডনিতে ইনফেকশন হলে বা কিডনি রোগ হলে রক্তে ক্রিয়েটিনিন, ইউরিক এসিড এসব কিডনি ছাঁকতে পারে না।
মূত্রতন্ত্র:মূলত কিডনি দিয়ে মূত্র তৈরি হলেও মূত্রতন্ত্র বলতে ৪টি অংশকে বোঝায়—
কিডনি: প্রতি মিনিটে ১২০০ মিলিলিটার রক্ত ছাঁকন হয়ে ১-২ মিলিলিটার ইউরিন তৈরি হয়।
ইউরেটার:এটি কিডনি থেকে মূত্রথলি পর্যন্ত একটা সরু নালিকা, যার মাধ্যমে কিডনিতে তৈরি হওয়া ইউরিন মূত্রথলিতে গিয়ে জমা হয়।
মূত্রথলি বা ব্লাডার:যেখানে মূত্র জমা হয়।

ইউরেথ্রা বা মূত্রনালীঃ মূত্রথলি থেকে যে পথ দিয়ে মূত্র বেরিয়ে যায়।
ইউরিন ইনফেকশন কী?
মূত্রতন্ত্রের ৪টি অংশের যেকোনও অংশ যদি জীবাণু দিয়ে সংক্রমিত হয়, তবে সেটাকে ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন বা ইউরিন ইনফেকশন বলে। এটি নারী-পুরুষ সবার হতে পারে। তবে নারীদের মধ্যে সংক্রমণের হার বেশি। কারণ তাদের মূত্রনালী পায়ুপথের খুব কাছাকাছি থাকে। তাই জীবাণু প্রবেশ করে ইনফেকশনের আশঙ্কা বাড়ায়।
ইউরিন ইনফেকশনের উপসর্গঃ
১। প্রস্রাবের সময় মূথনালীতে জ্বালাপোড়া করবে কিংবা ব্যথা করবে।
২। গায়ে গায়ে জ্বর থাকবে। কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসতে পারে। কিডনিতে ইনফেকশন হলে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসবে। মূত্রতন্ত্রের অন্যান্য অংশে ইনফেকশন হলে জ্বর এলেও সাধারণত কাঁপুনি হয় না। অনেক নারী বলে থাকেন, তাদের দীর্ঘদিন গায়ে জ্বর লেগে থাকে। প্রস্রাবেও জ্বালাপোড়া করে। এ ক্ষেত্রে পরীক্ষা করলে দেখা যায়, তাদের ইউরিন ইনফেকশন রয়েছে।
৩। তলপেটে ব্যথা কিংবা প্রস্রাবের সময় ব্যথা হবে।
৪। প্রস্রাবের রঙ বদলে যাবে।
৫। কিছুক্ষণ পরপর প্রস্রাবের বেগ হবে এবং প্রস্রাব করার পরও মনে হবে আবার হবে।
৬। বমি বমি ভাব হবে। বমিও হতে পারে। খাওয়ার রুচি কমে যাবে। শরীর দুর্বল লাগবে।
৭। প্রস্রাবে অস্বাভাবিক দুর্গন্ধ পাওয়া যাবে।

ইউরিন ইনফেকশনের কারণঃ

ইউরিন ইনফেকশন অনেক কারণে হয়। মূল কারণ হচ্ছে মূত্রপথে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ। আরও যেসব কারণে হয়—
১। মলত্যাগের সময় পায়ুপথ থেকে ব্যাকটেরিয়া মূত্রনালীতে প্রবেশ করলে।
২। মলত্যাগের পর পায়ু পথে পেছন থেকে সামনের দিকে টয়লেট টিস্যু ব্যবহার করলে টিস্যুর সংস্পর্শে ব্যাকটেরিয়ার অনুপ্রবেশ করতে পারে।
৩। শারীরিক সম্পর্কের সময়ও সুরক্ষাবিধি মেনে না চললেও ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করতে পারে।
৪। কোষ্ঠকাঠিন্য থাকলে (বিশেষ করে শিশুদের) ইউরিন ইনফেকশনের ঝুঁকি বাড়ে।
৫। যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, বা যাদের ডায়াবেটিস বা ক্যান্সার রয়েছে, অথবা যারা ক্যানসারের ওষুধ নিচ্ছেন তাদের ক্ষেত্রেও এ ইনফেকশনের ঝুঁকি বেশি।
৬। যারা হাই কমোড ব্যবহার করেন তাদেরও ঝুঁকি বেশি। কারণ কমোডের বসার জায়গায় লেগে থাকা ব্যাকটেরিয়া মূত্রনালীতে চলে আসতে পারে।
৭। যারা অনেকক্ষণ প্রস্রাব আটকে রাখেন, তাদের ক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বেড়ে গিয়ে ইউরিন ইনফেকশন হতে পারে।
৮। পানি কম পান করলে ইউরিন আউটপুট কম হয়। এক্ষেত্রেও ব্যাকটেরিয়া জমে ইনফেকশন হতে পারে।
৯। ক্যাথিটার লাগালেও ইউরিন ইনফেকশন হতে পারে। তা ছাড়া যাদের মূত্রপথে পাথর তৈরি হয় কিংবা প্রস্টেট গ্রন্থি বড় হয়, তাদেরও ইউরিন ইনফেকশনের ঝুঁকি বেশি।
১০। টাইট পোশাকের কারণে ঘাম থেকে আসা ব্যাকটেরিয়াও ইনফেকশন ঘটায়। এ ছাড়া নিয়মিত গোসল, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় না রাখলেও এ রোগ হতে পারে।
১১। গর্ভবতী অবস্থায় ইনফেকশন দেখা দিতে পারে অনেকের।
১২। মাসিকের রাস্তায় সঠিকভাবে স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করতে না পারলে কিংবা মাসিকের বর্জ্য মূত্রপথের সংস্পর্শে এসেও ইনফেকশন ঘটাতে পারে।
প্রতিরোধঃ
১। টয়লেট টিস্যু ব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকতে হবে।
২। দিনে ৩-৪ লিটার পানি পান করতে হবে। বেশি পানি পান করলে প্রস্রাব বাড়বে। তাতে জীবাণু শরীর থেকে বেরিয়ে যাবে। ইনফেকশনের ঝুঁকি কমবে।
৩। কুসুম গরম পানিতে গোসল করলে ইনফেকশনের ঝুঁকি অনেক কমে।
৪। যাদের বারবার ইনফেকশন হয়, তারা পুকুরের পানি বা অপরিষ্কার পানিতে গোসল করা থেকে বিরত থাকবেন।
৫। বেশিক্ষণ প্রস্রাব আটকে রাখা যাবে না।
৬। শারীরিক সম্পর্কের আগে-পরে প্রস্রাব করে নেওয়া উত্তম। এক্ষেত্রে পরিচ্ছন্নতা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
৭। ঢিলেঢালা সুতির কাপড় পরতে হবে। টাইট জামা পরলে ইউরেথ্রা ও সেটার আশপাশ বেশি ঘামতে পারে।
৮। নিয়মিত গোসল করতে হবে এবং নারীদের ক্ষেত্রে মাসিকের সময় সঠিকভাবে স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করতে হবে।
৯। যাদের বার বার ইনফেকশন হয়, তারা ডাক্তারের পরামর্শে অ্যান্টিবায়োটিক খেতে পারেন।
১০। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
১১। প্রচুর ভিটামিন এ, ই, সি সমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে। টক ফল, আমড়া, পেয়ারা, শসা এবং প্রচুর শাকসবজি খেতে হবে।

ইউরিন ইনফেকশনের চিকিৎসাঃ
যেহেতু ইউরিনারি ইনফেকশন একটা ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণজনিত রোগ, তাই এটি দেখা দিলে দ্রুত ডাক্তার দেখাতে হবে। চিকিৎসায় দেরি করলে কিডনিতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে ইনফেকশন।
ইউরিন মাইক্রোসকোপিক ও ইউরিন কালচার সেনসিটিভিটি পরীক্ষা করে অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করা আবশ্যক। বারবার ইনফেকশন হলে দীর্ঘমেয়াদি অ্যান্টিবায়োটিক লাগতে পারে।

লেখক: সেন্টার ফর ক্লিনিক্যাল এক্সিলেন্স এন্ড রিসার্চ-এর সিইও।