আধারে থেকেও আলো বিলাচ্ছেন স্কুলশিক্ষক ফারুক

নিউজ ডেস্ক।।

শৈশব ও কৈশোর বয়সে স্বপ্ন ছিল বিচারক হবেন। সেই স্বপ্ন ভেঙে গেছে ফারুক আহমেদের। অষ্টম শ্রেণিতে পড়াশোনা করা অবস্থায় স্কুলে এক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ নিয়েছিলেন তিনি। সেই প্রতিযোগিতায় কাল হয়ে গেছে তার। মাথা নিচু ও পা উপড়ে এক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে চোখের সমস্যা শুরু হয় তার।

চোখের সেই সমস্যা ক্রম্বানয়ে বাড়তে থাকে তার। সময় যত গড়িয়ে যায় ততই অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। এক পর্যায়ে এসে দুচোখের দৃষ্টি শক্তি হারিয়ে ফেলেন ফারুক। তখন থেকে শুরু হয় এক আঁধারের সঙ্গে বসবাস। পরিবার, সমাজ ও দেশের কাছে যেন তিনি এক বোঝা। বন্ধ হয়ে যায় পড়াশোনা। ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায় স্বপ্ন।

তবে মনের দৃঢ় বিশ্বাস, স্বপ্ন ও ইচ্ছাশক্তি থেকে পিছপা হননি ফারুক আহমেদ। অসুস্থ থাকায় পাঁচ বছর পড়াশোনা বন্ধ থাকার পর নতুনভাবে পথযাত্রা শুরু করেন তিনি। সব বাধা ডিঙিয়ে ও মানুষের কটু কথা উপেক্ষা করে বর্তমানে তিনি একটি স্কুলে শিক্ষকতা করছেন।

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার বালিয়া ইউনিয়নের কুমারপুর গ্রামের নুরল হকের ছেলে ফারুক আহমেদ। নয় ভাই বোনের মধ্যে ৬ষ্ঠ তিনি। ২০০৩ সালে দিনাজপুর যুগলী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, ২০০৫ সালে ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজ থেকে মানবিক বিভাগ থেকে এইচএসসি পাস করেন তিনি। পরে জগ্ননাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০১০ সালে স্নাতক ও ২০১২ সালে স্নাতকত্তোর শেষ করেন।

পড়াশোনা শেষ করে স্বপ্ন ছিল অ্যাডমিন ক্যাডার হওয়ার। সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে ৩৪, ৩৫, ৩৬ ও ৩৮ তম বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন ফারুক আহমেদ। বাকি পরীক্ষাগুলোতে উত্তীর্ণ না হলেও ৩৫তম বিসিএসে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। ভাইভায় উত্তীর্ণ হতে না পেরে শিক্ষকতায় পেশায় মনোনিবেশ করেন তিনি।

ফারুক আহমেদ ২০১৬ সালের ১৩ জানুয়ারি সদর উপজেলার ৫০নং বড় বালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। বর্তমানে তিনি সেই প্রতিষ্ঠানেই কর্মরত আছেন। সাংসারিক জীবনে স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে তার। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হলেও তার চমকপ্রদ ক্লাশের ভক্ত শিক্ষার্থীরা।

বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থী পাপন বলল, স্যার অনেক সুন্দর করে ক্লাশ নেন। স্যারের ক্লাশ খুব ভালো লাগে আমাদের। ক্লাশের সময় মনে হয় না যে স্যার চোখে দেখতে পান না। সব বিষয় অনেক সুন্দর করে বুঝিয়ে দেন তিনি।

আরেক শিক্ষার্থী শাহিদা খাতুন বলল, স্যার কখনও কখনও গান শুনিয়ে ক্লাশ শুরু করেন। তিনি যে বিষয়ে ক্লাশ নেন সেই বিষয়টি আর বাসায় তেমন পড়তে হয় না। ক্লাশে থাকা অবস্থায় স্যার সেটি সুন্দর করে বুঝিয়ে দেন।

স্কুলের অফিস সহায়ক পঙ্কজ চন্দ্র বলেন, স্যার যে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী এটা নতুন কেউ এলে বুঝতে পারেন না। উনি অনেক মেধাবী ও চৌকস। সব বিষয়গুলো তিনি ইন্দ্রীয়ভাবে সমাধান করতে পারেন। মাঝে মধ্যে কিছু সমস্যা হলে আমি স্যারকে সহযোগিতা করি। প্রথমতো স্কুলে আসার পর স্যারের উপস্থিতিটা আমি করে দেই। তারপর উনি সবকিছু নিজ থেকে করতে পারেন।

দৃষ্টি প্রতিবন্ধী স্কুলশিক্ষক ফারুক আহমেদ বলেন, ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে জজ হবো। সেই স্বপ্ন নিয়েই পড়াশোনা শুরু করেছিলাম। তবে সেই স্বপ্ন ভেঙেছে চৌদ্দ বছর বয়সে। যখন আমি অষ্টম শ্রেণির ছাত্র তখন স্কুলে মাথা নিচু ও পা উঁচু করে ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করি। সেখান থেকেই অসুস্থতার সৃষ্টি বলে আমি মনে করছি। চিকিৎসা নিলেও ধীরে ধীরে আমার চোখ নষ্ট হয়ে যায়। তারপরে আমার পাঁচ বছর পড়াশোনা করা হয়নি। পরে আমি একজনের মাধ্যমে খবর পাই দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের পড়াশোনা করার সুযোগ রয়েছে। আমি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আবার পড়াশোনা শুরু করি।

সমাজের মানুষের কটু কথা ও প্রতিবন্ধকতা নিয়ে তিনি বলেন, অনেক প্রতিবন্ধকতার শিকার হতে হয়েছে। পদে পদে বিড়ম্বনা পোহাতে হয়েছে। এক কথায় প্রতিটা মুহূর্ত ছিল দুশ্চিন্তার। আমরা যারা দৃষ্টি প্রতিবন্ধী তাদের জন্য আরও সমস্যা। কারণ আমাদের সঙ্গে আরেকজনকে নিয়ে পড়াশোনা ও পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হয়। সেই ব্যক্তিটি আবার দুই ক্লাশের নিচের হতে হবে। এগুলো অনেক বেশি কঠিন ছিল। আর দেশের বর্তমান অবস্থাটা এমন প্রতিবন্ধী হলেও তাকে নানান কথা শুনতে হয়। তবে এটাকে আমি সহজভাবে দেখেছি। আমি মনকে বলেছি একদিন এর জবাব কাজের মাধ্যমে দেব। ইনশাআল্লাহ এখন দিয়েছি তারা চুপচাপ।

পড়াশোনাসহ নিজের সফলতার অনুপ্রেরণা হিসেবে স্ত্রীকে নিয়ে তিনি বলেন, আমি দ্বাদশে পড়াশোনা করা অবস্থায় বিয়ে করি। আজকে আমার এ অবস্থানের জন্য যে মানুষটির অবদান সবচেয়ে বেশি তিনি হলেন আমার স্ত্রী। নানা মানুষের কটু কথার আঘাত ভুলে যিনি আমাকে ছেড়ে যাননি। কেউ প্রতিবন্ধী হলে নিজেকে বোঝা মনে করবেন না। হাত মানুষের দ্বারে না পেতে কিছু করুন সফলতা আসবেই ইনশাআল্লাহ।

শিক্ষকতা পেশা ও নিজের আত্মতুষ্টির কথা জানিয়ে ফারুক আহমেদ আরও বলেন, একটা মানুষের শুরুটা হয় ছোটবেলা থেকে। আর সেই সমস্ত মানুষদের গড়ার কারিগর প্রাথমিক বিদ্যালয়। নৈতিকতা সম্পন্ন মানুষ ও জাতি গড়ার কারিগর শিক্ষকতা পেশা। এ পেশায় আসতে পেরে খুব বেশি সন্তুষ্ট আমি। শিক্ষকদের হাত ধরেই দেশ ও দশের পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছি৷

এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবু তাহের মো. শামসুজ্জামান বলেন, যারা প্রতিবন্ধী হয়ে থাকেন তারা নিজেকে সমাজের বোঝা মনে করে থাকেন। আমি মনে করছি তাদের সকলের অনুপ্রেরণা হতে পারেন ফারুক আহমেদ। যিনি তার কাজে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন ইচ্ছা শক্তি থাকলে অসাধ্যকে নিজের সাধ্যে পরিণত করা সম্ভব। জাতি গড়ার কারিগর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। এটার মাধ্যমে অনেকের কাছে বড় একটি বার্তা পৌঁছাল বলে আমি মনে রাখছি৷