আনারকলির বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা মিলেছে, বিভাগীয় মামলা

মিজানুর রহমান।।

মাদক ‘মারিজুয়ানা’ কাণ্ডে জাকার্তা থেকে প্রত্যাহার হওয়া বাংলাদেশি কূটনীতিক কাজী আনারকলির বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে সরকারি তদন্ত কমিটি। গত সপ্তাহে পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেনের কাছে রিপোর্ট জমা দিয়েছেন তদন্ত কমিটির প্রধান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (পূর্ব) মাশফি বিনতে শামস। মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন অনুবিভাগ সূত্র জানিয়েছে, তদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পর কাজী আনারকলিকে ওএসডি করা হয়েছে। আগেই তার বহিঃবাংলাদেশ ছুটি বাতিল হয়েছিল। তদন্ত কমিটির সুপারিশ এবং পররাষ্ট্র সচিবের নির্দেশনা মতে মন্ত্রণালয়ের লিগ্যাল উইং তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করেছে।

ইন্দোনেশিয়ায় বাংলাদেশের উপ-রাষ্ট্রদূতের দায়িত্বপালনকারী কাজী আনারকলির দক্ষিণ জাকার্তার বাসভবনে নিষিদ্ধ মাদক মারিজুয়ানা রয়েছে এবং নাইজেরিয়ান বয়ফ্রেন্ডসহ তিনি তা নিয়মিত সেবন করেন এমন অভিযোগে দেশটির মাদক নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ গত ৫ই জুলাই অভিযান চালায়। ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী দায়মুক্তির আওতাধীন থাকলেও সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকায় ইন্দোনেশিয়ান মাদক নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ সেটি উপেক্ষা করেই তার অ্যাপার্টমেন্ট টাওয়ারে অভিযান চালায় এবং তাকে আটক করে নিয়ে যায়। প্রায় ২৪ ঘণ্টা তিনি ইন্দোনেশিয়ার মাদক নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের ডিটেনশন সেন্টারে বন্দি ছিলেন। সেখানে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং ডোপ টেস্ট করা হয়। পরে কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় তিনি মুক্তি পান। দূতাবাসের জিম্মায় তাকে ছেড়ে দেয়া হয়।

বিজ্ঞাপন

শর্ত দেয়া হয় যত দ্রুত সম্ভব ইন্দোনেশিয়ার সীমানা ত্যাগ করতে।
সেই প্রেক্ষিতেই সরকার তাকে দ্রুততম সময়ের মধ্যেই ফিরিয়ে আনে। সেগুনবাগিচার দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, আনারকলির বাসায় ইন্দোনেশিয়ান মাদক নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের অভিযানের বিস্তারিত ঢাকাকে শেয়ার করেছে জাকার্তা। ইন্দোনেশিয়ার রিপোর্টে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট করা হয়েছে। এক. দক্ষিণ জাকার্তার বিশাল ওই অ্যাপার্টমেন্ট টাওয়ারে আরও অনেকে পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস করলেও সেদিন কেবল বাংলাদেশি কূটনীতিক আনারকলির বাসাতে অপারেশন চালানো হয়েছিল। দুই. বাংলাদেশের উপ-রাষ্ট্রদূত কাজী আনারকলির কাছ থেকেই মাদক উদ্ধার হয়েছে, তার বয়ফ্রেন্ডের কাছ থেকে নয়। তিন. ডোপ টেস্টে তথা আনারকলির ইউরিন টেস্টে এটা নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, তিনি প্রায়শই মারিজুয়ানা সেবন করেন।

মাদক নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের অভিযানের ঠিক আগে আগেই তিনি নিষিদ্ধ মাদক মারিজুয়ানা গ্রহণ করেছেন বলে সেই টেস্টে প্রমাণ মিলেছে। মারিজুয়ানা কাণ্ড নিয়ে ১লা আগস্ট সর্বপ্রথম রিপোর্ট করে মানবজমিন। তার আগের দিন প্রতিবেদকের জিজ্ঞাসার জবাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন অনুবিভাগের মহাপরিচালক ডি এম সালাহ উদ্দিন মাহমুদ কূটনীতিক আনারকলিকে জাকার্তা থেকে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি স্বীকার করেছিলেন। এক লিখিত বার্তায় পররাষ্ট্র সচিবের পক্ষে সেদিন তিনি বলেছিলেন- ‘সম্প্রতি জাকার্তায় কর্মরত এক কূটনীতিককে শিষ্টাচার ও তার দায়িত্বের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ আচরণের অভিযোগে ঢাকায় বদলি করা হয়েছে। ওই কর্মকর্তা বিদেশে কর্মকালের স্বাভাবিক সময় পার করেছেন। তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগসমূহ অধিকতর তদন্ত সাপেক্ষে প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

আনারকলির বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা নিশ্চিত হওয়ার পর এখন কি ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে- জানতে পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তাকে পাওয়া সম্ভব হয়নি। তার পক্ষে প্রশাসন অনুবিভাগের মহাপরিচালক এবার কিছু বলবেন কিনা- সেটিও জানতে চাওয়া হয়। কিন্তু তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তবে মন্ত্রণালয়ের অন্য দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছেন যে, তদন্তে কাজী আনারকলির বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত হওয়ার পরপরই তাকে ওএসডি করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু হয়েছে।

এদিকে কাজী আনারকলির নিয়মিত মাদক সেবন, সংরক্ষণ, বিদেশে মাদকসহ ধরা পড়ার মতো গুরুতর অসদাচরণ, নৈতিক স্খলন এবং বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্টের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরও তাকে সাময়িক বহিষ্কার না করে ওএসডি করা এবং এখনো তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা না হওয়ায় সংশ্লিষ্ট অনেকে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। এ নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন চাকরিবিষয়ক গ্রন্থের লেখক অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব ফিরোজ মিয়াও। অস্ট্রেলিয়ায় থাকা বিশ্লেষক ফিরোজ মিয়া মানবজমিনের সঙ্গে আলাপে গতকাল বলেন, মাদক রাখা এবং সেবন দুটোই বাংলাদেশের আইনে গুরুতর অপরাধ।

দেশের একজন নাগরিক এ কাণ্ড ঘটালে যেভাবে আইনের আওতায় আনা হয় কাজী আনারকলি বিদেশে তা করার কারণে একইভাবে এতক্ষণে আইনের আওতায় আনা উচিত ছিল। হয় পুলিশ এই মামলা দায়ের করবে অথবা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ এই মামলা দায়ের করবে জানিয়ে তিনি বলেন, এত বড় নৈতিক স্খলনের অপরাধের প্রাথমিক তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হওয়ার আগেই সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার কথা। একই সঙ্গে ক্রিমিনাল কেসও হবে। কিন্তু তার ব্যত্যয় হলে জনমনে ভুল বার্তা যাবে। মনে হবে পেশাদার কূটনীতিক এবং প্রভাবশালী হওয়ার কারণে গুরুতর অপরাধ সত্ত্বেও তার (আনারকলি) প্রতি সহানুভূতি দেখানো হচ্ছে! তাকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত এবং তার বিরুদ্ধে ক্রিমিনাল প্রসিডিউর শুরু করার সময় এখানো ফুরিয়ে যায়নি উল্লেখ করে ওই এক্সপার্ট বলেন, তা না হলে অন্যরা উৎসাহিত হবেন। তারা আরও বড় অপরাধ করবে এবং এভাবে বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

যদিও সরকার ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে অবিরাম প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। উল্লেখ্য, কূটনীতিক আনারকলি পররাষ্ট্র ক্যাডারের ২০ ব্যাচের কর্মকর্তা। নাইজেরিয়ান বয়ফ্রেন্ড ব্যবসায়ী উইলিয়াম ইরোমেসিলি বেনেডিক্ট ওসিগবেমকে নিয়ে তিনি জাকার্তায় বসবাস করতেন। তথ্য পাচার তথা বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে পররাষ্ট্র ক্যাডারের কোনো কর্মকর্তার বিদেশি বিয়ে বারণ। বিশেষ পরিস্থিতিতে বিয়ে করতে হলে অবশ্যই উপযুক্ত কারণ ব্যাখ্যা করে সরকারের আগাম অনুমতি নিতে হয়। তবে লিভ টুগেদারের কোনো অনুমোদন দেয়া হয় না। কূটনৈতিক দায়িত্ব থেকে আনারকলিকে ফেরত আনার ঘটনা এবারই প্রথম নয়। এর আগে গৃহকর্মী নিখোঁজের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যানজেলেস থেকেও তাকে ফেরত আনা হয়েছিল। মার্কিন সরকারের বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যেই তাকে ফিরিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছিল সরকার।