আয়-ব্যয়ে ফারাক বাড়ছেই

নিউজ ডেস্ক।।

দেশের মানুষের সামগ্রিক আয় বৃদ্ধির হার অব্যাহতভাবে কমছে। সরকারি চাকরির মতো কিছু ক্ষেত্রে নিয়োজিত ছাড়া বেসরকারি পর্যায়ের অধিকাংশ খাতে নিয়োজিত কর্মজীবী ও শ্রমজীবীদের আয় কমেছে। অপরদিকে জীবনযাত্রার ব্যয় লাগাতারভাবে বাড়ছে। বিশেষ করে খাবারের পেছনে খরচ অত্যাধিক বেড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাব অনুযায়ী, গত অক্টোবর মাসে ভোক্তামূল্য সূচকে জীবনযাত্রার ব্যয় যেখানে ৮ দশমিক ৯১ শতাংশ বেড়েছে, সেখানে একই মাসে মজুরি বা আয় বেড়েছে ৬ দশমিক ৯১ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যয়ের তুলনায় আয় ২ শতাংশ কম বেড়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিবিএসের তথ্যের চেয়ে প্রকৃত মূল্যস্ফীতি আরও বেশি। সে হিসাবে আয়-ব্যয়ের এ ব্যবধান আরও বেশি।

আয়-ব্যয়ের এমন পরিস্থিতিতে সীমিত ও নিম্ন আয়ের মানুষে পক্ষে টিকে থাকাটাই যেখানে মুশকিল হয়ে পড়েছে, সেখানে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব ধরনের পণ্যের দাম লাগামছাড়া বাড়ছে। যা বেঁচে থাকাকে আরও কঠিন করে তুলছে। এরই মধ্যে গত বৃহস্পতিবার তেল ও চিনির দাম বাড়ানো হয়েছে। অপরদিকে ওএমএসে গরিবের আটার দামও বাড়িয়েছে সরকার। এতে কাটছাঁটের সংসারে নতুন করে খাবার খরচে কাঁচি চালাতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিডিপি) এক গবেষণায় উঠে এসেছে, মাছ-মাংস না খেয়েও ঢাকা শহরের চার সদস্যের এক পরিবারকে খাবার কিনতে মাসে গড়ে ৯ হাজার ৫৯ টাকা খরচ করতে হয়। মাছ-মাংস খেলে ওই পরিবারের খাবারে খরচ হয় ২২ হাজার ৪২১ টাকা। এটি অক্টোবর মাসের হিসাব। গত পৌনে চার বছরে খাবার কেনায় ওই সব পরিবারের খাবার খরচ ২৭ থেকে ৩৮ শতাংশ বেড়েছে। ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসে ঢাকা শহরের একটি পরিবার মাছ-মাংস খেলে খাবারে খরচ হতো ১৭ হাজার ৫৩০ টাকা। আর মাছ-মাংস না খেলে এ খরচ ছিল ৬ হাজার ৫৪১ টাকা।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) সম্প্রতি এক গবেষণায় জানায়, অতি গরিব শ্রেণির একজন মানুষ তার ব্যয়ের ৩২ শতাংশ খরচ করেন চাল কিনতে। গরিব মানুষের ক্ষেত্রে এই হার ২৯ শতাংশ। এ ছাড়া গরিব নন, এমন ব্যক্তি তার ব্যয়ের এক-পঞ্চমাংশ চাল কেনায় খরচ করেন। বাজারে দীর্ঘ সময় ধরে এ চালের বাজারেই অস্থিরতা বিরাজ করছে। গরিবের মোটা চালের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে রাখা হয়েছে। পাওয়া গেলেও তা ৫০ টাকার আশপাশে বিক্রি হচ্ছে। এক মাস আগেও যা ৪৮ টাকায় কেনা গেছে। অপরদিকে সাধারণ মানের চিকন চাল (মিনিকেট) বিক্রি হচ্ছে ৬৫ থেকে ৭৫ টাকার মধ্যে। নামিদামি ব্র্যান্ডের চিকন চালের দাম আরও বেশি।

চালের দাম বাড়লে সাধারণত আটার ওপর নির্ভরতা বেড়ে যায়। কিন্তু সে আটার দামও এখন চালের দামকে ছাড়িয়ে গেছে। খোলা আটার কেজি এখন ৬০ থেকে ৬৫ টাকায় ঠেকেছে। মাসখানেক আগেও যা ৫৫ টাকায় কেনা গেছে। কয়েকটি বিপণনকারী কোম্পানি আটার দুই কেজির প্যাকেটের দাম নতুন করে ১২ টাকা বাড়িয়ে ১৪৪ টাকা নির্ধারণ করেছে। অর্থাৎ কেজিতে ৬ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। অপরদিকে খোলাবাজারে বিক্রি (ওএমএস) কর্মসূচির আওতায় যে আটা বিক্রি করা হয়, তার দামও কেজিপ্রতি ৬ টাকা বাড়িয়েছে সরকার।

এদিকে তেল ও চিনি বিপণনকারী কোম্পানিগুলো গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) সম্মতি নিয়ে পণ্য দুটির দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। ওই দিন থেকেই সয়াবিন তেলের এক লিটারের বোতল ১৭৮ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৯০ টাকা এবং পাঁচ লিটারের বোতল ৮৮০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৯২৫ টাকা করে। একই সঙ্গে খোলা সয়াবিনের দামও ১৪ টাকা বাড়ানোর পাশাপাশি পাম তেলের দামও বাড়ানোর ঘোষণা দেয় তারা। অপরদিকে চিনির দাম বাড়িয়ে এক কেজির প্যাকেট ১০৮ টাকা এবং খোলা চিনির কেজি ১০২ টাকা করেছে ব্যবসায়ীরা। যদিও বাজারের বেশিরভাগ দোকানে এখন উধাও প্যাকেট চিনি। খোলা চিনির কেজি বিক্রি হচ্ছে ১১০ থেকে ১১৫ টাকা পর্যন্ত। এদিকে দাম বাড়ার পরও চিনি ও তেল নিয়ে ব্যবসায়ীদের লুকোচুরি থামেনি। চাহিদা দিয়েও পণ্য দুটি পাচ্ছেন না অনেক খুচরা বিক্রেতা।

মসুর ডালের দাম মাসের ব্যবধানে বেড়ে দানাভেদে প্রতিকেজি বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১৪০ টাকা পর্যন্ত। আগে যা ৯৫ থেকে ১৩০ টাকার মধ্যে কেনা গেছে। মুরগি ও ডিমের দাম অপরিবর্তিত থাকলেও তা নিম্ন আয়ের মানুষের নাগালের বাইরে রয়েছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজার ও দেশে ডলারের বাজারে অস্থিরতার কারণে আমদানি কমেছে এবং আমদানিতে খরচও বেড়েছে। এর ফলে আমদানিনির্ভর পণ্যের দাম বাড়ছে। সিটি গ্রুপের পরিচালক বিশ্বজিৎ সাহা বলেন, ‘বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও গ্যাস সংকটে কারখানাগুলোতে উৎপাদন কমে গেছে। স্বাভাবিকভাবেই পণ্য সরবরাহ কমেছে। তা ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়তি দামের পাশাপাশি ডলারের দাম বেড়ে যাওয়া এবং এলসি জটিলতাও রয়েছে। এসব কারণে দাম বাড়াতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে আমরা প্রস্তাব করেছি। যৌক্তিক কারণ ছিল বলেই দাম বাড়ানো হয়েছে।’

বাজারে পণ্যের অস্বাভাবিক দাম বেড়ে যাওয়ায় পরিবারের খরচ চালাতে চোখেমুখে অন্ধকার দেখছেন বেসরকারি অফিসের চাকরিজীবী মো. এনামুল হক। তিনি বলেন, ‘বেতনের ২৫ হাজার টাকায় সংসার চালাতে প্রয়োজনীয় অনেক চাহিদায় কাটছাঁট করতে হচ্ছে। এর মধ্যে প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আবারও বাড়ায় নতুন করে দুশ্চিন্তায় রয়েছি। মাছ, মাংস, দুধ-ডিম অনেক আগেই বাদ দিয়েছি। এখন চাল, ডাল, তেল, আটা কিনতেও হিসাব করতে হচ্ছে।’

কারওয়ানবাজারের দিনমজুর মো. হানিফ বলেন, ‘দামি খাবার দূরের কথা, ডাল-ভাতের খরচও কুলাতে পারছি না। যে দাম বাড়ছে, তাতে না খেয়ে থাকতে হবে। রুটি খাওয়ার পথ নাই, আটার দাম চালের দামের সমান। অনেক আগে থেকেই কম খেয়ে বেঁচে আছি। খরচ বাচাতে আর কত খাওয়া কমাব।’ জীবনযাত্রায় কষ্টের এই চিত্র শুধু হানিফে একার নয়, রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের নিম্ন আয়ের কিংবা মধ্যম আয়ের মানুষেরও।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিসংখ্যান ব্যুরোর মূল্যস্ফীতির হিসাবের চেয়ে প্রকৃত মূল্যস্ফীতি অনেক বেশি। অপরদিকে মূল্যস্ফীতি যে হারে বাড়ছে তা মজুরি বৃদ্ধিকে খেয়ে ফেলছে। বৈশ্বিক কারণে বৃদ্ধি পাওয়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। তবে মূল্যস্ফীতিতে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর কষ্ট লাঘবে নানা উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এদিকে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিষয় সামনে রয়েছে। ফলে মূল্যস্ফীতির পারদ নিচের দিকে নয়, ওপরের দিকেই থাকবে বলে ধারণা করছেন তারা। এই উচ্চ মূল্যস্ফীতির নেতিবাচক প্রভাব প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর পড়তে শুরু করেছে। নিম্নমধ্য আয়ের মানুষও নতুন করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর তালিকায় যুক্ত হওয়ায় এই সংখ্যা বাড়ছে। ডলার সংকট ও মূল্যস্ফীতি সমাধান করতে গিয়ে বিপরীতমুখী পদক্ষেপ না নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশ^ব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন।

মূল্যস্ফীতি ও খাদ্য নিরাপত্তায় বাংলাদেশে একটি অস্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে উল্লেখ করে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও প্রকৃত মজুরি কমে যাওয়ায় খাদ্য নিরাপত্তায় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অভ্যন্তরীণ বাজারে কঠোর তদারকি করে দেশে উৎপাদিত পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ঠেকানো সম্ভব। প্রয়োজন চালের দাম সহনীয় রাখতে বাজার কৌশল নির্ধারণ করা। এর পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির চাপে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত গরিব মানুষদের বাজেটের মাধ্যমে নগদ ও খাদ্য সহায়তা দিয়ে সুরক্ষা দিতে হবে।

কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান  বলেন, নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য ভর্তুকির পরিমাণ বাড়িয়ে হলেও তাদের কাছে পণ্য সরবরাহ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে আমদানি মূল্যের সঙ্গে সমন্বয় করে পণ্যের দাম নির্ধারণ করাও প্রয়োজন। সবার আগে পণ্যের সরবরাহে কড়া নজরদারি থাকতে হবে।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার বলেন, ‘নিয়মিত বাজার তদারকিতে তেল, চিনি ও আটার সরবরাহে বিশেষ নজর রাখা হয়েছে। আমরা পণ্যগুলো খতিয়ে দেখছি। তবে আগের চেয়ে এগুলোর সরবরাহ বেড়েছে। তারপরও সরবরাহে কোনো কারসাজি হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’