আবার মাঠে শিক্ষার্থীরা

নিউজ ডেস্ক।।

গতকাল বেলা ১২টা। রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা ফার্মগেটে রাস্তা আটকে সব গাড়ির লাইসেন্সসহ কাগজপত্র তল্লাশি করছিল শিক্ষার্থীরা। কোনো অসংগতি পেলে গাড়ি আটকে রাখা হচ্ছিল। এ সময় সেখানে ছিল ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের একটি গাড়ি। পুলিশের চালক দেখাতে পারলেন না ড্রাইভিং লাইসেন্স। শিক্ষার্থীদের দাবি, পুলিশের ওই বাসচালকের লাইসেন্স নেই।

তবে বাসচালক দাবি করেছেন তার লাইসেন্স আছে, সেটা অফিসে রাখা। পরে বেলা আড়াইটায় বাসটি ছেড়ে দেয় শিক্ষার্থীরা। এর আগে তারা বাসটির সামনে ও পাশে লিখে দেয়- ‘পুলিশের কেন লাইসেন্স নাই’। ওই বাসের গায়ে মার্কার কলম ও স্প্রে রং দিয়ে নানা স্লোগান লিখে দেওয়া হয়। অ্যাম্বুলেন্স ছাড়া সব গাড়িকে কাগজপত্রের এ পরীক্ষা দিতে হয়েছে শিক্ষার্থীদের কাছে। তিন বছরের ব্যবধানে নিরাপদ সড়কের দাবিতে গতকাল আবার মাঠে নেমে এ দায়িত্বে দেখা গেল সাধারণ ছাত্রদের।

এর আগে ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই বাসচাপায় রাজধানীর কুর্মিটোলায় শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী প্রাণ হারান। তখন শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদে কেঁপে ওঠে পুরো দেশ। টানা ১১ দিন রাজপথে ছিল শিক্ষার্থীরা। বুধবার গুলিস্তান গোলচত্বরে হল মার্কেটের সামনে সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ির ধাক্কায় নটর ডেম কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী নাঈম হাসানের মৃত্যু হয়।

এর পরই মৃত্যুতে দোষীদের বিচার ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে ফের ফুঁসে ওঠে শিক্ষার্থীরা। গতকাল দিনের বেশির ভাগ সময়ই শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে উত্তাল ছিল রাজধানী। সকাল থেকে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা গুলিস্তান, সায়েন্স ল্যাবরেটরি, শান্তিনগর, উত্তরা, ফার্মগেটসহ বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ-সমাবেশ করেছে। এ সময় ব্যস্ত সড়কে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। দেখা দেয় তীব্র যানজট। এমন পরিস্থিতিতে অনেককে হেঁটে নিজ নিজ গন্তব্যে পৌঁছাতে দেখা গেছে।

জানা যায়, নটর ডেম কলেজের নাঈমের সহপাঠী শিক্ষার্থীরা মতিঝিল, গুলিস্তান ও নগর ভবনের প্রধান ফটকে বিক্ষোভ করেছেন। শান্তিনগর, কাকরাইল ও বেইলি রোডে বিক্ষোভ করেছেন ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও মতিঝিল সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। আর ফার্মগেটে সড়কে বিক্ষোভ করেছেন তেজগাঁও কমার্স কলেজ, আইডিয়াল কমার্স কলেজ, বিএএফ শাহীন কলেজ, সেন্ট যোসেফ উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়, সরকারি বিজ্ঞান কলেজ ও হলিক্রসের শিক্ষার্থীরা।

সায়েন্স ল্যাব এলাকায় সড়ক অবরোধ করেন বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও মুন্সী আবদুর রউফ স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা। সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, নাঈমের মৃত্যুর জন্য দোষীদের বিচার দাবিতে গতকাল বেলা ১১টার পর মতিঝিল শাপলা চত্বরে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থীরা। পরে তারা মিছিল নিয়ে গুলিস্তান জিরো পয়েন্টে অবস্থান নেন। সেখানে তাদের ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ স্লোগানে উত্তাল হয়ে ওঠে গুলিস্তান এলাকা। এ সময় গুলিস্তান এলাকায় সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

সেখান থেকে মিছিল নিয়ে শিক্ষার্থীরা ডিএসসিসি কার্যালয়ের (নগর ভবন) সামনে অবস্থান নেন। সেখানে সহপাঠী নাঈমের মৃত্যুর প্রতিবাদে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। এ সময় শিক্ষার্থীরা জানান, তারা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসের সঙ্গে দেখা করতে চান। কেননা এই সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ির চাপায় নাঈমের মৃত্যু হয়েছে। ‘মেয়র তোমার দেখা চাই, নাঈম হত্যার বিচার চাই’ স্লোগান দিতে থাকেন শিক্ষার্থীরা। মেয়রের দেখা না পাওয়ায় শিক্ষার্থীরা নগর ভবনের গেট খুলে ভিতরে প্রবেশ করেন। একপর্যায়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দেখা করেন মেয়র তাপস।

পরে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেন শিক্ষার্থীরা। সহপাঠী নাঈম হাসান নিহতের ঘটনার বিচার না হলে আগামী রবিবার থেকে আবারও রাজপথে নামার হুঁশিয়ারি দিয়ে তারা গুলিস্তানের অবরোধ তুলে নেন। অন্যদিকে গতকাল বেলা দেড়টায় ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও মতিঝিল সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়ের কয়েক শ শিক্ষার্থী বিক্ষোভ করেছেন শান্তিনগর ও কাকরাইলে। পরে তারা শান্তিনগর মোড় থেকে কাকরাইলের রাজমণি সিনেমা হল মোড় এলাকায় যান। সড়কে অবস্থান নেন।

কিছুক্ষণ থাকার পর পুলিশ সদস্যরা তাদের বুঝিয়ে কাকরাইল মোড়ের দিকে পাঠিয়ে দেন। পরে শিক্ষার্থীদের মিছিলটি কাকরাইল মোড় থেকে রমনা-মগবাজার সড়ক হয়ে বেইলি রোডের দিকে যায়। ফার্মগেট মোড়ে সরকারি বিজ্ঞান কলেজ, তেজগাঁও কমার্স কলেজ, আইডিয়াল কমার্স কলেজ, ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল, বিএএফ শাহীন কলেজ, সেন্ট যোসেফ উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় ও হলিক্রস কলেজের শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করে রাখেন। এ ছাড়া বাসভাড়ায় হাফ পাস ও নিরাপদ সড়কের দাবিও জানিয়েছেন তারা। সেখানে ব্যক্তিগত গাড়ির চালকের লাইসেন্সসহ কাগজপত্র তল্লাশি করতে দেখা যায় তাদের। কোনো অসংগতি পেলে গাড়ি আটকে রাখা হয়। তবে অ্যাম্বুলেন্স চলাচলে কোনো বাধা দেওয়া হয়নি। এ সময় সরকারি বিজ্ঞান কলেজের শিক্ষার্থীরা ১০ দফা দাবি পেশ করেন। আর হলিক্রস কলেজের শিক্ষার্থীরাও আট দফা দাবির কথা জানান।

শিক্ষার্থীদের যত দাবি : গতকালের আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা যে ১০ দফা দাবি জানিয়েছেন তা হলো- যথাযথ তদন্ত করে শিক্ষার্থী নাঈম হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া, জেলা শহরের বিভিন্ন রুটে শুধু শিক্ষার্থীদের জন্য বাস সার্ভিস চালু, স্কুল-কলেজের সামনে হর্ন ও ওভারস্পিডিংয়ের জন্য শিক্ষার্থীদের কাছে জরিমানা ও প্রশাসনের কাছে হস্তান্তরের অধিকার দেওয়া, সব শিক্ষার্থীর হাফ পাস নিশ্চিত করা, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে একাধিক স্পিডব্রেকার নির্মাণ, শহরের প্রতিটি অচল ট্রাফিক লাইটের সংস্করণ এবং সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা, ট্রাফিক আইনের সঠিক প্রয়োগ, জেব্রা ক্রসিংয়ে পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার নিশ্চিত করা, চলন্ত বাসে যাত্রী ওঠানামা করলে প্রতিটি বাসকে আইনের আওতায় আনা এবং সর্বোপরি নিরাপদ সড়ক আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন করা।

শাস্তি চাইলেন মেয়র তাপস : গাড়িচাপায় নটর ডেমের ছাত্র নাঈম হাসানের মৃত্যুর ঘটনায় জড়িত সবাইকে শাস্তি ভোগ করতে হবে বলে জানিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস। গতকাল সিটি করপোরেশনের সামনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের এ প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। মেয়র বলেন, ‘আমি আপনাদের কাছে ওয়াদা করছি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন থেকে ইনশা আল্লাহ সমস্ত জঞ্জাল মুক্ত করব, উপড়ে ফেলব।

যে গাড়িচালকের দায়িত্ব ছিল সেই চালক সে দায়িত্ব পালন করেনি, সে আরেকজন ভাড়াটিয়া চালক দিয়ে গাড়ি চালিয়েছে। সুতরাং সবাইকেই শাস্তি ভোগ করতে হবে। যার দায়িত্ব ছিল তাকে আমরা সাময়িক বরখাস্ত করেছি, তাকে ইনশা আল্লাহ চাকরি থেকে অপসারণ করব। যে গাড়ি চালাচ্ছিল সেই খুনির সর্বোচ্চ শাস্তি আমরা নিশ্চিত করব। আপনাদের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে আমি বলি, অবশ্যই সেই খুনির ফাঁসি চাই।’