আসক্তি কাটাতে স্কুলে ফোন জমা

শিক্ষাবার্তা ডেস্কঃ এসএসসি পরীক্ষার্থী মেজো মেয়েকে নিয়ে বড় স্বপ্ন ছিল কৃষক বাবার। ওই কিশোরী পড়াশোনায়ও ছিল ভালো। তাই বাবার আশা ছিল, বড় হয়ে দেশ ও দশের কাজে লাগবে সে। তবে একটি দুর্ঘটনায় মেয়েকে হারিয়ে মুষড়ে পড়েছেন গুরুদাসপুর উপজেলার খুবজীপুর উত্তরপাড়ার ওই বাসিন্দা। তিনি এর জন্য দুষছেন স্মার্টফোনে আসক্তিকে।

সোমবার বিষ পানে আত্মহত্যা করে মেয়েটি। পরিবারের ভাষ্য, বছরখানেক আগে অনলাইন ক্লাস ও অ্যাসাইনমেন্টের জন্য বাবাকে দিয়ে স্মার্টফোন কেনায় সে। ফেসবুকেও খোলে নিজের নামে প্রোফাইল। এর মাধ্যমে পরিচয় হয় কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার এক তরুণের (১৯) সঙ্গে। পরিচয় গড়ায় প্রেমে। রোববার প্রেমিকার সঙ্গে দেখা করতে ছুটে আসে সে। সেদিনই স্থানীয় কাজী অফিসে বিয়ে করে। মেয়ের পরিবার বিষয়টি জেনে দু’জনকেই বকাঝকা করে। তবে এক পর্যায়ে ছেলেটিকে পরিবার নিয়ে আসার শর্ত দেয়। সে অনেক চেষ্টা করেও যোগাযোগে ব্যর্থ হয়। এক ফাঁকে দু’জন মিলে কীটনাশক পান করে। গুরুতর অবস্থায় স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে নিয়ে যায় গুরুদাসপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। সেখানে মৃত্যু হয় মেয়েটির। আশঙ্কাজনক অবস্থায় রাজশাহী মেডিকেলে পাঠানো হয় তরুণকে।

মেয়েটির বাবা বলেন, ‘অল্প বয়সের একটি ভুল সিদ্ধান্ত আমাদের স্বপ্ন নষ্ট করে দিয়েছে। ওর মতো এমন ভুল যেন আর কোনো ছেলেমেয়ে না করে- সে বিষয়ে সব অভিভাবককে সচেতন হতে হবে।’

মেয়েটি পড়ত খুবজীপুর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে। ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আনিসুর রহমান বলেন, ওই কিশোরী এসএসসির নির্বাচনী পরীক্ষায় মানবিক বিভাগ থেকে ভালো ফল করেছিল।

তাঁর বিদ্যালয়ের সর্বশেষ নির্বাচনী পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১৫৯ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় ৪০ জন খারাপ ফল করে। পরে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের নিয়ে সভা করেন। সেখানে অভিভাবকরা অভিযোগ করেন, তাঁদের সন্তানরা সারাক্ষণ স্মার্টফোনে ব্যস্ত থাকে। বারবার বলার পরও পড়তে বসে না।

ওই সভায় প্রধান শিক্ষক আনিসুর রহমান স্মার্টফোনে আসক্তির কুফল সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে খোলাখুলি আলোচনা করেন। তা শুনে ৪০ শিক্ষার্থী এরই মধ্যে স্বেচ্ছায় ব্যবহূত স্মার্টফোন বিদ্যালয়ে জমা দিয়েছে। ১০ জানুয়ারি থেকে মোবাইল ফোন জমা দেওয়া শুরু করে।

ফোন জমা দেওয়ার পর প্রথম প্রথম খারাপ লাগত বলে জানায় এসএসসি পরীক্ষার্থী শিহাব উদ্দিন, আমিরুল ইসলাম, সোহেল রানা ও শাহিন আলম। তারা বলে, প্রধান শিক্ষকের পরামর্শে তাদের চোখ খুলেছে।

সচ্ছল না হলেও ছেলের ভবিষ্যতের চিন্তা করে ঋণের টাকায় বছরখানেক আগে স্মার্টফোন কেনেন আব্দুর রাজ্জাক। তিনি বলেন, ছেলে সারাক্ষণই ফোনে ব্যস্ত থাকত। অনেক বুঝিয়ে বিদ্যালয়ে ফোনটি জমা দিয়েছে। এখন পড়াশোনায় সময় দিচ্ছে।

প্রধান শিক্ষক মো. আনিসুর রহমান বলেন, ‘প্রত্যেক শিক্ষার্থী আমার কাছে আমার সন্তানের মতো। সার্বক্ষণিক চেষ্টা করি, তাদের ভালো মানুষ হিসেবে সুশিক্ষিত করে গড়ে তোলার।’ এবার নির্বাচনী পরীক্ষায় যারা খারাপ করেছে, তাদের বেশিরভাগই ছিল স্মার্টফোনে আসক্ত। তাই তাদের পড়াশোনায় মনোযোগী করতে বিদ্যালয়ে ফোন জমা দিতে বলেছিলেন। তাঁকে সম্মান ও বিশ্বাস করে শিক্ষার্থীরা ফোন জমা দিয়েছে।

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. ওয়াহেদুজ্জামন বলেন, শিক্ষার্থীদের ফোন, মাদকসহ সব অপরাধ থেকে মুক্ত রাখতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সভা-সেমিনারের পাশাপাশি খেলাধুলার আয়োজন করা হচ্ছে। ভালো ফলাফলের আশায় যেসব শিক্ষার্থী ফোন জমা দিয়েছে, তাদের ধন্যবাদ।

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/০১/১৮/২৩   

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়